Tranding

11:50 PM - 06 May 2026

Home / Entertainment / ভাইরাল হওয়া কাগজের ভিতর ইতিহাসের আস্তানা ৬৪ এ লোয়ার সার্কুলার রোড

ভাইরাল হওয়া কাগজের ভিতর ইতিহাসের আস্তানা ৬৪ এ লোয়ার সার্কুলার রোড

লোয়ার সার্কুলার রোডের ভাড়া নেওয়া এই দপ্তরটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে তিনটি কারণে। ১.ভারতবর্ষের সংসদীয় রাজনীতির বীজ যখন রোপিত হচ্ছে, সেই রোপিত বীজের ভিতরে গণতান্ত্রিক পরিসরে বাংলার শ্রেণী রাজনীতির স্বর কে ত্বরান্বিত করার মুখ্য কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে এই দপ্তরটি থেকে। ২.পঞ্চাশের দশকের প্রথমাব্দে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত রাষ্ট্রব্যবস্থায় খাদ্যের সংকট,জীবিকার সংকট,উদ্বাস্তু মানুষের জীবনের সংকট তথা যে সমস্ত সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল তারই প্রেক্ষিতে কমিউনিস্ট পার্টিকে ঐতিহাসিক দায়িত্ব বহন করতে হয়েছে আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে,সেই আন্দোলন সংগ্রামের রূপরেখা নির্ধারণের প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে এই দপ্তর। ৬৪ এ লোয়ার সার্কুলার রোডের এই অফিস কে পার্টির ইতিহাসের একটা যুগের শেষে সূচনা বলা যেতে পারে।

ভাইরাল হওয়া কাগজের ভিতর ইতিহাসের আস্তানা ৬৪ এ লোয়ার সার্কুলার রোড

ভাইরাল হওয়া কাগজের ভিতর ইতিহাসের আস্তানা ৬৪ এ লোয়ার সার্কুলার রোড

 

শঙ্খজিৎ
২এপ্রিল ২০২৩

 

পৃথিবীর ইতিহাসে যেকোনো কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক ইতিহাসে অবসম্ভাবী ভাবেই পার্টি-অফিস বা পার্টি-দপ্তর অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে এসেছে। কমিউনিস্টরা তাদের দলের দপ্তর কে শ্রেণী রাজনীতির একটি স্থায়ী অস্ত্র হিসেবেই ব্যবহার করে। ১৮৪৭ সালে কমিউনিস্ট লিগ-এর প্রতিষ্ঠা হয় লন্ডনে। মার্কস যখন বেলজিয়ামে নির্বাসিত,তখন লন্ডনের দপ্তর থেকেই তার কাছে চিঠি যেত 'ইস্তেহার'লেখার কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য। একটা দীর্ঘ সময়জুড়ে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের দপ্তর ছিল মস্কোতে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় নাপাম বোমার মুখোমুখি মাটির নীচে কমিউন বানিয়ে পার্টি দপ্তরের কাজ চালিয়ে যেতে দেখেছে পৃথিবী।

সম্প্রতি সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয় কাকাবাবু মুজফফর আহমেদের স্বাক্ষরিত একটি ঐতিহাসিক কাগজের ছবি। যে ছবিতে দেখা যাচ্ছে ৬৪ এ লোয়ার সার্কুলার রোডের নাম। আজকের আলোচ্য এই ৬৪ এ লোয়ার সার্কুলার রোডের পার্টি দপ্তরটি নিয়ে। যার পিনকোড কলকাতা—৭০০০১৬

কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক 'জনযুদ্ধ' নীতি প্রত্যাহৃত হওয়ার পর ১৯৫১ সালের ৫ই জানুয়ারী হাইকোর্টের নির্দেশে কমিউনিস্ট পার্টি স্বাধীন ভারতের গণতন্ত্রে সাংবিধানিক বৈধতা পাওয়ার পর কলকাতায় পার্টির নতুন দপ্তরের প্রয়োজন হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে দেশের প্রথম  সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন সুকুমার সেন। অবিভক্ত পার্টির প্রাদেশিক সম্পাদক মুজফফর আহমেদের উদ্যোগে ভাড়া নেওয়া হয় ৬৪ এ লোয়ার সার্কুলার রোডের দপ্তরটি।

