১৯৪৬ সালের ১৩ঐ ডিসেম্বর জওহরলাল নেহরু সংবিধান সভার লক্ষ্য ও উদ্দ্যেশ্য উপস্থাপিত করার সাথে সাথে এও দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন যে ভারত সেই সমস্ত রাজ্যক্ষেত্রের একটি সংঘ হবে যারা স্বেচ্ছায় এই 'স্বাধীন সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র' এ যোগদান করবে । অর্থাৎ বিভিন্ন প্রদেশ ও রাজ্যক্ষেত্রের একত্রীকরণ ও মিলনসাধনের উপরেই জোর দেওয়া হয়েছিল যাতে একটি মজবুত ঐক্যবদ্ধ দেশ গড়ে তোলা যায়।
Central Government নয় Union Government কথাটাই সংবিধানের মূল সুর বহন করে
'Union Government' বা ' ঐক্যবদ্ধ সরকার ' কথাটির মধ্যে একীকরণের বার্তা আছে__________________________________
'কেন্দ্র' কথাটি সংবিধানে নেই কারণ সংবিধান সভা ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ চায়নি
--------------------------------------------------------
যোগাযোগের ক্ষেত্রে সরকারি ভাবে নথি-পত্রাদি তে 'কেন্দ্রীয় সরকার' (Central Government) লেখার বদলে 'ঐক্যবদ্ধ
সরকার' (Union Government) লেখা শুরু করার যে সিদ্ধান্ত তামিলনাড়ু সরকার নিয়েছে , তা সংবিধান সম্পর্কে
সচেতনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সংবিধান প্রণয়নের একাত্তর বছর পর আজ সময় এসেছে
আমাদের সংবিধান প্রণেতাগণের প্রকৃত অভিপ্রায়কে পুনরায় অনুধাবন করার যা তাঁরা সংবিধানে র ১ নম্বর অনুচ্ছেদে
লিপিবদ্ধ করেছেন এই বলে , "ইন্ডিয়া, বা ভারত, কতকগুলি রাজ্যের একটি সংঘ হবে ”। রাষ্ট্র বিজ্ঞানের কোনও ছাত্র যদি
'কেন্দ্রীয় সরকার' (Central Government) কথাটির উৎস অনুসন্ধান করতে চান, সংবিধান তাঁকে হতাশ করবে কারণ
সংবিধানসভা মূল সংবিধানের ২২ টি ভাগের ৩৯৫ টি অনুচ্ছেদ এবং ৮টি তফসিলের কোথাও 'কেন্দ্র' (Centre) অথবা
'কেন্দ্রীয় সরকার' (Central Government) শব্দবন্ধের ব্যবহার করেনি । আমাদের যা আছে তা হল 'সংঘ' (Union)
এবং 'রাজ্য', যে খানে সংঘের কার্যনির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী রাষ্ট্রপতি , যিনি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রীপরিষদের
সাহায্য এবং পরামর্শক্রমে কার্য পরিচালনা করবেন। তাহলে কেনো
কোর্ট, সংবাদ মাধ্যম এমনকি রাজ্যগুলি ও 'ঐক্যবদ্ধ
সরকার' (Union Government) কে 'কেন্দ্র' (center) বলে সম্বোধন করবে ?
যদি ও সংবিধানে 'কেন্দ্রীয় সরকার' বা 'Central Government' বলে কোনো কিছুর উল্লেখ নেই, তবে ১৮৯৭ সালের 'জেনারেল ক্লজেস আইন' এ এর একটা সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে । সমস্ত ব্যবহারিক উদ্দ্যেশ্যে , সংবিধান কার্যকর হওয়ার পর
থেকে 'কেন্দ্রীয় সরকার' বলতে বোঝায় রাষ্ট্রপতিকে । অতএব এখন প্রশ্ন হল, এহেন একটি সংজ্ঞা কি আদৌ সাংবিধানিক ?
