৫২-র ঝোড়ো ফেব্রুয়ারিতে যে রক্তস্নাত দিন এসেছিল,আজও তার চেতনা অম্লান,বহমান। ইতিহাসের কালচক্রের দিকে সনির্বন্ধ দৃষ্টিতে তাকালে বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে তুলে ধরার শুরুয়াৎ হয় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষতে মাওলানা আক্রাম খাঁ-এর প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে,সালটা ১৯৩৭। ইতিহাসের জল গড়িয়ে আজ যে দেশভাগের ৭৫ বছর আমরা অতিক্রম করছি সেই দেশভাগের ঘৃতাহুতিতেই ভাষা আন্দোলনের ঢেউ উঠতে থাকে ক্রমান্বয়ে। ১৯৪৭ সালে করাচিতে শিক্ষা সম্মেলনে দাবী ওঠে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের। এরপর পরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগে বিভাগে উত্তাল সমাবেশের সূচনা
একুশের চেতনায় আজকের সংগ্রাম
শঙ্খজিৎ দে
মাস দুয়েক আগে 'মাশা আমিনি' হত্যার প্রতিবাদে যখন হাজারো লাখো বিশ্ব-ফুটবলের দর্শক কে কার্যত স্তম্ভিত করে ইরানের ফুটবলারেরা কাতারের সবুজ গালিচায় দাঁড়িয়ে তাদের জাতীয় সঙ্গীত গাইতে অস্বীকার করে নীরবতা পালন করছিল,তাদের অস্থির হৃদয় ফেটে বেরিয়ে আসছিল এক আশ্চর্য ভাষা। আমরা যারা মিছিলে হাঁটা লোক,সারা পৃথিবীজুড়ে যৌবনের প্রথম অব্দে ওয়ালস্ট্রিট অকুপাই,দ্বিতীয় অব্দে এন আর সি বিরোধী আন্দোলন,পরপর ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলন,কিউবার সংহতির স্বপক্ষে আন্দোলন কিম্বা এই সেদিন বোলসেনারোর অপসারণের পর বামপন্থী লুলা-র সরকার রক্ষার আন্দোলন দেখতে দেখতে বড় হয়েছি তাদের কাছে এই আচ্ছন্ন নীরবতার ভাষা সহজবোধ্য। যেকোনো ভাষা-ই আন্তর্জাতিক স্পন্দন সমৃদ্ধ ব্যবহারিক মাধ্যম। সমস্ত ভাষার মধ্যেই ততক্ষণ আন্তর্জাতিকতার স্নায়ুরা নিহিত যতক্ষণ তা শোষিতের ভাষা,যতক্ষণ তা শোষিত মানুষের অভিব্যক্তি।
প্যারি কমিউনের অদম্য যোদ্ধা ইউজিন পটিয়ার যখন আন্তর্জাতিক সঙ্গীত লিখছিলেন,তিনি কি জানতেন মাইল মাইল দূরত্বের কোনো এক হাহুতাশ পূর্ণ গ্রামীণ জনপদের মেঠো হাওয়ায় কোনো এক পাঁজর বের হয়ে থাকা ন্যুব্জ ছেলেটি তার প্রিয় কমরেড-কে বিদায় জানানোর ক্ষণে মন্ত্রের মতো গেয়ে উঠবে,'জাগো জাগো জাগো সর্বহারা/অনশণ বন্দী ক্রীতদাস...'
