Tranding

06:49 AM - 04 Feb 2026

Home / Article / ডিজিটাল সন্ত্রাস, বিপন্ন মানবতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ :এক ঐতিহাসিক শ্বেতপত্র (- প্রথম পর্ব)

ডিজিটাল সন্ত্রাস, বিপন্ন মানবতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ :এক ঐতিহাসিক শ্বেতপত্র (- প্রথম পর্ব)

পশ্চিমবঙ্গ, যা এককালে সারা ভারতের সংস্কৃতি, রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির পীঠস্থান ছিল, আজ সেই বাংলার সাইবার আকাশ কলুষিত হয়ে পড়েছে একশ্রেণীয় বিকৃত রুচির মানুষের কুৎসিত আস্ফালনে। এখানে এখন যুক্তি দিয়ে তর্কের বদলে শুরু হয় 'ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন' বা চরিত্রহননের উৎসব। রাজনৈতিক মতপার্থক্য হোক বা ব্যক্তিগত শত্রুতা—প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে প্রযুক্তিগত অপকৌশল। যখন একজন সাধারণ নাগরিক, কোনো গৃহবধূ, বা সত্যসন্ধানী সাংবাদিক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন যে তার দীর্ঘদিনের অর্জিত সম্মান কোনো এক বেনামী প্রোফাইলের মিথ্যাচারে ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে, তখন তার মানসিক অবস্থা যে কোন পর্যায়ে পৌঁছায়, তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কারোর পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব নয়।

ডিজিটাল সন্ত্রাস, বিপন্ন মানবতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ :এক ঐতিহাসিক শ্বেতপত্র (- প্রথম পর্ব)

ডিজিটাল সন্ত্রাস, বিপন্ন মানবতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ :এক ঐতিহাসিক শ্বেতপত্র (- প্রথম পর্ব)

গৌতম হালদার

1st Feb 2026

ভূমিকা:-
ডিজিটাল কুরুক্ষেত্র ও বাংলার সাইবার আকাশ

একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক সভ্যতায় দাঁড়িয়ে আমরা গর্ব করি আমাদের হাতের মুঠোয় থাকা প্রযুক্তির ক্ষমতা নিয়ে। তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় বিপ্লব আমাদের দিয়েছে সংযোগের অসীম ক্ষমতা, বাকস্বাধীনতার এক মুক্ত আকাশ। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠের মতো এই উজ্জ্বল আলোর নিচেই ঘনীভূত হয়েছে এক গাঢ় অন্ধকার, যাকে আধুনিক পরিভাষায় আমরা 'সাইবার অপরাধ' বা ডিজিটাল সন্ত্রাস বলে অভিহিত করতে পারি। আজকের দিনে ফেসবুক, এক্স (টুইটার), ইনস্টাগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপ কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এগুলি হয়ে উঠেছে এক শ্রেণির বিকৃত মানসিকতার মানুষের কাছে অপরকে লাঞ্ছিত করার, সামাজিক সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার এবং মানসিক নির্যাতনের এক ভয়াবহ মারণাস্ত্র।

পশ্চিমবঙ্গ, যা এককালে সারা ভারতের সংস্কৃতি, রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির পীঠস্থান ছিল, আজ সেই বাংলার সাইবার আকাশ কলুষিত হয়ে পড়েছে একশ্রেণীয় বিকৃত রুচির মানুষের কুৎসিত আস্ফালনে। এখানে এখন যুক্তি দিয়ে তর্কের বদলে শুরু হয় 'ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন' বা চরিত্রহননের উৎসব। রাজনৈতিক মতপার্থক্য হোক বা ব্যক্তিগত শত্রুতা—প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে প্রযুক্তিগত অপকৌশল। যখন একজন সাধারণ নাগরিক, কোনো গৃহবধূ, বা সত্যসন্ধানী সাংবাদিক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন যে তার দীর্ঘদিনের অর্জিত সম্মান কোনো এক বেনামী প্রোফাইলের মিথ্যাচারে ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে, তখন তার মানসিক অবস্থা যে কোন পর্যায়ে পৌঁছায়, তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কারোর পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এটি কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক ব্যাধি যা আমাদের পারিবারিক কাঠামো এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ভেতর থেকে খেয়ে ফেলছে।

