হুয়ান লিখেছেন, ‘এখানকার সবার কাছে চে একজন সাধু-সন্ন্যাসী হয়ে উঠেছেন। তাঁর ছবি সামনে নিয়ে প্রার্থনা করা হয়, অলৌকিক প্রত্যাশা করা হয় তাঁর কাছে। এ এক ভয়ংকর অবস্থা। আমার ভাইয়ের চিন্তা ও আদর্শ ধুয়েমুছে গেছে।’
শহীদ হওয়ার ৫৫তম বর্ষে চে -- চে দেবতা নন ! পশ্চিমী বিজ্ঞাপনের হিরো মডেল নন!
৯ই অক্টোবর ২০২২
বলিভিয়ার লা হিগুয়েরা নামের সীমান্তবর্তী এক গ্রামের যে স্কুলঘরে ১৯৬৭ সালে বিপ্লবী এরনেস্তো চে গুয়েভারাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল, ৪৭ বছর পর প্রথম সেখানে পা রাখেন তাঁর ছোট ভাই হুয়ান মার্তিন গুয়েভারা।
জায়গাটা এখন ব্যস্ততম পর্যটনকেন্দ্র। পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ চে। এই বিপ্লবীর চিরচেনা ছবি শোভা পাচ্ছে চারপাশে।
হুয়ান মার্তিন যখন বাসিন্দাদের কাছে নিজের পরিচয় দেন, অবিশ্বাসী কণ্ঠে তাঁরা বলে ওঠেন, ‘যিশুর কোনো ভাইবোন থাকতে পারে না!’
হুয়ান লিখেছেন, ‘এখানকার সবার কাছে চে একজন সাধু-সন্ন্যাসী হয়ে উঠেছেন। তাঁর ছবি সামনে নিয়ে প্রার্থনা করা হয়, অলৌকিক প্রত্যাশা করা হয় তাঁর কাছে। এ এক ভয়ংকর অবস্থা। আমার ভাইয়ের চিন্তা ও আদর্শ ধুয়েমুছে গেছে।’
হুয়ানের সঙ্গে চের বয়সের পার্থক্য ছিল ১৫ বছর। ছোট ভাইকে প্রায় সন্তানের মতোই দেখতেন চে। মৃত্যুর কিছুকাল আগে ঘনিষ্ঠজনদের কাছে চে বলেছিলেন, ছোট ভাইয়ের সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি নৈকট্য অনুভব করেন তিনি।
চের সঙ্গে নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণা করেছেন হুয়ান। গত সপ্তাহে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর স্মৃতিচারণামূলক বইয়ের ইংরেজি সংস্করণ চে, মাই ব্রাদার। প্রকাশক পলিটি প্রেস। হিস্পানি ভাষায় মূল বইটি বেরিয়েছে।
বইটিতে হুয়ান লিখেছেন এরনেস্তোর বিপ্লবী হওয়ার পারিবারিক কাহিনি। উঠে এসেছে অ্যাজমায় ভোগা এক শিশুর কথা, যার স্বাস্থ্য ভালো রাখতে শুষ্ক আবহাওয়ার অন্য শহরে ঠিকানা বদল করেছিল পুরো পরিবার। টগবগে তরুণ চে পড়ছিলেন চিকিৎসাবিদ্যা। কিন্তু মোটরবাইকে করে দুই বছর লাতিন আমেরিকার পথে পথে ঘুরে বদলে যায় তাঁর জীবনদর্শন। গড়ে ওঠে সাম্রাজ্যবাদী শোষণের বিরুদ্ধে বিপ্লবী চেতনা ও রাজনৈতিক আদর্শ।
ভাইয়ের কাছে কেমন ছিলেন চে? হুয়ান বলেন, ‘বাবা ও মায়ের মিশেলে গড়ে উঠেছিল সে। মা সিলিয়া ডি লা সারনা ছিলেন ধীরস্থির, বুদ্ধিমতী ও একই সঙ্গে প্রথাবিরোধী। বাবা এরনেস্তো গুয়েভারা লিঞ্চ আবার নিজেকে বেঁধে রাখার মানুষ নন। পরিবার থেকে কিছুটা দূরেই থেকেছেন। দুজনের বৈশিষ্ট্যই এসেছিল চের মধ্যে। আমার কাছে বাবার বিকল্প ছিল সে। আবার ছিল ভাই ও বন্ধুও।’