৫২-র ঝোড়ো ফেব্রুয়ারিতে যে রক্তস্নাত দিন এসেছিল,আজও তার চেতনা অম্লান,বহমান। ইতিহাসের কালচক্রের দিকে সনির্বন্ধ দৃষ্টিতে তাকালে বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে তুলে ধরার শুরুয়াৎ হয় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষতে মাওলানা আক্রাম খাঁ-এর প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে,সালটা ১৯৩৭। ইতিহাসের জল গড়িয়ে আজ যে দেশভাগের ৭৫ বছর আমরা অতিক্রম করছি সেই দেশভাগের ঘৃতাহুতিতেই ভাষা আন্দোলনের ঢেউ উঠতে থাকে ক্রমান্বয়ে। ১৯৪৭ সালে করাচিতে শিক্ষা সম্মেলনে দাবী ওঠে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের। এরপর পরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগে বিভাগে উত্তাল সমাবেশের সূচনা। এরপর পূর্ব পাকিস্তানের সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবিত বাংলাকে জাতীয় ভাষা করার দাবী পরবর্তীতে মুজিবুর রহমান,গোলাম মাহবুব দের নেতৃত্বে লাগাতার হরতাল, ধর্মঘট ও আন্দোলন। বাকি ইতিহাস সকলের জানা।
১৯৫২-র ২১ ফেব্রুয়ারী...কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য এবং ছাত্রনেতা আব্দুল মতিনের প্রস্তাবানুসারে ১৪৪ ধারা অমান্য করার সিদ্ধান্ত নিয়ে মিছিল শুরু হয়। প্রথমে পুলিশ লাঠি ও পরে কাঁদানে গ্যাসের সেল ফাটিয়ে আন্দোলনকারীদের বিচ্ছিন্ন করতে থাকে। এরই মধ্যে চলতে থাকে নির্বিচারে গুলি। গুলিতে প্রাণ হারান ৫ জন,আহত হন ১৭ জন এবং অগণিত ভাষা সৈনিক গ্রেপ্তার হন। সারা পৃথিবীর ইতিহাসে শোষিত মানুষের আন্দোলনের ব্যাকরণে ঐতিহাসিক দিগন্তের সূচনা হয় এই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে।
আব্দুল জব্বার,আবুল বরকত, রফিকউদ্দিন আহমেদ,আবদুস সালাম এবং আহিউল্লাহ নামের একটি শিশু শহীদ হয়। পরেরদিন শহীদ হন শফিউর রহমান এবং পেশায় রিক্সাচালক আউয়াল। ছাত্রদের সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষের রক্তেও সেদিন প্লাবিত হয়েছিল ঢাকার রাস্তা,আসলে সারা দুনিয়ার সাম্রাজ্যবাদের উঠোন।
৫২-র ভাষা আন্দোলন কে শুধুমাত্র একটি ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করলে আমরা বস্তুগতভাবে ভুল করব। আসলে এই আন্দোলন সার্বিক গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছিল যা ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পদক্ষেপ। শুধুমাত্র ভাষা কে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদ এবং স্বাধীনতার নিরবচ্ছিন্ন লড়াই হতে পারে তার সম্ভাবনা প্রসব করেছে ৫২-র আন্দোলন-ই। এই আন্দোলন নিশ্চিতভাবে ঐতিহাসিক নৈরাজ্য সৃষ্টি করেতো নিই,সঙ্গে সঙ্গে এই আন্দোলন হঠাৎ তৈরী হওয়া স্ফুলিঙ্গ-ও নয়। এর বস্তুগত এবং ঐতিহাসিক ভিত্তির প্রেক্ষাপটকে আজকের আলোচনায় আনা দরকার।
মানবসভ্যতার বিবর্তনের দিকে তাকালেই এর আন্দোলনের প্রেক্ষাপট এবং আন্দোলনের ঐতিহাসিক সূত্রের কথা খানিকটা বুঝতে পারব। আমরা সবাই জানি,রাতারাতি কোনো বাগদেবী, বাকযন্ত্রে এসে বসলেন আর ভাষার জন্ম হয়ে গেল —ব্যপারটা আদৌ তা নয়। আদিম গুহাসভ্যতার যুগ থেকে যখন মানুষ তার হাতদুটোকে মুক্ত করতে পেরেছে এবং যখন থেকে সে শ্রমের মাধ্যমে প্রকৃতিকে জয় করতে শিখেছে, সে বুঝেছে একা একা এইসব প্রতিকূলতা জয় করা সম্ভব নয়! সময়ের দাবী মেনেই মানবসভ্যতায় গোষ্ঠীসভ্যতার ধারা শুরু। প্রকৃতিকে জয় করার সংগ্রাম করতে গিয়েই একে অন্যের মনের ভাব বোঝবার চেষ্টা করেছে। প্রথমে লিখিত আকারে লিপি তারপর কণ্ঠের ভোকাল কর্ডের বিকাশের সাথে সাথে সে শব্দ উচ্চারণ করতে পেরেছে। সেই শব্দ সন্নিহিত হয়েই ভাষার সৃষ্টি। সহজ আলোচনায় প্রকৃতিকে জয় করবার সংগ্রামে শ্রম কে সহজবোধ্য করবার লড়াইতেই ভাষা এসেছে পৃথিবীতে। মানুষ সংকটের আবর্তে পরিযায়ী হয়েছে। তার ভাষাগত দীর্ঘ বিবর্তন হয়েছে। একদিনে এই ভাষার সংগঠিত চেহারা আসেনি। এবার পাঠকের কাছে প্রশ্ন আসতেই পারে এই আলোচনার সাথে ৫২-র আন্দোলন এবং আজকের প্রেক্ষাপটে সেই আন্দোলনের সম্পর্ক কি?