আইনের শাসন:- সংবিধান ও ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)
হতাশার এই অন্ধকারের শেষ যেখানে, ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয় ভারতীয় আইনের কঠোর শাসন। ভারতের সংবিধান এবং নতুন প্রবর্তিত ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS), ২০২৩ ও তথ্য প্রযুক্তি আইন, ২০০০-এর যুগলবন্দি সাধারণ মানুষকে দিয়েছে এক শক্তিশালী আইনি বর্ম। ব্যক্তিগত গণমাধ্যমে কাউকে লক্ষ্য করে ইচ্ছাকৃতভাবে অপমানজনক মন্তব্য বা মিথ্যা অপবাদ দেওয়া আইনের দৃষ্টিতে 'মানহানি' বা ডিফেমেশন হিসেবে গণ্য হয়।
ভারতীয় ন্যায় সংহিতা বা বিএনএস-এর ৩৫৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি জেনেবুঝে বা বিশ্বাস করার কারণ থাকা সত্ত্বেও এমন কোনো মিথ্যা তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করেন যা অন্য ব্যক্তির খ্যাতি নষ্ট করে, তবে তা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। এখানে আইনের ভাষা অত্যন্ত স্পষ্ট; ডিজিটাল মাধ্যমে বা ইলেকট্রনিক উপায়ে করা মানহানিকে সাধারণ মানহানির চেয়েও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। শুধু তাই নয়, বিএনএস-এর ৩৫২ এবং ৩৫৩ ধারা অনুযায়ী, শান্তি ভঙ্গের উদ্দেশ্যে কাউকে অপমান করা বা জনসমক্ষে অভব্য আচরণ করার জন্য জেল এবং জরিমানা—উভয়ই হতে পারে। ধর্মীয় উস্কানি বা বিদ্বেষমূলক প্রচারের ক্ষেত্রে বিএনএস-এর ১৯৬ ধারা এবং ২৯৯ ধারা (পূর্বের আইপিসি ২৯৫এ) অনুযায়ী কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। সাইবার স্পেসে একটি শেয়ার বা একটি ফরওয়ার্ড করা মেসেজও যদি বিদ্বেষ ছড়াতে সাহায্য করে, তবে যিনি শেয়ার করছেন তিনিও আইনের দৃষ্টিতে সমান অপরাধী।

অপরাধের নগ্ন রূপ:- ম্যাস রিপোর্টিং, ডক্সিং ও সংঘবদ্ধ আক্রমণ আইনি সংজ্ঞা জানার পাশাপাশি আমাদের চিনতে হবে সেই সুনির্দিষ্ট মারণাস্ত্রগুলোকে,যা ব্যবহার করে অপরাধীরা আজ ব্যক্তিগত গণমাধ্যম ব্যবহারকারীদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে।সাধারণ গালিগালাজ বা ট্রোলিং-এর যুগ শেষ হয়ে গেছে,এখন অপরাধীরা ব্যবহার করছে এমন সব জঘন্য কৌশল যার নির্দিষ্ট নাম ও কার্যপদ্ধতি জানা না থাকলে আইনি লড়াইয়ে টেকা মুশকিল।

ম্যাস রিপোর্টিং বা সংঘবদ্ধ ডিজিটাল কণ্ঠরোধ:-
বর্তমান সময়ে ভিন্নমত দমনের সবথেকে ভয়াবহ হাতিয়ার হলো 'ম্যাস রিপোর্টিং'।
কল্পনা করুন, একজন সচেতন নাগরিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি পোস্ট করলেন। মুহূর্তের মধ্যে টেলিগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপের গোপন গ্রুপগুলোতে সেই পোস্টের লিঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল এবং একদল 'সাইবার-হায়েনা' বা ভাড়ায় খাটানো ট্রোল বাহিনী ঝাঁকে ঝাঁকে সেই প্রোফাইলে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। তাদের কাজ একটাই—ওই সত্যনিষ্ঠ পোস্ট বা প্রোফাইলটির বিরুদ্ধে 'হেট স্পিচ', 'ভায়োলেন্স' বা 'সেক্সুয়াল কন্টেন্ট'-এর মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে হাজার হাজার রিপোর্ট করা। এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; এটি একটি সুনিপুণ অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র। এই সংঘবদ্ধ আক্রমণের ফলে সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং কোনো বিচার-বিবেচনা ছাড়াই ওই নির্দোষ ব্যক্তির অ্যাকাউন্টটি বন্ধ বা 'রেস্ট্রিক্ট' করে দেয়। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর ৬১(২) ধারা অনুযায়ী, যখন একাধিক ব্যক্তি মিলে কোনো বৈধ কাজকে অবৈধ উপায়ে বন্ধ করার ষড়যন্ত্র করে, তখন তারা প্রত্যেকেই সমান অপরাধী। এই ম্যাস রিপোর্টিং কেবল প্রযুক্তির অপব্যবহার নয়, এটি বাকস্বাধীনতার টুঁটি টিপে ধরার এক জঘন্য প্রয়াস।

ডক্সিং বা ব্যক্তিগত তথ্যের নগ্ন প্রদর্শনী:-
এর চেয়েও বীভৎস এবং আতঙ্কের নাম হলো 'ডক্সিং'। সাইবার অপরাধীরা যখন দেখে যে যুক্তিতে তারা ভুক্তভোগীর সাথে পেরে উঠছে না, তখন তারা বেছে নেয় এই নিচতার পথ।ডক্সিং হলো এমন এক প্রক্রিয়া যেখানে ভুক্তভোগীর একান্ত ব্যক্তিগত তথ্য—যেমন তার বাড়ির ঠিকানা, ব্যক্তিগত ফোন নম্বর,আধার কার্ডের নম্বর,পরিবারের সদস্যদের ছবি,এমনকি তার সন্তানদের স্কুলের ঠিকানা—ইন্টারনেটের পাবলিক ডোমেইনে বা কমেন্ট বক্সে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য কেবল অপমান করা নয়, বরং ভুক্তভোগীকে বাস্তব জীবনে বিপদে ফেলা বা তার ওপর শারীরিক হামলার পথ প্রশস্ত করা। তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৬৬ই ধারা এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতার বিভিন্ন ধারায় এটি একটি জামিন অযোগ্য ও গুরুতর অপরাধ। ডক্সিং-এর শিকার হয়ে অনেকে চাকরি হারিয়েছেন, এমনকি প্রাণনাশের হুমকির মুখেও পড়েছেন।

ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন ও ডিপফেক:-
সাধারণ মানহানির চেয়েও অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক হলো সংঘবদ্ধ কুৎসা রটনা। এখানে অপরাধীরা 'ফেক ন্যারেটিভ' বা মিথ্যা গল্প তৈরির কৌশল অবলম্বন করে। প্রযুক্তির অপব্যবহার করে তারা তৈরি করে 'ডিপফেক' বা মর্ফ করা অশ্লীল ছবি, যা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল করে দেওয়া হয়। একজন কলেজ ছাত্রী বা গৃহবধূর মুখের ছবি কেটে কোনো পর্নোগ্রাফিক ভিডিওতে বসিয়ে তাকে ব্ল্যাকমেইল করার ঘটনা বা 'সেক্সটর্শন' এখন মহামারীর আকার ধারণ করেছে। এটি কেবল সম্মানহানি নয়, এটি তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৬৬সি (পরিচয় চুরি) এবং ৬৭এ (অশ্লীলতা প্রচার)-এর অধীনে জামিন অযোগ্য অপরাধ।

অন্ধকারের সুড়ঙ্গ:-
হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি ও গোপন গ্রুপের বিপদ
সাইবার অপরাধের মানচিত্রটি যদি আমরা গভীরভাবে লক্ষ্য করি,তবে দেখব যে খোলা আকাশের নিচে যুদ্ধের চেয়ে গোপন সুড়ঙ্গের যুদ্ধ অনেক বেশি ভয়াবহ। আজকের ডিজিটাল যুগে সেই গোপন সুড়ঙ্গের নাম হলো হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ এবং ফেসবুকের 'প্রাইভেট' বা 'সিক্রেট' গ্রুপ। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় এগুলো সমমনা মানুষদের আড্ডার জায়গা, কিন্তু বাস্তবের চিত্রটি হাড়হিম করা। এই গ্রুপগুলো আজ পরিণত হয়েছে 'ইকো চেম্বার' বা প্রতিধ্বনি কক্ষে, যেখানে একটি মিথ্যাকে হাজারবার সত্য বলে প্রচার করা হয়।
তথাকথিত 'হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি'-র দৌলতে আজ বৈজ্ঞানিক সত্যের চেয়ে ফরোয়ার্ড করা মেসেজের গুরুত্ব বেশি। অপরাধীরা জানে যে, ব্যক্তিগত চ্যাটে এনক্রিপশন থাকার কারণে পুলিশ সহজে নজরদারি করতে পারে না, আর এই সুযোগেই তারা এই গ্রুপগুলোকে ব্যবহার করে দাঙ্গা বাঁধানো, ম্যাস রিপোর্টিং-এর পরিকল্পনা করা এবং বড়সড় আর্থিক জালিয়াতির ফাঁদ পাতার কাজে। ফেসবুকের বিভিন্ন গোপন গ্রুপে মহিলাদের ছবি শেয়ার করে কুরুচিকর মন্তব্য করা বা 'অকশন' (নিলাম) করার মতো জঘন্য ঘটনাও ঘটছে। এখানে অপরাধীরা 'অ্যাডমিন'-এর আড়ালে থেকে কলকাঠি নাড়ে এবং সাধারণ সদস্যদের ব্যবহার করে তাদের অপরাধমূলক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে।
আইনের দৃষ্টিতে এই গ্রুপগুলোর দায়বদ্ধতা এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ভারতীয় আদালত বিভিন্ন রায়ে স্পষ্ট করেছে যে, যদি কোনো গ্রুপে দেশবিরোধী, সাম্প্রদায়িক বা অপরাধমূলক বার্তা ছড়ানো হয় এবং অ্যাডমিন তা আটকাতে ব্যর্থ হন, তবে তাকেও অপরাধের সহযোগী বা 'অ্যাবেটর' হিসেবে গণ্য করা হবে। তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৭৯ ধারা অনুযায়ী, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো দায় এড়াতে পারে, কিন্তু গ্রুপের সৃষ্টিকর্তা বা অ্যাডমিন তার দায়িত্ব এড়াতে পারেন না।
এই গোপন সুড়ঙ্গগুলো যাতে গণতন্ত্র ও মানবতার কবরস্থানে পরিণত না হয়, তার জন্য আমাদের সতর্ক হতে হবে।
এটি প্রথম ভাগ।
এখানে অপরাধের ধরণ, বাংলার প্রেক্ষাপট এবং আইনি ভিত্তি স্থাপন বিষয়ে সংক্ষেপে লেখা হয়েছে।

দ্বিতীয় ভাগে- (বাকি অংশ শেষ পর্যন্ত আমাদের কাজ)
➖➖➖

Your Opinion

We hate spam as much as you do