যেখানে সংবিধান নিজেই ক্ষমতার কেন্দ্রীয়করণকে মান্যতা দেয়নি ।
সংবিধান সভার প্রকৃত অভিপ্রায় ১৯৪৬ সালের ১৩ঐ ডিসেম্বর জওহরলাল নেহরু সংবিধান সভার লক্ষ্য ও উদ্দ্যেশ্য উপস্থাপিত করার সাথে সাথে এও দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন যে ভারত সেই সমস্ত রাজ্যক্ষেত্রের একটি সংঘ হবে যারা স্বেচ্ছায় এই 'স্বাধীন সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র' এ যোগদান করবে । অর্থাৎ বিভিন্ন প্রদেশ ও রাজ্যক্ষেত্রের একত্রীকরণ ও মিলনসাধনের উপরেই জোর দেওয়া
হয়েছিল যাতে একটি মজবুত ঐক্যবদ্ধ দেশ গড়ে তোলা যায়।
সংবিধান সভার অনেক সদস্যই মতপোষণ করেছিলেন যে ক্যাবিনেট
মিশন (১৯৪৬) এর নীতি গুলি কে গ্রহণ করা হোক, যেখানে এমন একটি ব্যবস্থার কথা বলা হয়ে ছিল যাতে কেন্দ্রীয় সরকারর হাতে থাকবে সীমিত ক্ষমতা আর প্রদেশগুলির থাকবে যথেষ্ট পরিমাণ সায়ত্বশাসন । কিন্তু দেশভাগ ও ১৯৪৭ সালের হিংসার ঘটনা সংবিধান সভাকে তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করে এবং তা মজবুত কেন্দ্র সরকার তৈরির সংকল্প গ্রহণ করে । সংবিধানের খসড়া
রূপায়নকারীদের মনে রাজ্যগুলির সংঘ (Union) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার বিষয়টি চেপে বসে এবং তাঁরা
সংবিধানে এটি নিশ্চিত করেন যে ভারতীয় সংঘ (Indian Union) হল "অবিনশ্বর" (indestructible) অর্থাৎ রাজ্যগুলি ভারতের অবিচ্ছিন্ন অংশ। খসড়া কমিটির চেয়ারম্যান বি.আর. আম্বেদকর সংবিধান সভায় বলেন যে সর্বোপরি "ভারত কতকগুলি রাজ্যের একটি ইউনিয়ন হবে " এই কথাটিতে 'ইউনিয়ন ' শব্দটি পরামর্শক্রমে ব্যবহার করা হয়েছে সংঘ থেকে রাজ্যগুলির বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার অধিকারকে নাকচ করতে
। আম্বেদকর সংবিধানে লিপিবদ্ধ "কতকগুলি রাজ্যের একটি
ইউনিয়ন" (Union of States) কথাটির ব্যবহারের যথার্থতা সমর্থন করে বলেন যে খসড়া কমিটি এটি পরিষ্কার করে বলতে চেয়েছে যে যদিও ভারত একটি যুক্তরাষ্ট্র, তবুও কোনো রাজ্যের এর থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার কোনো অধিকার নেই,কারণ ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র একক গুলির মধ্যে কোনো চুক্তির মাধ্যমে তৈরি হয়নি । আম্বেদকর এর মতে "এই যুক্তরাষ্ট্রটি একটি ইউনিয়ন কারণ এটি অবিনশ্বর"। আম্বেদকর কর্তৃক ব্যবহৃত "কতকগুলি রাজ্যের একটি ইউনিয়ন " কথাটি সবাই মেনে নিতে পারেননি শুধু তাই নয়, এটি সমালোচিতও হয়েছিল। হাসরত মোহানি বলেছিলেন যে আম্বেদকর সংবিধানের নিজস্ব প্রকৃতি কেই পরিবর্তন করে দিচ্ছেন। ১৯৪৯ সালের ১৮ ই সেপটেম্বর সংবিধান সভায় এক জ্বালাময়ী বক্তৃতায় মোহানি কঠোরভাবে বলেন যে সংবিধানে "কতকগুলি রাজ্যের একটি ইউনিয়ন" কথাটির ব্যবহার 'প্রজাতন্ত্র' শব্দটির অর্থকে অস্পষ্ট করে দেবে । মোহানি এমনকি একথাও বলেন যে আম্বেদকর "ইউনিয়ন" বলতে চাইছেন "জার্মানির যুবরাজ বিসমার্ক এর
প্রস্তাবিত সংঘের মত কিছু একটা, এবং যেটি পরে কাইজার উইলিয়াম এবং আরও পরে অ্যাডলফ হিটলার গ্রহণ করেন"।
মোহানি আরও বলেন, "তিনি (আম্বেদকর) চান সমস্ত রাজ্যগুলি একটি নির্দিষ্ট শাসনের অধীনে আসুক এবং যে টিকে আমরা
