Tranding

11:11 AM - 22 Mar 2026

Home / Entertainment / বসন্ত উৎসব ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির রঙ

বসন্ত উৎসব ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির রঙ

ভারতে দোল উৎসব বা হোলি র ইতিহাসে দেখা যায় পূর্বাঞ্চলের কোন জাতির কাছ থেকে এই উৎসবের আবির্ভাব। বিভিন্ন পুরাণে , প্রাচীন মন্দিরের গায়ে , চিত্রকর্মে হোলি খেলার উপাখ্যানও উল্লিখিত আছে । মধ্যযুগে রাধাকৃষ্ণের দোললীলাকে কেন্দ্র করে শ্রীচৈতন্য অনুগামীরা ফাল্গুনী পূর্ণিমায় একত্রে দোল খেলতে শুরু করে ন। কারণ মহাপ্রভুর জন্ম তিথি ও ঐ ফাল্গুনী পূর্ণিমা।

বসন্ত উৎসব ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির রঙ

বসন্ত উৎসব ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির রঙ


ড. সাখাওয়াৎ হোসেন 
২৪ মার্চ ২০২৪

 

" আজ সবার রঙে রঙ মি শাতে হবে ওগো আমার প্রিয় তোমার রঙিন উত্তরীয়
পরো পরো পরো তবে ।"
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর প্রিয় বসন্ত ঋতুতে রঙ খেলতে এভাবেই সকলকে ডাক দিয়ে ছি লে ন। সকলে র সাথে আনন্দ ভাগ করাতেই উৎসবের মাধুর্য ও তার মহত্ত্ব প্রকাশি ত হয়। এক সময় জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে পরিবার কেন্দ্রিক যে রঙ খেলা হত, শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসবে রবীন্দ্রনাথ তাকেই সর্বজনীন করে তুললেন। এখন রবীন্দ্র গানে , নৃত্যে , ভাষ্যে প্রভাত ফেরীর মাধ্যমে সারা বাংলা জুড়ে দোল উৎসব পালিত হয়।
ভারতে দোল উৎসব বা হোলি র ইতিহাসে দেখা যায় পূর্বাঞ্চলের কোন জাতির কাছ থেকে এই উৎসবের আবির্ভাব। বিভিন্ন পুরাণে , প্রাচীন মন্দিরের গায়ে , চিত্রকর্মে হোলি খেলার উপাখ্যানও উল্লিখিত আছে । মধ্যযুগে রাধাকৃষ্ণের দোললীলাকে কেন্দ্র করে শ্রীচৈতন্য অনুগামীরা ফাল্গুনী পূর্ণিমায় একত্রে দোল খেলতে শুরু করে ন। কারণ মহাপ্রভুর জন্ম তিথি ও ঐ
ফাল্গুনী পূর্ণিমা। ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে ব্রিটিশ প্রভাবে কলকাতায় বাবুসমাজের উৎপত্তি । বাবুকালচারের হোলির বর্ণনায় কবি ঈশ্বর গুপ্ত লিখেছেন -
‘ক্রমেতে হোলির খেলা নবীনা নাগরী মেলা ছুটে মুটে যায় এক ঠাঁয়
যার ইচ্ছা হয় যারে আবির কুমকুম মারে পিচকারি কেহ দেয় কায়।"
তখন এই উৎসবকে কেন্দ্র করে সকল নাগরিক পথে বেরিয়ে পড়ত।ধনী, দরিদ্র নির্বিশেষে সকলেই রঙ মাখত। কারও বস্ত্র রঙহীন থাকত না। কোথাও বসত যাত্রা গানে র আসর, কোথাও বসত বাইজি নাচে র আসর। পাথরিয়াঘাটের রাজবাড়িতে ধ্রুপদী সঙ্গীতের আসর বসত। গান গাইতে না গায়ক অঘোর চক্রবর্তী , পিয়ারা সাহেব, আহমদ খান প্রমুখ।
কোথাও কোথাও যদুভট্টের গান ও নাটক অভিনয় হতো। কলকাতায় পারিবারিক ভাবে যে সব ধনাঢ্য বাড়ি তে দোল উৎসব পালিত হত - তাঁদের মধ্যে ছিলেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, বাবু বৈষ্ণবচরণ শেঠ, বাবুনবীনচন্দ্র বসু, অমৃত বাজার পত্রি কার সম্পাদক শিশির কুমার ঘোষ প্রমুখ। ইংরেজরা সেই অনুষ্ঠানে
অতিথি হয়ে আমন্ত্রিত থাকতেন।
প্রাচীন কলকাতার সেই সব সোনালী দিন এখন ইতিহাসের পাতায়। অজস্র পরিবর্তনের হাত ধরে জীবন ও সমাজ অনেক পরিবর্তিত। কিন্তু উৎসবের সেই পরি প্রেক্ষিত আজও একই রয়েছে । বর্তমানে সাড়ম্বরে বাংলা জুড়ে ফাল্গুনী পূর্ণিমায় রঙের
উৎসব পালিত হয়ে আসছে । একদা ঠাকুরবাড়ির দোল উৎসবের প্রভাবেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে নতুন ভাবে উদযাপন করলেন বসন্ত উৎসবের। আজ যা সারা ভারতবর্ষ তথা বিশ্ব জুড়ে একটি বিশিষ্ট রঙের উৎসব।
এই বসন্ত উৎসব হয়ে উঠেছে নারী, পুরুষ, ধনী, নির্ধন, সব ধর্মের মানুষের রঙিন সাংস্কৃতিক হৃদয় উৎসব। প্রকৃতির মাঝে মানুষকে কবি এই উৎসবে স্বাগত জানিয়ে গেয়ে উঠেছেন –
“ওরে গৃহ বাসী খোল দ্বার খোল।
লাগলো যে দোল
স্থলে জলে বন তলে লাগলো যে দোল
দ্বার খোল দ্বার খোল।”
বস্তুত শীতের শেষে সবুজ প্রকৃতির মাঝে মধুর বসন্ত এসে হাজি র হয়। কোকিলের ডাকে , আমের মঞ্জরিতে চিত্ত -আন্দোলন

