রাজ্যের শিল্প পরিস্থিতির এই মন্থরগতির মূলে রয়েছে এক সঠিক ও বলিষ্ঠ শিল্পনীতির চরম অভাব। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর নতুন প্রশাসনের প্রথম পদক্ষেপ ছিল জমি নীতিতে এক অনমনীয় অবস্থান নেওয়া। সিঙ্গুর এবং নন্দীগ্রামের আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে ক্ষমতায় আসা সরকারের জন্য জমি অধিগ্রহণ ছিল একটি রাজনৈতিক স্পর্শকাতর বিষয়। কিন্তু আধুনিক ভারী শিল্প বা বৃহৎ পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য যে পরিমাণ অখণ্ড জমির প্রয়োজন হয়, তা সংগ্রহের ক্ষেত্রে সরকার কোনো স্বচ্ছ বা শিল্প-বান্ধব নীতি গ্রহণ করতে পারেনি। এর সরাসরি ফলাফল হিসেবে আমরা দেখেছি যে, টাটা মোটর্সের মতো বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগকারীরা রাজ্য ছেড়ে চলে যাওয়ার পর নতুন কোনো বৃহৎ অটোমোবাইল হাব বা ভারী ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প গোষ্ঠী বাংলায় পা রাখার সাহস দেখায়নি
এই বঙ্গে বিগত দেড় দশকের প্রতিশ্রুতিও কি শিল্প, কর্মসংস্থানের ঠিকানা
গৌতম হালদার ২৭ মার্চ ২০২৬
প্রতিশ্রুতি থেকে,প্রত্যাশা,বাস্তবতার নিরিখে আজ সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলার শিল্পের আজকের দিনের অবস্থান।
২০১১ সালের মে মাসে কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ের অলিন্দে যখন ক্ষমতার পালাবদল ঘটছিল, তখন সাধারণ মানুষের চোখে ছিল এক আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা। দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে চলা একঘেয়েমি আর শিল্প স্থবিরতার অবসানের আশায় বাংলার মানুষ এক নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে সেই স্বপ্ন আর বাস্তবের ব্যবধান মাপতে গেলে এক গভীর হতাশা গ্রাস করে। একজন সাংবাদিক হিসেবে বিগত দেড় দশকে রাজপথ থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম, চটকল থেকে চা বাগান এবং কৃষকের খামার পর্যন্ত ঘুরে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তার সারাংশ করলে দেখা যায় যে, বাংলার শিল্পায়ন কেবল উৎসবের মঞ্চে আর বিজ্ঞাপনের চকচকে পাতায় সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। ২০১১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত সময়কালকে যদি ব্যবচ্ছেদ করা হয়, তবে দেখা যাবে যে রাজ্যের শিল্পনীতি মূলত বড় লগ্নিকারীদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে এবং কর্মসংস্থানের প্রশ্নে বাংলার যুবসমাজকে এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
রাজ্যের শিল্প পরিস্থিতির এই মন্থরগতির মূলে রয়েছে এক সঠিক ও বলিষ্ঠ শিল্পনীতির চরম অভাব। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর নতুন প্রশাসনের প্রথম পদক্ষেপ ছিল জমি নীতিতে এক অনমনীয় অবস্থান নেওয়া। সিঙ্গুর এবং নন্দীগ্রামের আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে ক্ষমতায় আসা সরকারের জন্য জমি অধিগ্রহণ ছিল একটি রাজনৈতিক স্পর্শকাতর বিষয়। কিন্তু আধুনিক ভারী শিল্প বা বৃহৎ পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য যে পরিমাণ অখণ্ড জমির প্রয়োজন হয়, তা সংগ্রহের ক্ষেত্রে সরকার কোনো স্বচ্ছ বা শিল্প-বান্ধব নীতি গ্রহণ করতে পারেনি। এর সরাসরি ফলাফল হিসেবে আমরা দেখেছি যে, টাটা মোটর্সের মতো বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগকারীরা রাজ্য ছেড়ে চলে যাওয়ার পর নতুন কোনো বৃহৎ অটোমোবাইল হাব বা ভারী ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প গোষ্ঠী বাংলায় পা রাখার সাহস দেখায়নি। শিল্পপতিদের আস্থা অর্জনের বদলে সরকার কৃষিজমি রক্ষার যে অবস্থান নিয়েছিল, তা দীর্ঘমেয়াদে রাজ্যের শিল্প বিকাশের পথকে স্থায়ীভাবে রুদ্ধ করে দিয়েছে। ল্যান্ড ব্যাঙ্কের কথা বারবার সরকারি স্তরে বলা হলেও বাস্তবে বড় প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি না মেলায় বহু বিনিয়োগকারী প্রতিবেশি রাজ্য যেমন ওড়িশা বা ঝাড়খণ্ডের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