কিন্তু ১৯৫৭ সালের পর বদলে যায় চের পরিচয়। একই সঙ্গে হুয়ানের পরিচয়ও বদলে যায়। আগে ছিলেন মেডিকেল ছাত্র চের ভাই। পরে হলেন কিংবদন্তি বিপ্লবী ও ভয়ডরহীন যোদ্ধা চের ‘ছায়ায় বেড়ে ওঠা’ হুয়ান মার্তিন গুয়েভারা। বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকের শেষ থেকে আশির দশকের শুরু পর্যন্ত আর্জেন্টিনায় রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে কারাগারে ছিলেন চের এই ছোট ভাই। পরে ছাড়া পান ঠিকই, কিন্তু তত দিনে প্রিয় চে আর পৃথিবীতে নেই।
হুয়ানের মতে, চের ভাস্কর্য বা মূর্তি গড়ে তাঁকে আরাধনা করার প্রয়োজন নেই। চে কে এই পূজার বেদি থেকে নামিয়ে আনতে হবে। সবার উচিত তাঁকে একজন ব্যতিক্রমী মানুষ হিসেবে দেখা, স্রেফ মানুষ, যিনি কিনা মার্ক্সবাদী আদর্শে বৈষম্যহীন বিশ্ব গড়তে চেয়েছিলেন।
বিশ্বে কি চের মতো আরেকজন বিপ্লবীর প্রয়োজন আছে? তেমন মানুষ কি পাওয়া সম্ভব?
‘হ্যাঁ, পাওয়া সম্ভব। সে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। কিন্তু আমাদের কি ঠিক তাঁর মতো মানুষই প্রয়োজন? একজন গেরিলা? না। টুপি মাথায় পাহাড়ে থাকা কোনো মানুষ? না। কিন্তু এমন একজন মানুষ লাগবে, যাঁর পরিবর্তনের ভাবনা আছে। আছে সুস্পষ্ট নীতি, যা অর্থবিত্ত বা ক্ষমতার কাছে কখনো বিক্রি হয় না। চে এমনটাই ছিল। আমাদের এমন মানুষ দরকার। চে যখন বেঁচে ছিল, তখনকার তুলনায় আজকের পৃথিবী খুব ভালো অবস্থায় নেই। বরং আরও খারাপ অবস্থায় আছে। পরিস্থিতির উন্নতির জন্য আমাদের অবশ্যই লড়াই চালিয়ে যেতে।হবে
বেন অ্যান্ড জেরির একটা আইসক্রিম ব্র্যান্ড আছে যার নাম ‘চেরি গেভারা’। তাদের আইসক্রিমের লেবেলে বলা হয়, “চেরির বৈপ্লবিক সংগ্রাম থেঁতলে গেছে কারণ তারা আটকা পড়েছে চকোলেটের দুটো স্তরের মাঝে। তাদের স্মৃতি আপনাদের মুখে বেঁচে থাকুক।”
এক ফরাসি ব্যবসায়ীর একটি পারফিউম ছিল। চে পারফিউম বলে সেটা বিখ্যাত। নাম ‘চেভাগন’। পণ্যটির বক্তব্য, “পারফিউমটি তাঁদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত যারা বিপ্লবীর অনুভূতি ও গন্ধ পেতে চান।”
২০০৮ সালে রেনল্টের অনুসারী শিল্প, গাড়ি প্রস্তুতকারক সংস্থা ডাসিয়া একটা বিজ্ঞাপন তৈরি করে তাদের নতুন লোগান এম সি ভি স্টেশন ওয়াগনের জন্য, যার নাম ছিল ‘রেভলিউশন’। সেই বিজ্ঞাপনে ফিদেল কাস্ত্রোর ভূমিকায় এক অভিনেতা একটা দুর্গম গ্রামে গিয়ে পৌঁছন। সেখানে তাঁকে অভিবাদন জানান আধুনিক যুগের অন্য বিপ্লবীরা। বিজ্ঞাপন যেখানে শেষ হয় সেখানে আমরা দেখি, একটা প্যাশিও গাড়ির পিছনে দাঁড়িয়ে আর্নেস্তো চে গেভারা কার্ল মার্ক্সকে বলেন, “এটা একটা নতুন বিপ্লবের সময়।” মার্ক্স উত্তর দেন, “চে এটা তা-ই, যা মানুষ চায়।”
১৯৭০ সালে ইতালীয় কোম্পানি ‘অলিভেত্তি’ তাদের বিক্রি বাড়ানোর জন্য বিজ্ঞাপনে চে-র ছবি ব্যবহার করে লেখে, “যদি আমরা ওকে ভাড়া করতাম!”
