তথ্য যাচাই না করেই হোয়াটসঅ্যাপে ফরোয়ার্ডেড ভিডিয়ো চালিয়ে বা পেজে আপলোড করে নিন্দার মুখে পড়েছে একাধিক ভারতীয়–পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম। এমনকী দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের নামেও একটি ভুয়ো ফেসবুক পেজ খুলে পোস্ট করা হয়েছে, ‘পাকিস্তান সাইবার অ্যাটাকের প্ল্যান করেছে। কোনও লিঙ্কে ক্লিক বা অচেনা নম্বর থেকে ফোন ধরবেন না।’ কেন্দ্র জানিয়েছে, পুরোটাই ফেক। দোভাল ফেসবুক ব্যবহারই করেন না।
ভারত-পাক সংঘাতে মিডিয়া জুড়ে মিথ্যা কথা ভুয়া খবরে বিভ্রান্ত মানুষ, সতর্ক হওয়ার আহ্বান।
10 May 2025,
অনবরত গোলাবর্ষণ। উড়ে যাচ্ছে আর্মি বেস ক্যাম্প। কাতারে কাতারে মানুষ যুদ্ধ–বিধ্বস্ত শহর ছেড়ে প্রাণ ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন। যুদ্ধের এমন দৃশ্যই স্বাভাবিক।
বাস্তবে যুদ্ধের ভয়াবহতা ততটা না হলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় লাগিয়ে দিয়েছে ভয়ানক যুদ্ধ। যা প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে ছড়ানো হচ্ছে ফেক নিউজ়, ফেক ভিডিয়ো, ছবি, পোস্ট। রাফালের থেকেও বেশি গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে তা। এমনকী, তা থেকে বাঁচতে পারছে না সংবাদমাধ্যমের একাংশও। আর চুড়ান্ত বিভ্রান্ত হচ্ছেন দুদেশের সাধারণ মানুষ। সমাজ জুড়ে বিরোধের আবহাওয়া তৈরি করা হচ্ছে।
তথ্য যাচাই না করেই হোয়াটসঅ্যাপে ফরোয়ার্ডেড ভিডিয়ো চালিয়ে বা পেজে আপলোড করে নিন্দার মুখে পড়েছে একাধিক ভারতীয়–পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম। এমনকী দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের নামেও একটি ভুয়ো ফেসবুক পেজ খুলে পোস্ট করা হয়েছে, ‘পাকিস্তান সাইবার অ্যাটাকের প্ল্যান করেছে। কোনও লিঙ্কে ক্লিক বা অচেনা নম্বর থেকে ফোন ধরবেন না।’ কেন্দ্র জানিয়েছে, পুরোটাই ফেক। দোভাল ফেসবুক ব্যবহারই করেন না।
৮ মে, বৃহস্পতিবার রাতে একটি ভিডিয়ো বিভিন্ন ভারতীয় টিভি চ্যানেলে দেখিয়ে দাবি করা হয়, পাকিস্তানের করাচিতে ভারতীয় নৌ–বাহিনী আইএনএস বিক্রান্ত ধ্বংসলীলা চালিয়েছে। ভিডিয়োটি ভাইরাল হয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিতেও। কিন্তু এই ভিডিয়োটি আসলে ১ ফেব্রুয়ারি ইউএসএ–র ফিলাডেলফিয়ার।
যেখানে একটি বিমান দুঘর্টনার পরে ভিডিয়োটি তোলা হয়। ফেক ভিডিয়োটির পিছনে উর্দুতে একটি ভয়েস ওভার শোনা যায়। কেউ ঘোষণা করছেন, ‘ইন্ডিয়ান আর্মি আমাদের উপরে হামলা করেছে। আপনারা দয়া করে বাচ্চা, মহিলা ও গুরুজনদের নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যান।’ ফ্যাক্ট চেকারদের বক্তব্য, এই ভয়েস ওভার থেকে স্পষ্ট যে ফেক নিউজ়কে একেবারে সংগঠিত ভাবে ছড়ানো হচ্ছে।