এই শিল্পহীনতার আঁচ সবচেয়ে বেশি লেগেছে কৃষি-নির্ভর শিল্প এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতে। পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্যতম প্রধান কৃষিপ্রধান রাজ্য হওয়া সত্ত্বেও গত পনেরো বছরে কৃষিভিত্তিক শিল্পে কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসেনি। আলু, ধান এবং সবজি উৎপাদনে বাংলা প্রথম সারিতে থাকলেও উপযুক্ত কোল্ড স্টোরেজ বা হিমঘর পরিকাঠামোর অভাবে প্রতি বছর টন টন ফসল নষ্ট হয়। সরকার খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে বিনিয়োগ টানার কথা বললেও বাস্তবে দেখা গেছে, কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের সঠিক দাম পাচ্ছেন না এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপটে শিল্প গড়ে তোলার মূলধন সংগ্রহ করতে পারছেন না। মালদহের আম হোক বা বর্ধমানের চাল—এই কাঁচামালগুলোকে ব্যবহার করে যে ধরনের আন্তর্জাতিক মানের ফুড প্রসেসিং ইউনিট তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তা প্রশাসনিক লাল ফিতের ফাঁসে আটকে গেছে। বড় কোম্পানিগুলো এখানে ইউনিট খুলতে ভয় পায় কারণ কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য তাদের স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা ব্যবসার খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে কৃষি আজ কেবল জীবনধারণের উপায় হয়ে রয়ে গেছে, কর্মসংস্থানের শক্তিশালী স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারেনি।
২০১২ থেকে ২০১৪ সালের কালখণ্ডটি ছিল ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ওপর অতি-নির্ভরশীলতার সময়। রাজ্য সরকার বারবার দাবি করেছিল যে বড় শিল্পের চেয়ে ছোট শিল্প বা এমএসএমই সেক্টর বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করতে সক্ষম। কিন্তু বাস্তব অর্থনৈতিক সূত্র অনুযায়ী, বড় শিল্প ছাড়া ছোট শিল্পগুলো কখনোই এককভাবে টিকে থাকতে পারে না। কারণ একটি বড় কারখানাকে কেন্দ্র করেই অসংখ্য ছোট সরবরাহকারী ইউনিট গড়ে ওঠে। হাওড়া এবং হুগলির মতো ঐতিহ্যবাহী শিল্পাঞ্চলগুলোতে যেখানে একসময় ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের বিশ্বজোড়া নাম ছিল, সেখানে গত ১৫ বছরে নতুন কোনো উন্নত প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগেনি। উল্টে কাঁচামালের আকাশছোঁয়া দাম এবং বিদ্যুতের অত্যধিক মাশুল মেটাতে গিয়ে হাজার হাজার ছোট কারখানা পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। সরকার এই সময়ে শিল্প ক্লাস্টার উন্নয়নের কথা বললেও বাস্তবে অবকাঠামো বলতে কেবল রঙিন তোরণ আর নীল-সাদা রঙ করা ভবন ছাড়া আর কিছুই দৃশ্যমান হয়নি। ফলে শ্রমিকদের কাজের সুযোগ বাড়ার বদলে তারা অসংগঠিত শ্রমিকের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন।
২০১৪ সালে ভারত সরকার যখন ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্প শুরু করে, তখন ভারতজুড়ে শিল্পায়নের এক নতুন প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে মূলত রাজ্যের প্রতিকূল ব্যবসায়িক পরিবেশের কারণে। স্থানীয় স্তরে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, সিন্ডিকেট রাজ এবং তোলাবাজির অভিযোগ শিল্পপতিদের মনে এক স্থায়ী ভয়ের সৃষ্টি করেছিল। কোনো নতুন কারখানা তৈরি করতে গেলে বা সাধারণ নির্মাণ কাজ শুরু করতে গেলে স্থানীয় স্তরে যে ধরনের হেনস্তা বা বাধার সম্মুখীন হতে হয়, তা নিয়ে অনেক বিনিয়োগকারী মাঝপথে প্রকল্প ছেড়ে চলে গিয়েছেন। এটি কেবল রাজনৈতিক অভিযোগ নয়, বরং বিভিন্ন জাতীয় স্তরের ব্যবসায়িক সংগঠনের অভ্যন্তরীণ রিপোর্টেও বারবার উদ্বেগজনকভাবে উঠে এসেছে। ফলে রাজ্যে প্রকৃত মূলধনী বিনিয়োগের পরিবর্তে কেবল রিয়েল এস্টেট বা আবাসন ব্যবসার মতো অনুৎপাদনশীল খাতে অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে।
