আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল ও বিজেপির 'তুমুল লড়াইয়ে'র মারকাটারি চিত্রনাট্য রচনায় মূলধারার মিডিয়া আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে বটে কিন্তু প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে সে চেষ্টা মাঠে মারা যাচ্ছে। এমনিতেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ যৌথ মহাব্রিগেডের পর তৃনমূল-বিজেপির সাজানো যুদ্ধের বাইনারি ভেঙ্গে পড়েছে
'অলীক কুনাট্য রঙ্গে' মজতে রাজি নয় বঙ্গ। এবারের নির্বাচনে সংযুক্ত মোর্চাই ডার্ক হর্স।
ইদানিং বহুল ব্যবহারে কার্যত ক্লিশে হয়ে যাওয়া ইংরাজী পলিটিক্স শব্দটি যিশু খ্রীষ্টের জন্মেরও প্রায় সাড়ে তিন'শ বছর আগে প্রথম প্রয়োগ করেছিলেন প্রখ্যাত গ্রিক দার্শনিক এ্যারিস্টটল। পলিটিক্স শব্দের উৎস গ্রিক শব্দ 'পোলিস', যার মানে নগর। যদিও আমরা আমাদের মত ক'রে পলিটিক্সের বাংলা করে নিয়েছি রাজনীতি, কিন্তু প্রকৃত অর্থে পলিটিক্স হ'ল নগর পরিচালনা সংক্রান্ত নীতি। ক্ষেত্রটাকে আরও একটু বিস্তৃত করলে দাঁড়ায় রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি। অর্থাৎ কিনা পলিটিক্স আদতে রাজা গজাদের বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্র ও তার নাগরিকদের একেবারে নিজস্ব বিষয়। অন্ততঃ তেমনটাই হওয়া উচিৎ। রুশ বিপ্লবের প্রাণ পুরুষ ভি আই লেনিনের মতে অবশ্য রাষ্ট্রের অর্থনীতির চূড়ান্ত সংহত প্রকাশই হল রাজনীতি। যদিও সেই কবেই এ্যারিস্টটল লিখে গেছেন যে প্রতিটি মানুষই আসলে আদ্যন্ত রাজনীতিক, তবু এ কথা অস্বীকার করা মুশকিল যে ইদানিং সময়কালে জনসাধারণের একটা বড় অংশই তথাকথিত রাজনীতি সম্পর্কে একধরনের চরম বিরক্তিসঞ্জাত নিস্পৃহতা বোধ করে এবং পাঁচ বছর পর পর নিজের একটি 'মহার্ঘ্য' ভোট প্রদান ক'রেই যাবতীয় রাজনৈতিক' দায়বদ্ধতায় ইতি টানতে বেশি আগ্রহী। কেউ কেউ তো আবার রাজনীতির যে কোনো প্রসঙ্গ এসে পড়লেই মুখে কৃত্রিম গাম্ভীর্য এনে কপাল কুঁচকে, নিরপেক্ষতার ভান ক'রে তথাকথিত নো পলিটিক্স শব্দবন্ধটির আড়াল থেকে NOTA-য় ভোট দেওয়ার পক্ষে জোরালো সওয়াল ক'রে মেঘনাদের মত আসলে রাজনীতি করতেই বেশি আগ্রহী। তবে এ কথা মানতেই হয় বঙ্গ রাজনীতির মঞ্চটি ইদানিং যে ভাবে ক্রমশঃ সার্কাসের তাঁবুতে পরিণত হয়েছে তাতে সাধারণ মানুষ যে রাজনীতি সম্পর্কে আগ্রহ হারাবেন এ আর বেশি কথা কি!
আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল ও বিজেপির 'তুমুল লড়াইয়ে'র মারকাটারি চিত্রনাট্য রচনায় মূলধারার মিডিয়া আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে বটে কিন্তু প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে সে চেষ্টা মাঠে মারা যাচ্ছে। এমনিতেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ যৌথ মহাব্রিগেডের পর তৃনমূল-বিজেপির সাজানো যুদ্ধের বাইনারি ভেঙ্গে পড়েছে। তার ওপর গোদের ওপর বিষ ফোঁড়ার মত নেতানেত্রীদের এ ডাল থেকে ও ডালে লাফানো । 'ভাগ মুকুল ভাগ' ব'লে সেই কবেই তৃনমূলের তদানীন্তন সেকেন্ড ইন কমান্ড মুকুল রায়কে বিজেপিতে ভাগিয়ে এনেছিলেন সিদ্ধার্থনাথরা। এখন সেই সিদ্ধার্থনাথ যদিও আর বঙ্গ বিজেপির দায়িত্বে নেই, তবে মুকুল রায় স্বয়ং কিন্তু আজ বিজেপির বড় নেতা। তারপর থেকে একদা মমতাকে মা ডাকা ভারতী ঘোষ, মন্ত্রী রাজীব ব্যানার্জী, শুভেন্দু অধিকারী বা দীনেশ ত্রিবেদী থেকে শুরু করে এলাকায় এলাকায় টিএমসির নেতা, আধা নেতা, সিকি নেতাদেরও যে ভাবে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার হিড়িক পড়েছে তাতে বাংলার বিজেপিকে টিএমসির প্রাক্তনী সম্মিলনী বললে বোধহয় ভুল হবে না। তার ওপর গত ৪ মার্চ মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী ২৯১ কেন্দ্রে টিএমসির প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করার পর বিধানসভা ভাঙচুরপটিয়সী সোনালী গুহ, জটু লাহিড়ী বা জগ থ্রোয়ার আরাবুল ইসলামের মত তাঁর একদা বিশ্বস্ত অনুচর বৃন্দ অভিমানে অপমানে আসনহারা হওয়ার কষ্টে কেঁদে কঁকিয়ে রীতিমত প্যারেড ক'রে বিজেপির দরজায় যেতে শুরু করেছেন। আর বিজেপিও তাদের স্বাগত জানাতে পদ্ম হাতে তৈরি হয়ে বসে আছে। সত্যি বলতে কি রাহুল সিংহ বা শমীক ভট্টাচার্য্যের মত রাজ্য বিজেপির আগমার্কা পুরানো লোকেরা আজকাল আর তেমন পাত্তা পাচ্ছেন না বিজেপিতে। আর কি আশ্চর্য্য, সারদা নারদে অভিযুক্তরা বিজেপির ওয়াশিং মেশিনে একটিবার ঢুকে পড়তে পারলেই তাদের গা থেকে শুদ্ধতার ঝলক ঠিকরে পড়ছে যেন!
এ সবের মধ্যেই বেজে চলেছে কান ঝালাপালা করা খেলা হবে স্লোগান; আর খেলাকে আরও রোমাঞ্চকর ও উপভোগ্য করে তুলতে টলি পাড়ার গ্ল্যামারদের নিয়ে চলছে দু পক্ষের টাগ অব ওয়ার। অদিতি মুন্সি একূল ওকূল এলোমেলো ঘুরে শেষে তরী ভিড়িয়েছেন টিএমসিতেই। কৌতুকাভিনেতা কাঞ্চন মল্লিক তো গ্রূক বীর আলেকজান্ডারের মতই অনেকটা ওই এলেন দেখলেন জয় করলেন স্টাইলে দলে যোগ দিয়েই সরাসরি হয়ে গেলেন টিএমসি প্রার্থী। এ ব্যাপারে অবশ্য সব্বাইকে টেক্কা দিয়েছেন সায়নী ঘোষ। ভবিষ্যতের ভূত সিনেমাটি যখন অন্যায় ভাবে আটকানো হয়েছিল তখন এই সায়নী ঘোষকেই দেখা গিয়েছিল এ্যাকাদেমির সামনে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রীর মুন্ডুপাত করে গণতন্ত্রের পক্ষে সওয়াল করতে। আজ অবশ্য তিনি সেদিনকার সেই 'গণতন্ত্র হরণকারী' মমতা দেবীর পদধূলি মাথায় নিয়ে আসানসোল থেকে টিএমসি প্রার্থী।
