Tranding

03:20 PM - 04 Feb 2026

Home / National / ইতিহাস বিকৃতি! NCERTর দ্বাদশ শ্রেনীর বই থেকে মুঘল সময় বাদ।

ইতিহাস বিকৃতি! NCERTর দ্বাদশ শ্রেনীর বই থেকে মুঘল সময় বাদ।

জানা যাচ্ছে, দ্বাদশ শ্রেণির ইতিহাস বই 'Themes of Indian History-Part 2' বিভাগ থেকে 'Kings and Chronicles; the Mughal Courts (C. 16th and 17th centuries)' শীর্ষক অধ্যায়টি সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

ইতিহাস বিকৃতি! NCERTর দ্বাদশ শ্রেনীর বই থেকে মুঘল সময় বাদ।

ইতিহাস বিকৃতি! NCERTর দ্বাদশ শ্রেনীর বই থেকে মুঘল সময় বাদ।

5 এপ্রিল 2023

আশঙ্কাই সত্যি হল! মোদী জমানায় বদলে গেল ইতিহাসের সিলেবাস। ইতিহাসের পাঠ্যবই থেকে মুছে গেলেন মুঘলরা।
   

সংবাদমাধ্যম দখল করে গেরুয়া গৌরবগাথা ছড়িয়েই শেষ হচ্ছে না, ইতিহাসের সিলেবাস বদলে দেওয়ার সরকারি খবরদারিও শুরু হয়ে গেল।
অনেক দিন ধরেই বিভিন্ন মহলে এই প্রশ্ন উঠছিল, মোদী জমানায় কি দেশের ইতিহাসটাই পালটে যাবে?
ইতিহাসের পাঠ্যবই থেকে হারিয়ে যাবেন মুঘলরা?

'Untill the lion learns to write every story will glorify the hunter.' আফ্রিকা মহাদেশের এই প্রবাদ বাক্যটি আবার প্রমাণিত হল। সংবাদমাধ্যম দখল করে গেরুয়া গৌরবগাথা ছড়িয়েই শেষ হচ্ছে না, ইতিহাসের সিলেবাস বদলে দেওয়ার সরকারি খবরদারিও শুরু হয়ে গেল। অনেক দিন ধরেই বিভিন্ন মহলে এই প্রশ্ন উঠছিল, মোদী জমানায় কি দেশের ইতিহাসটাই পালটে যাবে? ইতিহাসের পাঠ্যবই থেকে হারিয়ে যাবেন মুঘলরা?

জানা যাচ্ছে, দ্বাদশ শ্রেণির ইতিহাস বই 'Themes of Indian History-Part 2' বিভাগ থেকে 'Kings and Chronicles; the Mughal Courts (C. 16th and 17th centuries)' শীর্ষক অধ্যায়টি সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।  

ব্রাত্য হয়ে যাবেন আলাউদ্দিন খলজি, রাজিয়া সুলতানা, শের শাহ, আকবরের মতো ঐতিহাসিক চরিত্ররা? সংগ্রাম সিংহর ইতিহাস থাকবে বাবর ছাড়া? হুসেন শাহ ছাড়া কি শশাঙ্কর ইতিহাস সম্পূর্ণ হতে পারে, যেমন ঔরঙ্গজেব ছাড়া পৃথ্বীরাজ চৌহানের ইতিহাস? মধ্যযুগ অসম্পূর্ণ অধ্যায় পাঠ করেই কি ভারতের ইতিহাস ব্রিটিশ শাসনের যুগে ঢুকে পড়বে? হ্যাঁ, তাই হবে। এবার সরকারিভাবে সেকাজে হাত পড়েছে।

এনসিইআরটি ঘোষণা করেছে, দ্বাদশ শ্রেণির ইতিহাসের পাঠ্যসূচিতে আর পড়তে হবে না মুঘল সাম্রাজ্য নিয়ে। ইতিহাস বই থেকে প্রায় ৫০০ বছরের অধ্যায় এককোপে বাদ। অর্থাৎ এখন থেকে দেশের যে সব স্কুলে ন্যাশানাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (এনসিইআরটি)-এর বই পড়ানো হয়, সেখানে ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ পড়ল মুঘল যুগ।