খুব সহজ কথা,ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য আজ আন্তর্জাতিক। ভাষা দিবস আজ আর কেবল বাংলা ভাষা দিবস নেই;হওয়ার কথাও ছিলনা। আজকের সংগ্রাম শোষিত মানুষের ভাষার সঙ্গে শোষকের ভাষার সংগ্রাম।
সেদিনের সংগ্রামও তাই-ই ছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিও সেদিন এদেশের প্রচলিত ভাষা ব্যবহার খণ্ডন করে তাদের ভাষা চাপিয়েছে শাসন করার সুবিধার্থেই। পাকিস্তানী শাসকও সেদিন উর্দু চাপাতে চেয়েছে একই কারণে। এটা খুব সহজ কথা, মানুষ যেমন তার শ্রমকে সহজ করে তোলবার আবর্তে কথা বলতে শিখেছিল ঠিক তেমনই শাসকও তার শাসন করার সুবিধার্থেই তার ভাষা অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়। সংঘাত টা উর্দু ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার নয়;সংঘাত টা হিন্দী ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার নয় বরং উর্দু বা হিন্দী যখনই শাসকের ভাষা হিসেবে আধিপত্য কায়েম করতে চেয়েছে বাংলা বা অন্যান্য ভাষার উপর তখনই সংঘাত,সংঘাতের জন্ম।
আমাদের দেশের মান্যবরেষু শাসকেরাও ভাষা সন্ত্রাস এবং আধিপত্যের রাজনীতি কে ব্যবহার করেন নির্লজ্জের মতো। ঠিক যেমন কেন্দ্রীয় স্তরের কোনো পরীক্ষায় বসতে হলে আপনাকে হয় ইংরেজী অথবা হিন্দীতে উত্তর লিখতে হবে,ঠিক যেমন ডাক্তারি প্রবেশিকায় (নিট) কেবলমাত্র হিন্দীবলয়ের আধিপত্য কায়েম রাখার জন্যই রাজ্যভিত্তিক পরীক্ষা তুলে দিয়ে একটিই পরীক্ষা চালু রাখার কাজ হয়ে চলেছে ঠিক তেমনই আর এস এস এবং তাদের রাজনৈতিক এজেন্ট ভারতীয় জনতা পার্টির সংগঠনের পদাধিকারে হিন্দী প্রাধান্যবাদ জুড়ে দিয়ে হিন্দু-হিন্দী-হিন্দুস্তানের পুরোনো বাজনা উচ্চগ্রামে বাজানো চলতে থাকে। একুশের চেতনা এই বাজনার সামনে ক্রোধের জয়ডঙা বাজানোর নয় কি?
আমাদের রাজ্যের ভাষ্যটাও আলাদা হবে কেন?
দেশহিতৈষী পত্রিকায় প্রকাশিত একটি তথ্য থেকে জানা যায়,গত দুই বছরে এই রাজ্যে ৮৯+২৫ টি বাংলা মাধ্যম স্কুল বন্ধ হয়েছে। বন্ধ হয়েছে না বন্ধ করা হয়েছে? তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা মন্ত্রীদের বিপুল শিক্ষাব্যবসার পসার আমাদের চোখের সামনে দৃশ্যমান। 'ইংরেজী মিডিয়াম ভাল' প্রবাদ তুলে পরোক্ষ আচারে তৃণমূলের এই দুর্নীতিগ্রস্থ নেতাদের বিনিয়োগ করা বেসরকারী ইংরেজী মাধ্যম স্কুলগুলোর মুনাফা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা এবং তারই ফলশ্রুতিতে বাংলা মাধ্যমের কঙ্কালসার দশা! একে বিপুল দুর্নীতি তার পাশাপাশি সরকারী শিক্ষক ও শিক্ষক কর্মীদের হকের ডিএ না দেওয়া, পশ্চিমবঙ্গে দাঁড়িয়ে আজ বিপন্নতার সঙ্গে বাংলাভাষার জন্য আর্তনাদ করা ছাড়া উপায় কিছু থাকে? বাংলা মাধ্যম স্কুলের ছেলেমেয়েদের যদি সরকার চাকরি না দিয়ে ধর্মতলায় পাখির বিষ্ঠা সহ্য করে ধর্ণা দিতে বাধ্য করে তাহলে দোষ কি বাংলা মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীদের না বাংলাভাষার? তাই,বাংলা ভাষাকে যারা সুতীব্র কুৎসায় খর্ব করে থাকেন সেই ভাষাতে কথা বলা সত্ত্বেও তাদের প্রতি আমরা বারবার এই সত্য এবং নির্মম প্রশ্নটি ছুড়ে দিতে থাকবই।
বাংলাভাষার প্রতি অবিচার আমরাও কি কম করি। ২১ তারিখের পরদিন সকালবেলা গুড মর্নিং না জানিয়ে মধ্যবিত্ত বাঙালির দিন শুরু হয়না। আমাদের আজ ভাবা দরকার,
ঐতিহাসিক প্রয়োজন ২১ তারিখের চেতনা বুকে নিয়ে আমরা কি ভোগবাদী বাংলা গানের অথৈ জলে ডুব দেব, না,ক্রোধে ক্রোধে মিছিল থেকে কবিতা কুড়িয়ে আনব?
We hate spam as much as you do