ওই রাতেই একাধিক চ্যানেল ও সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল দাবি করে, পাক সেনা প্রধান আসিম মুনির গ্রেপ্তার হয়েছেন নিজের দেশেই, ইসলামাবাদের কার্যত দখল নিয়েছে ভারতীয় সেনা— পরে অবশ্য জানা যায় এই সবই ভুয়ো। কাউকে বলতে শোনা যায়, পাক প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ় শরিফ নাকি ভয়ে বাঙ্কারে লুকিয়েছেন।
পাকিস্তানও কম যায়নি। পাকিস্তানি বেশ কিছু টিভি চ্যানেলে একটি ভাইরাল ভিডিয়োয় দেখানো হয়, পাঞ্জাবের জলন্ধরে পাকিস্তানি ড্রোন হামলা হয়েছে। সেই ভিডিয়োতে দেখা যাচ্ছে দাউ দাউ করে একটি খেতে আগুন জ্বলছে। ভারত সরকারের প্রেস ইনফর্মেশন ব্যুরো বা পিআইবির ফ্যাক্ট চেকিং টিম জানাচ্ছে, এই ভিডিয়োটি আপলোড করা হয়েছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যে ৭টা ৩৯ মিনিটে। ঘটনা হলো, ড্রোন হামলা শুরু তার অনেক পরে। তা ছাড়া পিআইবির দাবি, এটা খেতের আবর্জনা পোড়ানোর একটি পুরোনো ভিডিয়ো।
এরই মধ্যে বাংলাদেশের ঢাকার একটি গন্ডগোলে আগুন লাগার ঘটনার ভিডিয়ো শেয়ার করে পাকিস্তানের অনেকে সোশ্যাল মিডিয়ার দাবি, পাকিস্তানি সেনা ভারতের নানা প্রান্তে এই ভাবেই সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। এক্স হ্যান্ডলে একাধিক আন–ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকে একটি পোস্ট শেয়ার করে দাবি করছে, কাশ্মীরে রাজৌরিতে ইন্ডিয়ান আর্মির উপরে আত্মঘাতী হামলা হয়েছে। পিআইবি কনফার্ম করেছে, এমন কোনও আত্মঘাতী হামলা আর্মির উপরে হয়নি।
সব সীমা অতিক্রম করে ভারতীয়দের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করা হয়েছে আরও একটি দাবি। যেখানে বলা হয়েছে, ইন্ডিয়ান আর্মি নাকি আম্বালা এয়ারবেস থেকে অমৃতসরে নিজেদেরই নাগরিকদের বিরুদ্ধে হামলা করেছে। এটিও যে ভুয়ো তার বিস্তারিত একটি প্রেস রিলিজ় প্রকাশ করেছে পিআইবি।
বেশ কিছু ভারতীয় ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক–ইনস্টাগ্রামে দু’টি ভিডিয়োয় দেখা যায়, মাটি থেকে যুদ্ধবিমানের উপরে হামলা চালিয়ে একটিকে মাটিতে নামানো হচ্ছে। দাবি করা হয়, ভারতীয় সেনা গুলি করে পাকিস্তানি যুদ্ধ বিমানকে মাটিতে নামিয়েছে। ফ্যাক্ট চেকার সংস্থা অল্ট নিউজ়ের দাবি, এই ভিডিয়ো ১৯ এপ্রিল পোস্ট করেছিল ‘কফিন গেমিং’ নামে একটি ইনস্টাগ্রাম পেজ। যা নেওয়া হয়েছিল একটি ভিডিয়ো গেম থেকে।
জলন্ধরে ড্রোন হামলার ভুয়ো ভিডিয়ো
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে জলন্ধরে পাক ড্রোন হামলার খবর সংবাদমাধ্যমে আসতে থাকে। সেই সময়েই সতকর্তামূলক ব্ল্যাকআউট করা হয়েছিল। তার পর থেকেই একটি ভিডিয়োও দ্রুত ভাইরাল হয়েছিল। দাবি করা হয়েছিল, পাক ড্রোন জলন্ধরের মাটিতে পড়েছে। সেই ভিডিয়োটি ভুয়ো বলে জানিয়েছে পিআইবি-র ফ্যাক্ট চেক টিম। তারা জানিয়েছে, এই ভিডিয়োর সঙ্গে ড্রোন হামলার কোনও যোগ নেই। একটি খামারের আগুনের ঘটনার ভিডিয়ো ভুল ব্যাখা দিয়ে চালানো হয়েছে। পিআইবি জানিয়েছে, ওই ভিডিয়োতে টাইম স্ট্যাম্প রয়েছে সন্ধ্যা ৭টা ৩৯ মিনিটে। কিন্তু ড্রোন হামলা তার পরে শুরু হয়েছিল, যা থেকে এটা স্পষ্ট যে ভিডিয়োটি ঠিক হলেও তার ব্যাখ্যা ভুল ও বিভ্রান্তিকর।