লোয়ার সার্কুলার রোডের ভাড়া নেওয়া এই দপ্তরটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে তিনটি কারণে। ১.ভারতবর্ষের সংসদীয় রাজনীতির বীজ যখন রোপিত হচ্ছে, সেই রোপিত বীজের ভিতরে গণতান্ত্রিক পরিসরে বাংলার শ্রেণী রাজনীতির স্বর কে ত্বরান্বিত করার মুখ্য কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে এই দপ্তরটি থেকে। ২.পঞ্চাশের দশকের প্রথমাব্দে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত রাষ্ট্রব্যবস্থায় খাদ্যের সংকট,জীবিকার সংকট,উদ্বাস্তু মানুষের জীবনের সংকট তথা যে সমস্ত সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল তারই প্রেক্ষিতে কমিউনিস্ট পার্টিকে ঐতিহাসিক দায়িত্ব বহন করতে হয়েছে আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে,সেই আন্দোলন সংগ্রামের রূপরেখা নির্ধারণের প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে এই দপ্তর। ৩.৬৪ এ লোয়ার সার্কুলার রোডের এই অফিস কে পার্টির ইতিহাসের একটা যুগের শেষে সূচনা বলা যেতে পারে। একদিকে জনযুদ্ধের কৌশল প্রত্যাহার করে দেশের সংসদীয় আঙিনায় পার্টির পথচলা শুরুর প্রাণকেন্দ্র হিসেবে এই দপ্তরের ব্যবহার শুরু, অন্যদিকে ১৯৬২ সালের সময় থেকে যখন ভারত-চীন যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পার্টিতে যখন মতাদর্শগত বিতর্ক চরমে ওঠে তখনই এই দপ্তর স্থানান্তরিত হওয়ার পরিণতি দেখা দেয়। সেই হিসেবে বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাসে এটিই ছিল অবিভক্ত পার্টির শেষ রাজ্যকেন্দ্র।

লোয়ার সার্কুলার রোডের এই দপ্তরটি থেকেই পার্টির সাপ্তাহিক মুখপত্র 'মতামত' প্রকাশিত হওয়া শুরু হয়। 'স্বাধীনতা' পত্রিকার দপ্তর স্থানান্তরিত হয় ৩৩ আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে। ৬৪ এ লোয়ার সার্কুলার রোডের দপ্তরটি থেকেই মহম্মদ ইসমাইল ও জ্যোতি বসুর প্রমুখের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক ট্রামভাড়াবৃদ্ধি প্রতিরোধ আন্দোলন,১৯৫৪ সালের ৫ টাকা বেতনের দাবীতে শিক্ষক আন্দোলন পরিচালনার যাবতীয় প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এই দপ্তর টি থেকেই। ১৯৫৫ সালে তিন সহস্রাধিক মহিলা সমন্বিত একটি বিধানসভা অভিযান প্রত্যক্ষ করে বাংলা। বলা বাহুল্য সেই অভিযানের উপর নেমে আসে চরম বর্বরতা। সেই আন্দোলন সংগঠিত করার প্রশ্নেও এই দপ্তরটির অসম্ভব ভূমিকা। জাতীয় স্তরে যখন লেখক,বুদ্ধিজীবী,কলাকুশলীদের নিয়ে প্রগতি লেখক সংঘের কাজ এগোচ্ছিল, ঠিক তেমনই বাংলায় সাংস্কৃতিক কর্মীদের একটি ফ্রন্ট গড়বার প্র‍য়াস শুরু হয়। যার সর্বাগ্রে ছিলেন চিন্মোহন সেহানবিস,ননী ভৌমিক,শম্ভু মিত্র দের মতো বিরল বুদ্ধিজীবীরা। তাদেরও নিত্য যাতায়াতের কেন্দ্র ছিল এই অফিস টি। গোয়া মুক্তি আন্দোলন,ভাষাভিত্তিক প্রদেশ গঠনের আন্দোলন এমনকি বাংলা-বিহার সংযুক্তিকরণের বিরোধী আন্দোলন তথা মানভূমের ভাষা আন্দোলনের প্রশ্নে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা বিশেষত প্রাদেশিক কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা এবং আন্দোলন সংগ্রামের রূপরেখা তৈরীর কেন্দ্রই ছিল ৬৪ এ লোয়ার সার্কুলার রোডের এই বাড়িটি। সময়ের দাবী অনুযায়ীই ১৯৫৭ সালে 'স্বাধীনতা' পত্রিকাকে চার পাতা থেকে আট পাতায় রূপান্তরিত করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এই দপ্তর থেকেই। 'স্বাধীনতা' পত্রিকার দ্বাদশ বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে 'স্বাধীনতা তহবিল' গড়ে তোলা হয় একই সাথে এই উপলক্ষ্যে সেই বছরেই ভারতের মাটিতে কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার বার্ষিকী অর্থাৎ ২৬ শে ডিসেম্বর কলকাতার পার্ক সার্কাস ময়দানে এক ঐতিহাসিক সমাবেশ হয়। স্বাধীনতা পত্রিকাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ পূর্ব ইয়োরোপ ও এশিয়া মহাদেশের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির কমিউনিস্ট পার্টিদের কাছ থেকে সংহতির বার্তা আসে এই ৬৪ এ লোয়ার সার্কুলার রোডের ঠিকানাতেই;যা সমাবেশে পাঠিতও হয়। ১৯৫৮ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারী কলকাতায় এলেন হো চি মিন। মুক্তিকামী ভিয়েতনামের সংহতিতে 'তোমার নাম আমার নাম/ভিয়েতনাম ভিয়েতনাম' স্লোগানটির জন্মই হয় এই বাড়িটি থেকেই। ১৯৫৯ সালের খাদ্য ও গণ আন্দোলনের ক্ষেত্রেও এই কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে।