একদিকে স্ত্রী ও অন্যদিকে স্বামী ও তার বান্ধবীর তরজা, তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যোগ দেওয়া এক সাংসদ বনাম তার তৃনমূলে যাওয়া স্ত্রীর সিরিও কমিক চাপান উতোর, সোনালী-আরাবুলদের কান্নার কমেডি সার্কাস কিম্বা ঘরের মেয়ে বনাম বহিরাগতর মক ফাইট - এসবই এখন টিভি চ্যানেলগুলোর প্রাইম টাইমে টিআরপি বৃদ্ধির জবরদস্ত মালমসলা। তবে এসব কিছুর উল্টো দিকে কিছু অন্য ছবিও আছে যা হাজার চেষ্টাতেও চাপা দেওয়া যাচ্ছে না। চাপা দেওয়া যাচ্ছে না লকডাউনের কঠিনতম দিনগুলিতে যখন মমতা দেবী গোটা তৃনমূলকে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে গেরুয়া ইঁটের টুকরো দিয়ে নিজে নিজেই রাস্তায় রাস্তায় ওবি ভ্যান, হাজার বুম আর ফ্ল্যাশ লাইট সমভিব্যহারে সাদা গোল্লা আঁকতে ব্যস্ত থেকেছেন আর দিল্লির উনি যখন মাত্র চার ঘন্টার নোটিশে লকডাউন চাপিয়ে দিয়ে থালাবাটি বাজানোর পরামর্শ দিয়েই মৌন হয়েছেন তখন কাজ হারানো পরিবারগুলোর পাশে, আটকে পড়া পরিযায়ী শ্রমিকদের পাশে, আম্ফানে সর্বশান্ত হওয়া মানুষগুলোর পাশে সর্বশক্তি দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ৭ শতাংশে নেমে যাওয়া বামেরাই। এই সময়কালে বামেদের দৌলতেই জনপ্রিয় হয়ে উঠতে দেখা গেছে 'শ্রমজীবী ক্যান্টিন' বা শ্রমজীবী বাজারের' মত শব্দগুচ্ছগুলিকে।
প্রাকনির্বাচন সময়কালে যখন বাংলার আকাশে উড়ছে টাকা, তখনও কাউকে কাউকে কেনা সম্ভব হয় নি। লকডাউন উঠতে না উঠতেই ২০২০ র আগস্টে মমতা দেবীর হাইলি পেইড ভোট ম্যানেজার পিকে আসরে নেমেছিলেন লোক ভাঙ্গাতে। সিপিআইএম প্রাক্তন মন্ত্রী দেবেশ দাশ, মমতা রায়, লক্ষীকান্ত রায়, বিধায়ক রফিকুল ইসলাম বা সুবিনয় ঘোষের মত বামপন্থী নেতাদের দলে টানতে গিয়ে ভিন রাজ্য থেকে আসা পিকে বুঝেছেন বামপন্থীদের কেনা মোটেই খুব সহজ নয়। কেননা ওই নেতানেত্রীরা পিকের টিমের মুখের ওপর সপাটে বলে দিয়েছিলেন আদর্শ বিক্রি করতে তাঁরা অপারগ।
অলীক কুনাট্য রঙ্গে যতই মজানোর চেষ্টা হোক না কেন বঙ্গবাসীকে, এই আক্রা গন্ডার বাজারে নুন আনতে পান্তা ফুরানো গরীব-মধ্যবিত্ত মানুষের যখন নাভিশ্বাস উঠছে তখন এ সব তাকে আর তেমন টানছে না। হিন্দু হোক বা মুসলমান, সাড়ে আটশ টাকায় যখন গ্যাস কিনতে হচ্ছে, যখন বছরের পর বছর টেট পরীক্ষা হচ্ছে না, যখন প্যানেলে নাম থাকা সত্বেও বেনিয়মের কারনে বাতিল হয়ে যাচ্ছে তালিকা, যখন অনলাইনে আর পড়াশোনা চালানোই সম্ভব হচ্ছে না বাড়ির কচি কাঁচাদের অথবা দীর্ঘ লকডাউনের দৌলতে প্রায় নিঃস্ব হয়ে যাওয়া মানুষটাকে কাজ হারাতে হচ্ছে তখন ওই হিন্দু খতরে মে হ্যায় কিম্বা মুসলমানরা বিপন্ন এমন স্লোগান বিজেপির পালে আর তেমন হাওয়া লাগাতে পারছে না। পাশাপাশি রোমাঞ্চকর টিভি শোগুলোর মধ্যে দিয়ে তৃনমূল-বিজেপি বাইনারি তৈরির প্রয়াসও হালে তেমন পানি পাচ্ছে