শুধু তাই নয়, পাঠক্রম থেকে বাদ পড়ছে শিল্পবিপ্লব, জনপ্রিয় সংগ্রাম ও আন্দোলন, গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদ, গণতন্ত্রের বিপদ সংক্রান্ত আলোচনার মতো বেশ কিছু অধ্যায়। বাদ পড়ছে হিন্দি পাঠ্যপুস্তক থেকেও বেশ কিছু কবিতা ও অনুচ্ছেদ। ইতিহাস ও হিন্দি বই ছাড়া, দ্বাদশ শ্রেণির 'সিভিকস' বইয়ের বেশ কিছু বিষয় পরিবর্তন করছে এনসিইআরটি।

সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বই থেকে 'আমেরিকান হেজিমনি ইন ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স' এবং 'দ্য কোল্ড ওয়ার এরা' নামের দুটি অধ্যায় সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দ্বাদশ শ্রেণির পাঠ্যবই থেকে 'স্বাধীনতার পরে ভারতীয় রাজনীতি', 'জনপ্রিয় আন্দোলনের উত্থান' এবং 'এক পক্ষের আধিপত্যের যুগ'-এর মতো অধ্যায়েরও পরিবর্তন করা হয়েছে।

স্বাভাবিক ভাবেই, এই সিদ্ধান্ত ঘিরে শুরু হয়ে গিয়েছে বিতর্ক। এই বাদ দেওয়ার কারণগুলো না জানিয়ে এভাবে ভারতের ধারাবাহিক ইতিহাস থেকে একটা বিরাট কালপর্ব বাদ দেওয়া সিলেবাসে গৈরিকীকরণেরই নামান্তর বলে অনেকে মনে করছেন। দেশের প্রগতিশীল ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষাবিদদের মতে, গেরুয়াকরণ ও সাম্প্রদায়িকীকরণ পুরোদস্তুর শুরু করে দিল নরেন্দ্র মোদী সরকার।

এঁদের মতে, এই চেষ্টা চলছিল বহুদিন ধরেই, তা বাস্তবেই কার্যকর করে ছাড়ল সরকার। এটা ঘটনা, আরএসএস স্কুলিংয়ের গেরুয়া শিবির মুঘলদের বহিরাগত বলে আসছে বহুদিন ধরে। কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করা যাচ্ছিল, অমিত শাহ-সহ বিজেপির অনেক নেতা ও মন্ত্রী পাঠক্রম বদলের কথা বলে আসছিলেন। নতুন শিক্ষানীতি ঘোষণার পর তাঁরা একাধিকবার নয়া ইতিহাস লেখার আহ্বান জানিয়ে সেই রাস্তাটা তৈরি করছিলেন। সেই পিচেই ব্যাট করছে এনসিইআরটি।

আর উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথের সরকার তা কার্যকর করার নোটিশও জারি করে দিয়েছে। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে তা চালু হয়ে যাবে। শিক্ষা যেহেতু সংবিধানের যুগ্ম তালিকায় তাই কেন্দ্র এটাকে সব রাজ্যের ওপর চাপাতে পারছে না, তবে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে কার্যকর হবে। আগামী শিক্ষাবর্ষে হয়তো অসম, ত্রিপুরা, উত্তরাখণ্ড, জিতে এলে কর্নাটকেও তা চালু হবে।

এ প্রসঙ্গে আমাদের মনে রাখা উচিত, রাজস্থানের বসুন্ধরা রাজের সরকার হলদিঘাট যুদ্ধের ইতিহাস পালটে ফেলেছে আগেই। বিজেপি শাসিত এই রাজ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হচ্ছে, হলদিঘাটে যুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন মহারানা প্রতাপ সিংহ। পরাজিত হয়েছিলেন মুঘল সম্রাট আকবর। এই পদক্ষেপ কাকে গ্লোরিফাই করার জন্য কে জানে?