বলতে পারি সংবিধানের বিজ্ঞপ্তি বা Notification of the Constitution। আমার মনে হয় ডক্টর আম্বেদকর এই মতাদর্শেরও পক্ষে , এবং তিনি এই রকমে রই একটি সংঘ চান। তিনি সমস্ত প্রদেশ, রাজ্যসমষ্টি সহ সকল একককে কেন্দ্রের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের অধীনে আনতে চান"। যদিও আম্বেদকর পরিষ্কার করে বলেন " 'ইউনিয়ন কোনো রাজ্যসমূহের লীগ নয়, যেগুলি কোনো আলগা সম্পর্কের দ্বারা একত্রিত। আবার রাজ্যগুলিও সংঘের প্রতিনিধি নয় এবং তাদের ক্ষমতা তারা ইউনিয়ন থেকে পেয়ে থাকে না। ইউনিয়ন এবং রাজ্য উভয়েই সংবিধান কর্তৃক সৃষ্ট এবং উভয়েই তাদের ক্ষমতা সংবিধান থেকেই নিয়ে থাকে ।
কেউই তার নিজের কার্যক্ষেত্রে অপরটির অধীনস্থ নয়… প্রত্যেকে তার নিজের ক্ষমতার সাথে অপরের ক্ষমতার সমন্বয়
রেখে চলে । ইউনিয়ন ও রাজ্যে র মধ্যে ক্ষমতার বিভাজন শুধুমাত্র শাসন বিভাগীয় ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। সংবিধানে বিচার
বিভাগকে যেভাবে স্থান দেওয়া হয়েছে , তা'তে এটি নিশ্চিত করা
হয়েছে যে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের, হাইকোর্টের কাজের উপর কোনো তত্বাবধানমূলক এক্তিয়ার নেই। যদিও শুধু হাইকোর্ট নয়, অন্যান্য সমস্ত কোর্ট ও ট্রাইব্যুনালের উপর সুপ্রিম কোর্টের আপিল এক্তিয়ার আছে , তবুও এগুলি সুপ্রিম কোর্টের অধীনস্থ বলে উল্লিখিত নয়।
বাস্তবিক পক্ষে , জেলা ও অধীনস্থ কোর্ট গুলির উপর তত্বাবধানমূলক ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আজ্ঞালেখ (Prerogative Writs) জারি করার ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের থেকে হাইকোর্ট বেশি ক্ষমতার অধিকারী। সংসদ ও বিধানসভা নিজেদের এক্তিয়ার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল এবং বিভিন্ন বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কেউ একে অপরের এক্তিয়ার লঙ্ঘন করে না। যদি ও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে দুই এর মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হলে সংসদ এর আইনই বৈধ বলে গণ্য হবে ।
শব্দের খেলা
সংবিধান সভার সদস্যরা 'কেন্দ্র' বা 'কেন্দ্রীয় সরকার' শব্দগুলি ব্যবহার না করার ব্যাপারে ভীষণ সতর্ক ছিলেন কারণ
তাঁরা কোনো একটি এককে র হাতে সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার প্রবণতাটিকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন। 'ঐক্যবদ্ধ
সরকার' (Union Government) বা 'ভারতের সরকার' (Goverment of India) শব্দগুলির মধ্যে একটি একীকরণ
এর বার্তা আছে , কারণ এর মাধ্যমে এটি প্রতিফলিত হয় যে এই
সরকার সকলের।
যদি ও যুক্তরাষ্ট্রীয় ধারণা এই সংবিধানর মৌলিক বৈশিষ্ট্য এবং এটিকে পরিবর্তন করা যাবে না, তাহলে এখন যেটা দেখার যে এই সংবিধান থেকে যাঁরা ক্ষমতা অর্জন করছেন তাঁরা এই যুক্তরাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্যকে নিরাপদ রাখতে আগ্রহী কি না।
ননি পালকিওয়ালা যেমনটি বলেছিলেন, "এই বিরক্তিকর সমস্যার একমাত্র সন্তোষজনক ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান ঐ বিধিক বইটিতে পাওয়া যাবে না, পাওয়া যাবে যাঁরা ক্ষমতায় আসীন তাঁদের বিবেকে "।
---------------------------------------------------------
The Hindu পত্রিকায় ইংরাজিতে প্রকাশিত
We hate spam as much as you do