২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে আমরা বিশ্ববঙ্গ শিল্প সম্মেলনের প্রাবল্য দেখতে পাই। রাজারহাটে প্রতি বছর জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কয়েক লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগের প্রস্তাবের দাবি করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই প্রস্তাবিত বিনিয়োগের কত শতাংশ বাস্তবে কারখানায় রূপান্তরিত হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, বাংলায় প্রকৃত বিনিয়োগ এবং নতুন কর্মসংস্থানের হার জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক নিচে অবস্থান করছে। ভারী শিল্পের অনুপস্থিতিতে রাজ্যের শিক্ষিত যুবসমাজ কেবল তথ্যপ্রযুক্তি বা পরিষেবা খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু এই আইটি সেক্টর মূলত উচ্চ শিক্ষিতদের জন্য সীমিত। রাজ্যের গ্রামীণ এবং আধা-শহর অঞ্চলের যে লক্ষ লক্ষ সাধারণ স্নাতক যুবক, তাদের জন্য কোনো মানানসই শিল্প কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। ফলে বেকারত্বের গ্রাফ ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে এবং রাজ্যে এক অস্থির সামাজিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
উত্তরবঙ্গের দিকে তাকালে দেখা যায় এক ভিন্ন ধরনের হাহাকার। বাংলার অর্থনীতির দুটি প্রধান স্তম্ভ—চা এবং পর্যটন—আজ চরম সংকটে। পাহাড় এবং ডুয়ার্সের চা বাগানগুলোতে চা শিল্পের দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের অভাবে একের পর এক বাগান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি এবং সঠিক পরিকাঠামোর অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। চা বাগানের মালিকপক্ষ অনেক ক্ষেত্রেই দায় এড়িয়ে বাগান ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, আর সরকার সেখানে কেবলমাত্র ত্রাণ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। চা শিল্পের আধুনিকীকরণ বা রপ্তানি বৃদ্ধিতে সরকারের কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ ২০২৬ সালেও দৃশ্যমান নয়। চা পর্যটন বা টি-ট্যুরিজমের কথা বলা হলেও তা বড় ব্যবসায়ীদের মুনাফার রাস্তা খুলে দিচ্ছে, সাধারণ শ্রমিকের জীবনে কোনো পরিবর্তন আনছে না। পর্যটন শিল্পটিও অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং অবকাঠামোর অভাবে শ্রীহীন হয়ে পড়ছে।
২০২০ সালের কোভিড-১৯ মহামারি রাজ্যের ভঙ্গুর শিল্প ও কর্মসংস্থান কাঠামোর কঙ্কালসার রূপটি নগ্ন করে দেয়। লকডাউনের সময় দেখা যায় যে বাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিন রাজ্যে শ্রমিকের কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। পরিযায়ী শ্রমিকদের এই বিপুল সংখ্যা প্রমাণ করে দেয় যে গত এক দশকে রাজ্যে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি বলেই গ্রামের পর গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে অন্য রাজ্যে গতর খাটতে গেছে। সংকটের সময় ফিরে আসা এই লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের জন্য রাজ্য সরকার স্থায়ী কর্মসংস্থানের কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা দিতে পারেনি। ‘কর্মসাথী’ বা ‘ভবিষ্যৎ’ প্রকল্পের মতো নামমাত্র ঋণের প্রকল্পগুলো মূলত মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত করার এক তাৎক্ষণিক মাধ্যম ছিল মাত্র। পরিযায়ী শ্রমিকদের পুনরায় ভিন রাজ্যে পাড়ি দেওয়া প্রমাণ করে যে রাজ্যে শিল্পের পরিবেশ কতটা বন্ধ্যা।
