Tranding

07:00 AM - 19 Apr 2026

Home / Article / পরিবেশ সুরক্ষা ধ্বংস, রাজনৈতিক দূর্নীতির অন্যতম কারণ।

পরিবেশ সুরক্ষা ধ্বংস, রাজনৈতিক দূর্নীতির অন্যতম কারণ।

২০০৯ সালে ছত্তিশগড়ের কোরবায় একটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের চিমনি নির্মাণের সময় ধসে পড়ে ৪১ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। তদন্তে উঠে আসে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী এবং নিরাপত্তা বিধির চরম লঙ্ঘনের কথা।

পরিবেশ সুরক্ষা ধ্বংস, রাজনৈতিক দূর্নীতির অন্যতম কারণ।

পরিবেশ সুরক্ষা ধ্বংস, রাজনৈতিক দূর্নীতির অন্যতম কারণ।


গৌতম হালদার

Apr 17, 2026

ক্ষমতার খেলায় প্রকৃতির ক্ষতি! 

১৯৮৪ সালের ২রা ডিসেম্বর রাত—মধ্যপ্রদেশের ভোপাল শহর—একটি শিল্পনগরীর নিঃশব্দ ঘুমের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করেছিল এমন এক বিষাক্ত মৃত্যু, যার অভিঘাত আজও থামেনি। ইউনিয়ন কার্বাইড ইন্ডিয়া লিমিটেডের কারখানা থেকে প্রায় ৪০ টন মিথাইল আইসোসায়ানেট গ্যাস বেরিয়ে আসার পর সরকারি হিসেবে তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হয়েছিল প্রায় ৩,০০০ মানুষের, কিন্তু পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যে এই সংখ্যা ৮,০০০ ছুঁয়ে যায়। বিভিন্ন স্বাধীন গবেষণা এবং মানবাধিকার সংগঠনের হিসাব বলছে, দীর্ঘমেয়াদে মৃতের সংখ্যা ১৫,০০০ থেকে ২৫,০০০-এর মধ্যে। প্রায় ৫ লক্ষেরও বেশি মানুষ বিভিন্ন মাত্রায় বিষক্রিয়ার শিকার হন, যার মধ্যে কয়েক লক্ষ মানুষ আজও শ্বাসকষ্ট, চোখের সমস্যা, ক্যানসার, স্নায়বিক বিকলতা এবং প্রজননজনিত সমস্যায় ভুগছেন।
ভোপাল কেবল একটি দুর্ঘটনা ছিল না—এটি ছিল অবহেলার একটি প্রাতিষ্ঠানিক উদাহরণ। তদন্তে উঠে আসে যে, কারখানার সুরক্ষা ব্যবস্থা বহুদিন ধরেই অচল ছিল। ভেন্ট গ্যাস স্ক্রাবার কার্যত নিষ্ক্রিয়, ফ্লেয়ার টাওয়ার অচল, এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের কর্মীসংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছিল খরচ বাঁচানোর নামে। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো—কারখানার অভ্যন্তরে সংরক্ষিত বিষাক্ত রাসায়নিকের মাত্রা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় বহু গুণ বেশি ছিল, এবং সেই ঝুঁকি সম্পর্কে শীর্ষ ম্যানেজমেন্ট অবগত ছিল।
১৯৮৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের মধ্যস্থতায় ৪৭০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ চুক্তি হয়, যা বাস্তবে মাথাপিছু প্রায় ২৫,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। একটি মানবজীবনের মূল্যকে এইভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা অর্থনৈতিক বাস্তবতার তুলনায় অপমানজনকভাবে কম। আরও ভয়ংকর হলো—কারখানার চত্বরে ফেলে রাখা প্রায় ৩৫০ টন বিষাক্ত বর্জ্য আজও সম্পূর্ণরূপে অপসারণ করা হয়নি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ভোপালের আশেপাশের অন্তত ৪০টির বেশি বস্তিতে ভূগর্ভস্থ জলের নমুনায় বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি স্বাভাবিকের তুলনায় বহু গুণ বেশি।


এই ঘটনার পর ভারত সরকার পরিবেশ সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করে, কিন্তু সেই আইন কতটা কার্যকর হয়েছে, তা পরবর্তী ঘটনাগুলোই স্পষ্ট করে দেয়।


২০০৯ সালে ছত্তিশগড়ের কোরবায় একটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের চিমনি নির্মাণের সময় ধসে পড়ে ৪১ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। তদন্তে উঠে আসে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী এবং নিরাপত্তা বিধির চরম লঙ্ঘনের কথা।

২০২০ সালের ৭ই মে অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনমে একটি রাসায়নিক কারখানা থেকে স্টাইরিন গ্যাস লিক হয়ে ১৫ জনের মৃত্যু হয় এবং ১,০০০-এরও বেশি মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই কারখানার পরিবেশগত ছাড়পত্র সংক্রান্ত নথিপত্র নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।

 

২০১৮ সালে তামিলনাড়ুর থুথুকুডিতে একটি তামা প্রক্রিয়াকরণ কারখানার বিরুদ্ধে পরিবেশ দূষণের অভিযোগে প্রতিবাদ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে ১৩ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে শিল্প ও নাগরিক অধিকারের সংঘর্ষে রাষ্ট্র কোনদিকে দাঁড়ায়।


