Tranding

10:49 AM - 04 Feb 2026

Home / Article / নববর্ষ ও তার কৃষি ভাবনা

নববর্ষ ও তার কৃষি ভাবনা

সুকুমার সেন দোলের কথা প্রবন্ধে তার উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন বাঙ্গালীর দুই সর্বজনীন উৎসব দুর্গাপূজা এবং দোলের উৎসবের কথা। শ্রী চৈতন্যের পূর্বে শ্রী কৃষ্ণের দোল যাত্রা বলে কোন ধর্মানুষ্ঠান বঙ্গদেশে ছিল না। যে দিন তিনি জন্মে ছিলেন সেদিন ছিল ফাল্গুনী পূর্ণিমা এবং চন্দ্র গ্রহণ লেগেছিল। তাই নবদ্বীপ জুড়ে হরি ধ্বনি, শঙ্খ- ঘণ্টার শব্দে দলে দলে মানুষ গঙ্গা - স্নানে গিয়েছিল। সেখানে থেকেই দোলের আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্যের শুরু। তবে প্রাচীন জনজাতির বসন্ত উৎসবে ধর্মের ছোঁয়া ছিলনা। Shifting cultivation বা পাতা চাষ - ঝুমচাষ প্রভৃতির ক্ষেত্র প্রস্তুতির জন্যে শুকনো পাতা, ডাল পালায় আগুন দিয়ে ছাই ভষ্ম মাটির সাথে মিশিয়ে শস্য ক্ষেত্র প্রস্তুত হত।

নববর্ষ ও তার কৃষি ভাবনা

নববর্ষ ও তার কৃষি ভাবনা


শুভ্রদীপ অধিকারী 
১৫ এপ্রিল ২০২৫

 

নববর্ষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেমন নতুন সময়কালকে নির্দেশ করে তেমন তার মূলে থাকা ভাবনা , বরাবরই আলোকিত করেছে পূর্বের কৃষিভিত্তিক ব্যবস্থা কে। পাশ্চাত্যে বিশেষতঃ ইউরোপে যেমন কয়েক শতাব্দী আগেও মার্চ মাস কেই নতুন বছরের সূচনা হিসাবে গন্য করা হত। তার কারণ আমরা জানি সেই সময় ছিল ফসল কাটবার সময়। শেক্সপিয়ারের জুলিয়াস সিজার নাটকের আইডেস অফ মার্চের সমারোহের কথা আমাদের অনেকেরই জানা। কিন্তু প্রাচীন বাংলার তথা ভারতের সাঁওতাল, মুণ্ডা , হো প্রভৃতি খেরওয়াল জনগোষ্ঠীর বাহা পরব না পুষ্প পরব ঐ একই সময়ে বিশাল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন জীবনে নতুন বছরের সঞ্চার করে। উত্তর ভারতের ব্যাপক জন জীবনের বর্ষ পঞ্জিকা শুরু হয় চৈত্র থেকে। যার নাম এসেছে চিত্রা নক্ষত্র থেকে। সময় কালের দিক থেকে এসব যেন এক অবস্থানে। একি নেহাৎ কাকতালীয়? আসলে শৈত্য প্রবাহের পর পত্রহীন গাছে নতুন পাতা, কুঁড়ি দিয়ে প্রকৃতি যে নতুন রূপের উৎসব কে নিয়ে আসে সারা বিশ্বের জনজাতি আদিম অবস্থান থেকেই তাকে নতুন বছর বলে পালন করেছে। কৃষি উৎসবই এর ভিত্তি। এদেশে কৃষিতে সাফল্য লাভের মিনতি ও আচার - অনুষ্ঠান সমূহ এককথায় ফার্টিলিটি কাল্ট জড়িয়ে রয়েছে এই উৎসবে। আবার ধর্মের অনুশাসনও প্রবর্তিত হয়েছে এই উৎসবে। নেতার হাট, পালামৌ, ডাল্টন গঞ্জ প্রভৃতি স্থানে এই উৎসব সারহুল পরব নামে প্রচলিত আছে। নেতারহাট অঞ্চলের কৃষি সমাজ একে তাদের পুরোহিত বা ব্রাহ্মণ দিয়ে একে নিয়ন্ত্রণ করছে। 

 