না। মানুষ বিকল্প খুঁজছে। এই সাজানো মক ফাইটের বাইরে, হাস্যকর তুতুম্যায়ম্যায়ের বাইরে, বিরক্তিকর আয়ারাম গয়ারাম রাজনীতির বাইরে, ক্লান্তিকর হিন্দু মুসলমান মতুয়া রাজবংশী নেপালী বাঙ্গালি ভাগাভাগির অপচেষ্টার বাইরে মানুষ খুঁজছে এক অন্যতর বিকল্প; যে বিকল্প তাদের জীবন যন্ত্রণাকে সরাসরি এ্যাড্রেস করতে পারে; দিতে পারে সব হাতে কাজের নিশ্চয়তা, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফেরানোর নিশ্চয়তা, চোর চিটিংবাজদের শাস্তির গ্যারান্টি। আর ঠিক এখানেই ক্রমশঃ নিজেদের স্পেস্ খুঁজে নিচ্ছে ৭ শতাংশে নেমে যাওয়া বামেরা। সবার অলক্ষ্যে বিজেপি তৃনমূল বাইনারির ঢক্কানিনাদের আড়ালে ক্রমশঃ বাড়ছে জোটের সমর্থন ভিত্তি। বাম জোটকে এখন আর তাই উপেক্ষা করা যাচ্ছে না পুরোপুরি। ২৮এর ব্রিগেড শেষ হতে না হতেই বিজেপি তৃনমূলকে তাই ডাকতে হয়েছে প্রেস মিট। চ্যানেলে চ্যানেলে করতে হয়েছে ব্রিগেড-স্পেশাল টক শো। এমনকি পাল্টা ব্রিগেডে বিজেপিকে আনতে হয়েছে খোদ প্রধানমন্ত্রীকেই। বাম ব্রিগেডকে টেক্কা দিতে ঝাড়খন্ড বিহার থেকে আনতে হয়েছে শতাধিক বাস। সঙ্গে স্টার এ্যাট্রাকশন 'মহাগুরু' মিঠুন চক্রবর্তী ও তাঁর মারকাটারি ফিল্মি ডায়ালগ ফাউ। কিন্তু এত খরচ করে এত কাঠখড় পুড়িয়েও আঠাশের ব্রিগেডের ধারে কাছে পৌঁছেতে পারল না বিজেপির ব্রিগেড সভা। মুকুল রাজীব শুভেন্দু অর্জুন দীনেশ শোভিত মঞ্চ দেখে এক সময় মনে হচ্ছিল এ আসলে তৃনমূলের এ্যালুমনাইদের সম্মিলন মঞ্চ বুঝি। সাত তারিখের এহেন ফ্লপ শো'র পর তাই স্বভাবতই সংশয় কাটছে না বিজেপির। ফলে সব বেটাকে ছেড়ে দিয়ে বেড়েটাকে ধর কায়দায় তৃনমূল-বিজেপি ও তাদের বেতনভূক মিডিয়া এখন বসেছেন আব্বাসের সঙ্গে জোট ক'রে বামেদের সতীত্ব নষ্ট হওয়ার দুঃখে বুক ভাসাতে। যদিও আব্বাস নয়, জোটসঙ্গী হয়েছে ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট নামক রাজনৈতিক একটি দল; যদিও নতুন আব্বাস একবারের জন্যেও কেবল মুসলমানদের কথা না ব'লে, বলছেন আদিবাসী, মূলবাসী সংখ্যালঘু সহ সমস্ত গরীব প্রান্তিক মানুষের কাজের কথা, খাদ্যের কথা, যদিও তিনি সরাসরি বিরোধিতা করছেন সরকারের ইমাম ভাতা দেওয়ার; তবু গেল গেল রব তুলে দেওয়া হচ্ছে সচেতন ভাবেই। যেন মাথায় হিজাব পরে ইবাদতের নাটক করাটা জায়েজ, যেন উগ্রপন্থী সিমির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিকে এক্কেবারে সিধা রাজ্যসভায় পাঠানোটা ভীষণ রকম ধর্মনিরপেক্ষতার পরিচায়ক, যেন রামনবমীর পাল্টা পাড়ায় পাড়ায় হনুমান জয়ন্তী পালন এক ভয়াণক বিপ্লবী কর্মকান্ড। অথচ তৃনমূল ও বিজেপির আইটি সেলের প্রচারের ঘনঘটায় মনে হবে যত দোষ ওই নন্দ ঘোষ আব্বাস সিদ্দিকিই।
তবে তৃনমূল বিজেপির সাজানো বাইনারির আড়ালে এবারের নির্বাচনে সংযুক্ত মোর্চাই যে কালো ঘোড়া তা নিয়ে সন্দেহের তেমন অবকাশ আছে বলে মনে হয় না।
----- বক্তব্য - লেখকের নিজস্ব
We hate spam as much as you do