রাজস্থানে পরে পরেই বিজেপি শাসিত মহারাষ্ট্র সরকার স্কুলের ইতিহাস বই থেকে মুঘল সাম্রাজ্য সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সম্প্রতি রাজ্যের অষ্টম ও নবম শ্রেণির ইতিহাস পাঠ্য বই সংশোধন করেছে মহারাষ্ট্র সরকার। সংশোধিত পাঠ্যবইয়ে মুঘল সাম্রাজ্য সম্পর্কে কার্যত কোনও তথ্যই নেই ইতিহাস বইয়ে।

কেবলমাত্র তিনটি লাইন জুটেছে। মুঘল সাম্রাজ্যের বদলের ইতিহাসের পাঠ্য বইয়ে ঢোকানো হয়েছে মরাঠা সাম্রাজ্যের ইতিহাস। তখন থেকেই অষ্টম ও নবম শ্রেণির পড়ুয়াদের পড়ানো হতে থাকে, সম্রাট আকবর নাকি ভারতে একটি কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা চালু করার চেষ্টা করেছিলেন। অথচ আগে আকবরকে উদার ও সহনশীল শাসক বলেই উল্লেখ করা হত ইতিহাসের পাঠ্য বইয়ে।

অন্যদিকে, ইতিহাসের পাতায় জনগণের রাজা থেকে আদর্শ শাসক হয়ে উঠেছেন ছত্রপতি শিবাজী। তবে শুধু মুঘলরাই নন, তারও আগে আলাউদ্দিন খলজি, রাজিয়া সুলতানা বা শের শাহের মতো যেসব শাসকরা এদেশে রাজত্ব করেছিলেন, কোপ পড়েছে তাঁদের ওপরও। অনিবার্য ভাবেই মহারাষ্ট্র সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন একাংশ ইতিহাসবিদ।

তাঁদের বিবেচনায়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই ইচ্ছাকৃতভাবে ইতিহাসকে বিকৃত করছে মহারাষ্ট্র সরকার। মহারাষ্ট স্টেট ব্যুরো অফ টেক্সবুক প্রোডাকশন অ্যান্ড ক্যারিকুলাম রিসার্চের ইতিহাস বিষয়ক কমিটির মাথারা যদিও সরকারের সিদ্ধান্তকে দু'হাত তুলে সমর্থন করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, মহারাষ্ট্রকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই স্কুলপাঠ্য ইতিহাস বই সংশোধন করা হয়েছে। দিল্লিতে সুলতানি শাসনের ইতিহাসই হোক কিংবা মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস, সবক্ষেত্রেই প্রধান্য পেয়েছে মহারাষ্ট্র।

এবারে এনসিইআরটি'র ইতিহাস, সিভিক সিলেবাস বদল নিয়ে সাফাই দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর দীনেশপ্রসাদ সাকলানি। তাঁর যুক্তি, এর মধ্যে কোনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা বিশেষ একটি ভাবধারা ইঞ্জেক্ট করার ব্যাপার নেই। এইসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলেও তিনি দাবি করেছেন। তবে সাকলানি একটা অজুহাত খাড়া করেছেন।

কোভিড অতিমারীর কারণে পড়ুয়াদের স্কুল দিনের পর দিন বন্ধ রাখতে হয়। তাদের যথাযথ কোর্স শেষ করানো যায়নি। ফলে ছাত্রছাত্রীরা যাতে সিলেবাসের বোঝায় ন্যুব্জ না হয়ে যায়, অবসাদে না ভোগে, তাই সিলেবাসে কাটছাঁট করা হয়েছে। এই যুক্তি শুনতে ভালো এবং নির্বিষ। কিন্তু বাস্তবিক কি তাই? আমাদের দিনপ্রতিদিনের অভিজ্ঞতা বলছে, এক সর্বৈব হিন্দুয়ানা প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া সরকার।

তারই ম্যানিফ্যাস্টেশন এই নয়া সিলেবাস। এখন এনসিইআরটি দ্বাদশের সিলেবাসে অন্তর্ঘাত চালাচ্ছে, এরপরে সেভেন-এইটের সিলেবাসেও একই কাণ্ড করা হবে। তথ্যপ্রমাণ, দলিল, শিলালিপি, লেখ, প্রত্নসামগ্রী - সব সরিয়ে রেখে গেরুয়া সারস্বত সাধনা। আমাদের মনে রাখা উচিত, ইতিহাস কাল ও সময় নিরপেক্ষ হতে পারে না। শিক্ষা একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সরকার যত এককেন্দ্রিক হবে, তত শিক্ষার অভিমুখ হবে একমুখী। তারই নান্দীমুখ এনসিইআরটি'র এই পদক্ষেপ। যোগী শুরু করে দিয়েছেন, অন্যরা কদমতল করছেন।

Your Opinion

We hate spam as much as you do