ভাইরাল ভিডিয়ো সত্যতা যাচাই
আরও একটি ভিডিয়ো ভাইরাল হয়। সেখানে বলা হয়, পাকিস্তান ভারতে মিসাইল অ্যাটাক করেছে। কিন্তু পিআইবি ফ্যাক্ট চেক টিম বিষয়টি স্পষ্ট করে। তাঁরা জানিয়েছেন, এই ভিডিয়োটি আসতে ২০২০ সালে লেবাননের বেইরুটে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ছবি। এমন একাধিক ভিডিয়ো এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। এমন আরও একটি ভিডিয়ো ফ্যাক্ট চেক করা হয়েছে। একটি ভিডিয়ো পোস্ট করে সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি করা হয়েছে গুজরাটের একটি বন্দরে পাক বাহিনী হামলা করেছে। যদিও সেই দাবি খণ্ডন করেছে পিআইবি। তাদের দাবি, এটি ভুয়ো ভিডিয়ো। পিআইবি জানিয়েছে এই, ফুটেজটি ২০২১ সালের জুলাই মাসের। এটা কোনও অয়েল ট্যাঙ্কার বিস্ফোরণের ছবি বলে জানিয়েছে পিআইবি।
জেনে নেওয়া যাক এমন কিছু ভিডিওর তালিকা-
২০২০ সালে লেবাননের বেইরুটে বিস্ফোরক হামলার ভিডিওকে চালানো হচ্ছে ভারতের বুকে পাকিস্তানের মিসাইল হামলা বলে।
জলন্ধরে ড্রোন হামলার একটি ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই ভিডিওটি আসলে অন্য একটি অগ্নিকাণ্ডের।
অমৃতসরের সেনা ঘাঁটিতে হামলার একটি ভিডিও পাকিস্তানের এক্স হ্যান্ডলে শেয়ার করা হচ্ছে। এটাও অনেক পুরনো একটি ভিডিও।
ভারতের একটি ইউএভি ড্রোনকে গুলি করে নামিয়েছে পাক সেনা- এমনই একটি ছবিও অনেকে শেয়ার করছেন। এটা আসলে ছড়ানো হয়েছে পাকিস্তানের একটি এক্স হ্যান্ডল থেকে। যা আসলে ২০২২ সালের রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের দৃশ্য।
বদগামে ভারতীয় বায়ুসেনার হেলিকপ্টার ক্র্যাশ করার যে ভিডিওটি ছড়াচ্ছে সেটাও ভুয়ো। ২০১৯ সালের একটি ভিডিওকেই পাকিস্তানিরা সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়েছে।
গত ৬ মে ইন্দোনেশিয়ার একটি ভিডিওকে ভারতীয় সেনা ছাউনিতে পাকিস্তানি হামলা বলে চালানো হচ্ছে।
একই ভাবে পাক সেনার বাট্টাল সেক্টরে হামলার যে ভিডিওটি দেখা যাচ্ছে সেটা একটা আদতে পুরনো ভিডিও।
২০২৩ সালে মস্কোর এক সেনা ঘাঁটিতে আগুন লাগার দৃশ্যকে এস-৪০০-তে পাকিস্তানি মিসাইল আছড়ে পড়ার ছবি হিসেবে চালানো হচ্ছে। ছড়িয়ে পড়ছে ওই ভুয়ো ভিডিও।
গুজরাটের হাজিরা বন্দরে পাক হামলার ভিডিও বলে একটি ভিডিও ঘুরছে সোশাল মিডিয়ায়। যেটা আসলে ২০২১ সালের জুলাইয়ের একটি অয়েল ট্যাঙ্কারে বিস্ফোরণের ভিডিও।
একটি ভিডিও ঘুরছে যেটি রাজৌরির সেনা ব্রিগেডে ফিঁদায়ে হামলা বলে দাবি করা হচ্ছে। বলাই বাহুল্য, এটিও ভুয়ো ভিডিও।
We hate spam as much as you do