১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে মহাসমারোহে বরীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের বিদ্যাশ্রমে বসন্তোৎসব আয়োজন করে ন। ১৯৩১ সালে তিনি

‘ওরে গৃহবাসী’ গানটি লেখেন। বিশৃঙ্খলা এড়াতে এ সময় থেকেই তিনি বিধিবদ্ধ একটি বসন্তোৎসবের খসড়া তৈরী করেন।
যেখানে থাকবে সুশৃঙ্খল শোভাযাত্রা ।সেখানে মেয়েরা ও ছেলেরা আগে পরে সারি বদ্ধ থাকবে । শান্তিদেব ঘোষ মনীপুরী ঢঙে নাচ শেখালেন। নন্দলাল বসুর তৈরী করা ডালায় রঙ, আবির থাকত।সকাল থেকে শুরু হত শোভাযাত্রা, শেষ হত
আম্রকুঞ্জে ।
রবীন্দ্র জীবনীকার প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন সে সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চৌদ্দটি গান লিখেছিলেন । ১৯৩৫ সালের দোল উৎসবে দুটি গানে ক) কে দেবে চাঁদ তোমায় দোলা খ) তোমার বাস কোথা হে পথিক- এই গানে নেচে ছিলেন
তৎকালীন আশ্রমিক শিক্ষার্থী ইন্দিরা গান্ধী।
বিশ্বকবি বসন্ত উৎসবকে কেন্দ্র করে সে সময় লিখলেন ‘বসন্ত’ নাটকটি। উৎসর্গ করলেন কাজী নজরুল ইসলামকে ।
কারণ জাতি র জীবনে প্রকৃতই বসন্ত এনেছেন বিদ্রোহী কবি নজরুল। কবির মননে ধরা পড়ে বসন্ত শুধু উচ্ছ্বাসের ঋতু নয় - তার গভীরে আছে প্রেম,বিরহ ,মনুষ্যত্ব, মর্মবেদনাও। এই রঙিন বসন্ত প্রকৃতির অমূল্য দান। কোন নির্দিষ্ট ধর্মের বেড়াজালে বা আচারে তাকে আবদ্ধ করা যায় না - তা সারা বিশ্বের সব ধর্মের মানুষের রঙিন হওয়ার উৎসব। বর্তমানে
বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় এই রঙের উৎসবে মেতে ওঠে মানুষ। কোনো সম্প্রদায় বা ধর্মীয় সংকীর্ণতায় তাকে আবদ্ধ করা যায়নি । বসন্ত উৎসবে এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তাটি আজ বিশ্বের মানুষের কাছে মনুষ্যত্বের মূল্য বোধে উদ্ভাসিত।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই নিষ্কলুষ আনন্দের বার্তাটি বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। কবির শুধুআন্তরিক
আবেদন-
"রঙ যেন মোর মর্মে লাগে
আমার সকল কর্মে লাগে
সন্ধ্যাদীপের আগায় লাগে
গভীর রাতের জাগায় লাগে
রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও যাও গো এবার যাবার আগে ”।
আসুন রঙিন বসন্তে প্রকৃতির রং মেখে মনকে রাঙাই, মানবিক রঙে বসন্ত উদযাপন করি ।

Your Opinion

We hate spam as much as you do