তাহলে বাংলায় বৈশাখ থেকে এর সূচনা হল কি ভাবে? আসলে প্রাচীন বাহা পরব যা একটি বসন্ত উৎসব ছিল বৌদ্ধ ধর্মের সময় কালে বৌদ্ধ পূর্ণিমা বা বৈশাখ মাস থেকে বছর গণনা শুরু হয়। এই ভাবে প্রাচীন জনজাতির বাহা পরব বা খাদ্দি পরব ( দ্রাবিড় জনজাতির কুড়ুক বা ওরাও৺রা একে খাদ্দি পরব বলে।) পাশ্চাত্যেও খ্রিস্টমাস উৎসবের দিকে তাকিয়ে পুরানো ক্যালেন্ডারের মাস গুলির স্থান পরিবর্তিত হয় এবং জানুয়ারী মাস থেকে প্রথম মাস শুরু হয়। তবে আজও বিশ্ব জুড়ে আর্থিক লেনদেনের হিসাব মার্চ মাসে শেষ করবার নিয়ম প্রচলিত আছে। 
যখন ক্যালেন্ডারের কথাই এলো এখানেও পশ্চিমের সাথে এদেশের মিল চোঁখে পড়ে। পশ্চিমা ক্যালেন্ডারের অধিকাংশ নাম যেমন গ্রীক ও রোমান দেব দেবীর নাম থেকে কিংবা রাজা দের নাম থেকে হলেও সপ্তম বার মাস বা september month, অষ্টম বার মাস বা october month, নবম বার মাস বা november month আর december month বা দশম বার মাস , সংস্কৃত থেকে রয়ে গেছে। জানুয়ারি যা রোমান দেবতা জানুস এর নাম অনুযায়ী এবং ফেব্রুয়ারী (যা ফেব্রুয়া পরব থেকে এসেছে) দুটি মাস পরে পাশ্চাত্য ক্যালেন্ডারে যুক্ত হয়েছে। শুধু তাই নয় ইউরোপেও যে চান্দ্রমাস প্রচলিত ছিল তার উদাহরণ month শব্দ টি এসেছে প্রাচীন ইন্দো ইউরোপীয় শব্দ monath বা mona থেকে যার অর্থ moon। কোল, সাঁওতাল, কুড়ুখ রাও মাস কে চাঁদো বলে । হো-রা বলে চাঁন্দু বা চণ্ডু। 
তবে এদেশের বিশেষতঃ বাংলায় বসন্ত উৎসব বা বাহা পরব থেকেই যে আমরা নববর্ষের ধারণা পেয়েছিলাম , সেটা বেশ স্পষ্ট বোঝা যায়। এর দোল উৎসবে আবিরের রঙে সেটা বর্ণাঢ্য হয়ে উঠলো। 

 

সুকুমার সেন দোলের কথা প্রবন্ধে তার উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন বাঙ্গালীর দুই সর্বজনীন উৎসব দুর্গাপূজা এবং দোলের উৎসবের কথা। শ্রী চৈতন্যের পূর্বে শ্রী কৃষ্ণের দোল যাত্রা বলে কোন ধর্মানুষ্ঠান বঙ্গদেশে ছিল না। যে দিন তিনি জন্মে ছিলেন সেদিন ছিল ফাল্গুনী পূর্ণিমা এবং চন্দ্র গ্রহণ লেগেছিল। তাই নবদ্বীপ জুড়ে হরি ধ্বনি, শঙ্খ- ঘণ্টার শব্দে দলে দলে মানুষ গঙ্গা - স্নানে গিয়েছিল। সেখানে থেকেই দোলের আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্যের শুরু। তবে প্রাচীন জনজাতির বসন্ত উৎসবে ধর্মের ছোঁয়া ছিলনা। Shifting cultivation বা পাতা চাষ - ঝুমচাষ প্রভৃতির ক্ষেত্র প্রস্তুতির জন্যে শুকনো পাতা, ডাল পালায় আগুন দিয়ে ছাই ভষ্ম মাটির সাথে মিশিয়ে শস্য ক্ষেত্র প্রস্তুত হত। এই বন - আগুন পরবর্তীতে হোলিকা দহন হয়েছে ধর্মীয় অনুশাসনে। এক্ষেত্রে কেওনঝড়ের জুয়াং উপজাতির ভিতরের এ জাতীয় প্রথার উল্লেখ করা যেতে পারে। বাঙলায় এবং উড়িষ্যায় বিভিন্ন স্থানে খড়ের ঘর, মূর্তি, কোথাও আবার ভেড়া আগুন জ্বালাবার প্রথা দেখা যায় দোল পূর্ণিমার আগের দিন হোলি উৎসবে। গুজরাটে মানব - মানবীর মূর্তি, লিঙ্গ আগুনে নিক্ষেপের প্রথাও রয়েছে। দক্ষিণ ভারতে কামদহণম উৎসব ও একইরকম। সমাজ বিজ্ঞানী নির্মল কুমার বসুর মতে, " The bonfire ceremony, which is identical with holi, is present all over India." 

 

বাঙলার নববর্ষের ঐতিহ্য যে রয়ে গেছে কৃষিকাজের সাথে সম্পৃক্ত এই আদিবাসী উৎসব গুলোতে, অনেক সমাজ তাত্ত্বিক এটা মেনে নেন। অধ্যাপক ডঃ অতুল সুর তার বাংলা ও বাঙালি প্রবন্ধে যেমন বলেছেন, " বাংলায় পয়লা বৈশাখে লৌকিক বা শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠানের অভাব দেখে মনে হয়, অতি প্রাচীন কালে বাংলায় নববর্ষটা অন্য সময় হত। যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি মশায় বলেছেন যে প্রাচীন কালে ফাল্গুনী পূর্ণিমা তিথিতে নববর্ষ উৎসবের অনুষ্ঠান হত। দোলযাত্রা বা হোলি সেই উৎসবের ধারক।" অবশ্যই যেটি কৃষিভিত্তিক উৎসব।

Your Opinion

We hate spam as much as you do