গুজরাটের আঙ্কলেশ্বর ও দাহেজ শিল্পাঞ্চলে কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের তথ্য অনুযায়ী, বহু বছর ধরে জলদূষণের মাত্রা অনুমোদিত সীমার বহু গুণ বেশি। নর্মদা ও দমন গঙ্গা নদীর জল অনেক ক্ষেত্রে শিল্পবর্জ্যে দূষিত হয়ে পড়েছে, যার প্রভাব স্থানীয় জনস্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি পড়েছে।


এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে—ভোপালের পর আইন বদলেছে, কিন্তু কাঠামো বদলায়নি। কর্পোরেট স্বার্থ, প্রশাসনিক শিথিলতা এবং রাজনৈতিক অর্থায়নের অদৃশ্য জোট এখনও একইভাবে সক্রিয় রয়েছে।
এই জাতীয় চিত্রের মধ্যে দাঁড়িয়ে বাংলার বাস্তবতা এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে, যেখানে বড় শিল্প দুর্ঘটনার পরিবর্তে ছোট কিন্তু ধারাবাহিক বিস্ফোরণ সাধারণ মানুষের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৩ সালের মে মাসে পূর্ব মেদিনীপুরের এগরায় একটি অবৈধ বাজি কারখানায় বিস্ফোরণে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয় এবং বহু মানুষ আহত হন। একই বছরের পরবর্তী সময়ে উত্তর ২৪ পরগনার দত্তপুকুরে বিস্ফোরণে আরও ৮ জন প্রাণ হারান।


বিভিন্ন প্রশাসনিক সূত্র এবং সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৬,০০০ থেকে ৭,০০০ অবৈধ বাজি কারখানা সক্রিয় রয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশই জনবসতির মধ্যে অবস্থিত। এই কারখানাগুলোতে ব্যবহৃত পটাশিয়াম ক্লোরেট, সালফার এবং অন্যান্য দাহ্য রাসায়নিকের সংরক্ষণ ও ব্যবহারে কোনো বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড মানা হয় না। ফলস্বরূপ, সামান্য স্ফুলিঙ্গ থেকেও ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
পরিবেশগত দিক থেকে এই শিল্পের প্রভাবও মারাত্মক। বায়ুদূষণের মাত্রা উৎসবের সময় পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শহরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার কয়েকগুণ বেশি হয়ে যায়। শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা এবং হৃদরোগের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।


কেন এই অবৈধ শিল্প বন্ধ হচ্ছে না?


এর উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, এই শিল্পের সাথে যুক্ত রয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক কাঠামো, প্রশাসনিক স্তরের দুর্নীতি, এবং নির্বাচনী অর্থনীতির এক জটিল সম্পর্ক। অবৈধ কারখানাগুলো থেকে সংগৃহীত অর্থ স্থানীয় স্তর থেকে উপরের স্তর পর্যন্ত পৌঁছায়—এবং এর বিনিময়ে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত শিথিলতা দেখা যায়।
আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতাও একটি বড় কারণ। বিস্ফোরণের পর তদন্ত শুরু হলেও চার্জশিট দাখিল হতে বছরের পর বছর লেগে যায়, এবং সেই সময়ের মধ্যে প্রমাণ নষ্ট হয়ে যায় বা সাক্ষীরা মুখ ফিরিয়ে নেয়। ফলে অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে আবার একই কার্যকলাপে ফিরে যায়।

 

এই পুরো চিত্রটিকে যদি ১৯৮৪ সালের ভোপালের সাথে মিলিয়ে দেখা যায়, তাহলে একটি স্পষ্ট ধারাবাহিকতা চোখে পড়ে—সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু মানুষের জীবনের মূল্য নির্ধারণের কাঠামো বদলায়নি। সেখানে এখনও অর্থ এবং রাজনৈতিক স্বার্থই শেষ কথা বলে।
ভারতের সংবিধান নাগরিকদের জীবন ও নিরাপত্তার অধিকার দেয়, কিন্তু বাস্তবে সেই অধিকার বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ে যখন শিল্প নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা একইসাথে ব্যর্থ হয়।


আজকের বাস্তবতা আমাদের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরে—উন্নয়ন কি মানুষের জীবনকে সুরক্ষিত করছে, নাকি সেই জীবনকেই বিপন্ন করে তুলছে? যদি উন্নয়নের মূল্য হিসেবে আমাদের গ্রহণ করতে হয় দূষিত জল, বিষাক্ত বাতাস এবং অনিশ্চিত জীবন, তাহলে সেই উন্নয়ন আসলে কার জন্য?
ভোপাল থেকে দত্তপুকুর—এই দীর্ঘ ৪৪ বছরের ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে যে আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, তার কার্যকর প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছাই আসল চাবিকাঠি। যতদিন না সেই সদিচ্ছা বাস্তবে প্রতিফলিত হচ্ছে, ততদিন এই ধরনের বিপর্যয় থামবে না—শুধু স্থান ও নাম বদলাবে।


 তাই কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, বর্তমানের সতর্কবার্তা—যেখানে প্রতিটি অবহেলা, প্রতিটি আপস, এবং প্রতিটি নীরবতা ভবিষ্যতের আরেকটি ভোপাল তৈরি করছে।

Your Opinion

We hate spam as much as you do