পেরুতে গেলে আপনি কিনতে পারেন ‘এল চে সিগারেট’। আবার ‘এল চে কোলা’ তাদের নিট মুনাফার পঞ্চাশ শতাংশ দেয় এনজিও-কে। তাদের স্লোগান, “পৃথিবীকে পরিবর্তন করতে গেলে তোমাদের অভ্যাস পরিবর্তন করো।” – এই অভ্যাস অবশ্য একটা নির্দিষ্ট কোলা খাওয়ার অভ্যাস।
আজকের চে কেবলই পণ্য ! কারণ, তাঁর চেতনা ব্যক্তিসর্বস্ব হয়ে গেছে। আমরা তাদের কথা বলছি, যাদের কাছে চে বিপ্লব নয়, বিজ্ঞাপনের প্রতীক! তরুণ সমাজে এই সংখ্যাটা অনেক বেশি। তারা মৃত চেকে বিজ্ঞাপনের ‘মডেল’ হিসেবে চেনে। এই যে বিজ্ঞাপনে চের বাহারি উপস্থিতি সেটা আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করে না। কনজিউমারইজম ভর করেছে মৃত মানুষটির ওপর। পণ্য বানানোর যে রাজনীতি, সেই রাজনীতির শিকার হয়েছেন চে ।
আমরা ১৯৬৭ সালের পূর্বে বেঁচে থাকা চের কথা বলছি না। বলছি আজকে ধান্দার পুঁজির সময় তাঁর অবস্থানের কথা। গত ৫০ বছরে চে কারও কাছে ‘নিশ্চয়’ শুধু নয়, বলা উচিত ‘অবশ্যই’ অনিবার্যভাবে ‘বিপ্লবের প্রতীক’ হিসেবে অমর হয়ে আছেন।
তার Che my brother বইতে হুয়ান ,বলছেন চে'র ভাস্কর্য বা মূর্তি গড়ে তাঁকে আরাধনা করার প্রয়োজন নেই। চে কে এই পূজার বেদি থেকে নামিয়ে আনতে হবে। সবার উচিত তাঁকে একজন ব্যতিক্রমী মানুষ হিসেবে দেখা, স্রেফ মানুষ, যিনি কিনা মার্ক্সবাদী আদর্শে বৈষম্যহীন বিশ্ব গড়তে চেয়েছিলেন।
বিশ্বে কি চের মতো আরেকজন বিপ্লবীর প্রয়োজন আছে? তেমন মানুষ কি পাওয়া সম্ভব?
হুয়ানের মতে ‘হ্যাঁ, পাওয়া সম্ভব। সে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। কিন্তু আমাদের কি ঠিক তাঁর মতো মানুষই প্রয়োজন? একজন গেরিলা? না। টুপি মাথায় পাহাড়ে থাকা কোনো মানুষ? না। কিন্তু এমন একজন মানুষ লাগবে, যাঁর পরিবর্তনের ভাবনা আছে। আছে সুস্পষ্ট নীতি, যা অর্থবিত্ত বা ক্ষমতার কাছে কখনো বিক্রি হয় না। চে এমনটাই ছিল। আমাদের এমন মানুষ দরকার। চে যখন বেঁচে ছিল, তখনকার তুলনায় আজকের পৃথিবী খুব ভালো অবস্থায় নেই। বরং আরও খারাপ অবস্থায় আছে। পরিস্থিতির উন্নতির জন্য আমাদের অবশ্যই লড়াই চালিয়ে যেতে।হবে "
We hate spam as much as you do