এই বাড়িটির দোতালায় মোট পাঁচটি ঘর ছিল। সরু গলির মতো একটি ঘরে থাকতেন প্রমোদ দাশগুপ্ত। মুজফফর আহমেদের পর ষষ্ঠ প্রাদেশিক সম্মেলন থেকে পার্টির রাজ্য সম্পাদক হন জ্যোতি বসু। তিনিও কিছুদিন এই দপ্তর থেকে কাজ চালিয়েছেন।

এই বাড়িটি থেকেই প্রকাশিত হত সংবাদ দলিল,পার্টি আলোচনা,পার্টি সংগঠক ও পার্টি দলিল। এছাড়া এই বাড়ি থেকেই প্রথম পার্টি সাহিত্য পত্রিকা-র উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। পঞ্চাশের দশকে এই বাড়িটিতেই নিয়মিত পার্টি ক্লাসের সূচনা হয়। এই বাড়ির ঠিকানা থেকে কিছু মূল্যবান গ্রন্থ/পুস্তিকাও প্রকাশিত হয়। পুস্তিকাগুলি ১.কমিউনিজম কি,২.বারোপার্টির দলিল,৩.স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস,৪. পার্টি কি চায়,৫. ট্রেড ইউনিয়ন,৬.পার্টি সংগঠন ও পার্টি গঠনতন্ত্র।

পার্টি বিভাজনের প্রেক্ষিতকালে এই বাড়িটি থেকে দপ্তর স্থানান্তরিত হয়। ঐতিহাসিক গুরুত্বের নিরিখে বাংলার মাটিতে কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাসে এই বাড়ি এক মাইলস্টোন। রাজ্যের গণ-আন্দোলনের জোয়ার আসবার কালের একপ্রকার ধাত্রীভূমি এই বাড়িটির জন্য বহু কালপর্ব পেরিয়ে এক কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীর মনের কোন অন্তরায় জেগে ওঠে 'লাল সেলাম' শব্দবন্ধ...যা আবহমানের কাছেও হয়ে থাকে চিরপ্রাসঙ্গিক...

ঋণ—প্রবোধকুমার বাগচি (পার্টি অফিসের ইতিবৃত্ত),
বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস ২য় খণ্ড (সম্পা.—অনিল বিশ্বাস)

Your Opinion

We hate spam as much as you do