২০২১ থেকে ২০২৬ সালের বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত পরিস্থিতির কোনো গুণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি। বর্তমানে রাজ্যের অর্থনীতি মূলত কেন্দ্রীয় অনুদান এবং রাজ্য সরকারের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প বা ‘ডোল ইকোনমি’র ওপর দাঁড়িয়ে আছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বা বিভিন্ন আর্থিক সাহায্যমূলক প্রকল্পগুলো গ্রামীণ মানুষের হাতে কিছু নগদ টাকা পৌঁছে দিলেও, তা দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনতে অক্ষম। কারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লেও সেই চাহিদা মেটানোর মতো উৎপাদনশীল শিল্প রাজ্যে গড়ে ওঠেনি। ফলে বাংলার মানুষের হাতে আসা টাকা পার্শ্ববর্তী অন্য রাজ্যের উৎপাদিত পণ্য কিনতে খরচ হয়ে যাচ্ছে। এটি এক প্রকার আধুনিক অর্থনৈতিক সম্পদ নিষ্কাশন প্রক্রিয়া যা রাজ্যের নিজস্ব শিল্পকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে।
দুর্গাপুর এবং আসানসোলের মতো খনিজ ভিত্তিক শিল্পাঞ্চলেও নতুন কোনো বৃহৎ বেসরকারি বিনিয়োগ গত দশ বছরে নগণ্য। হলদিয়া শিল্পাঞ্চলেও পেট্রোকেমিক্যাল ভিত্তিক অনুসারী শিল্পের যে বিপুল সম্ভাবনা ছিল, তাও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের অভাবে থমকে আছে। তাজপুর গভীর সমুদ্র বন্দরের মতো বড় প্রকল্পের ঘোষণা কেবল বিজ্ঞাপনেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতের বর্তমান দুরবস্থা এবং কৃষি-নির্ভর শিল্পের এই করুণ চিত্র প্রমাণ করে যে, রাজ্যে কাঁচামাল থাকা সত্ত্বেও সঠিক নেতৃত্বের অভাবে তা শিল্পে রূপান্তরিত হতে পারেনি।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ব্যর্থতা হলো মেধা পাচার। বাংলার মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা শেষ করেই প্রথম সুযোগে রাজ্যের বাইরে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। ব্যাঙ্গালোর, হায়দ্রাবাদ বা পুনে আজ বাংলার সস্তা অথচ দক্ষ মেধার ওপর দাঁড়িয়ে সমৃদ্ধ হচ্ছে, অথচ বাংলা নিজের ঘরের সম্পদ ব্যবহার করতে পারছে না। এটি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, এটি একটি সামাজিক বিপর্যয়। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বাংলার শিল্প পরিস্থিতি এক গভীর খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। তথ্য ও প্রমাণ সহকারে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গ এখন মূলত একটি উপভোক্তা রাজ্যে পরিণত হয়েছে। বৃহৎ শিল্পের প্রতি অনীহা, রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য জমি সমস্যার সমাধান না করা এবং কেবল প্রচারসর্বস্ব বিজ্ঞাপনের ওপর ভিত্তি করে অর্থনীতি চালানোর খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। প্রতিটি কর্মহীন যুবকের স্বপ্নভঙ্গ আজ বাংলার পঙ্গু অর্থনীতির এক করুণ আখ্যান হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই প্রতিবেদনের শেষ কথা এটাই যে, শিল্প ছাড়া কোনো জাতির মেরুদণ্ড সোজা হতে পারে না। ২০১১ সালে পরিবর্তনের যে ডাক দেওয়া হয়েছিল, তা অন্তত শিল্পের নিরিখে এক বিশাল মরিচিকা হিসেবেই ইতিহাসে চিহ্নিত হবে। ২০২৬ সালেও বাংলার আকাশ ধোঁয়াহীন, কারখানাগুলো নিঃশব্দ এবং যুবসমাজ কর্মহীন—এই করাল সত্যকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। সাংবাদিক হিসেবে আমার কলম আজ এই কঠিন সত্যকেই তুলে ধরল, কারণ ইতিহাসের দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
মন্তব্য লেখকের ব্যাক্তিগত
We hate spam as much as you do