যদি ‘ছবি লেখেন’ অবন ঠাকুর তবে ‘কবিতা আঁকেন’ রবি ঠাকুর এই কথা বললে অত্যুক্তি হবে না । তিনি একইসঙ্গে কবিতাকার ও ছবিতাকার। কবিতাকার- ছবিকার মিলমিশ তৈরি করেন ছবিতা । এই শব্দটি এক বন্ধুর সাথে কথোপকথনের সময় মুখোমুখি কুড়িয়ে পাওয়া । ভালো লেগে গেল আর বসিয়ে দিলাম সঙ্গে সঙ্গে ।
“বাইশে শ্রাবণ” ও অস্তিত্বের সত্যমূল্য
অমিতাভ বিশ্বাস
newscopes.in 15th august
তিনি বলতেন – মৃত্যু না থাকলে জীবনের কোনও মানে হয় না ।
কেন – সেকথা বলতে গিয়ে তাঁর অনেকান্ত সৃষ্টি আমাদের যাপন ভূমীর অন্তরাল থেকে সজীব হয়ে উঠে , ৮০ বছর আগের ‘বাইশে শ্রাবণ’ ডাক দেয় – আমাকে দেখো – ‘তুমি কি কেবলই ছবি শুধু পটে লিখা’ – মৃত্যুর এত বছর পরও তাঁকে আমরা খুঁজে চলেছি প্রাণ ও জীবন-বায়ু – সংগীত – দর্শনের প্রবালদ্বীপ। তেমনই একটুকরো এই লেখায় ধরার চেষ্টা আমার ।
যদি ‘ছবি লেখেন’ অবন ঠাকুর তবে ‘কবিতা আঁকেন’ রবি ঠাকুর এই কথা বললে অত্যুক্তি হবে না । তিনি একইসঙ্গে কবিতাকার ও ছবিতাকার। কবিতাকার- ছবিকার মিলমিশ তৈরি করেন ছবিতা । এই শব্দটি এক বন্ধুর সাথে কথোপকথনের সময় মুখোমুখি কুড়িয়ে পাওয়া । ভালো লেগে গেল আর বসিয়ে দিলাম সঙ্গে সঙ্গে ।
‘ছবিতা’ শব্দটিতে কবির আঁকা ছবি যেন কথা বলে উঠল – ‘এই তো আমি’ ।
কিন্তু ‘এই তো আমি’ বললেই তো আর চেনা যায় না । - ‘আমি’ কে ? ‘আমি’র আবরণটা না খুললে যে বোঝা যায় না আগে কোথাও দেখেছি বলে মনেই হয় না। না, কোথাও না – কোনদিন না ! কোত্থেকে এলে তুমি ? তুমি কাদের মেয়ে ? কবিকারের না ছবিকারের ?
আড়াল করে থেকো না - ‘এবার অবগুণ্ঠন খোল’
আমার নাম ছবিতা ব্যাস ।
কিন্তু এটাতো একটা নাম মাত্র । ‘আমি’ নামটা তো কমন – সবারই ।আইডেন্টিটির প্রশ্নে আমরা জানতে চাই সত্তা এবং স্বরূপ অস্তিত্বের এসেন্স সুদ্ধু ।
আশ্চর্য রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের একেবারে শেষ কিনারায় দাঁড়িয়ে
‘কে তুমি’ এই একই প্রশ্ন করছেন
প্রথম দিনের সূর্য
প্রস্ন করছিল
সত্তার নুতন আবির্ভাবে – কে তুমি ? মেলেনি উত্তর ।
প্রথম দিনের সূর্য
প্রস্ন করছিল
সত্তার নুতন আবির্ভাবে –
কে তুমি ?
মেলেনি উত্তর ।
বৎসর বৎসর চলে গেল ।
দিবসের শেষ সূর্য
শেষ প্রশ্ন , উচ্চারিল-
পশ্চিমসাগরতীর
নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় –
কে তুমি ?
পেল না উত্তর ।
উত্তর কি মেলে ?
সত্যিই কি পাওয়া যায় উত্তর ?
এই নিয়েই তো এত কোয়েস্ট – এত অনুসন্ধান । এই আত্মসন্ধান থেকেই দর্শনের যাত্রা শুরু , কো-হম প্রশ্ন কত কাল ধরে মানুস- পথিক শুধু খুঁজেই চলেছে সাধনায় , ধ্যান, কাব্য, স্নগিত, কর্ম কল্পনায় । আজও তার বিরাম নেই । অথচ প্রশ্নটা প্রশ্নই থেকে গেল ।
উত্তর মিলল না । খুঁজতে খুজতে বাউল বৈষ্ণবের মতো পথ চলাতেই আমাদের আনন্দ । সত্যিই যদি উত্তর পাওয়া যেত – কি হত তাহলে ? শেষ হয়ে যেত সব । পায়নি বলেই ‘বিস্ময়ে জাগে আমার গান’ আমার সন্ধান । এইরকম অনুভব নিয়ে কবির আঁকা একটি চিত্রের প্রতি দৃষ্টি দিতে চাই ।
একটি নারী কলমের রেখায় আঁকা । মেয়েটির পিছন দিকটা দেখা যাচ্ছে শুধু । তার মুখশ্রী কেমন , সেটা দেখানোর দায় কবির নয় । বরং প্রশ্নকর্তা যিনি তার । দর্শকই মনের মত মুখাবয়ব কল্পনা করে নিতে পারেন। ইচ্ছে মত যিনি যেমন চান তেমন । চিত্রকর মাঝখানের ঐ স্থানটায় দর্শককেই দীর্ঘ অবকাশ দিয়েছেন কল্পনা রঞ্জনের ঞ্জন্য । কবি – চিত্রকর রসজ্ঞয় – দর্শককেও ছবি সৃষ্টির কাজে ইনভ্লভ ক্রে নিলেন । এই হল বড় শিল্পীর মহত গুন । চোখ বন্ধ করে সচেতন মানুষ মনের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত আবছায়া রূপ দেখতে পারেন । জীবনের উষ্ণতা যেখানে কিছুমাত্র কম থাকে না । খুশিমত রূপ সৌন্দর্যে মূর্তি নির্মাণও হয় । তাকে মনের বাইরে রুপায়িত করতে গেলে চাই ক্যানভাস মিদিয়াম , কাগজ আর রং – তুলি – পেন্সিল বা কলম ।
মেয়েটি রূপ পাচ্ছে কলমের রেখায় রেখায় । যেন এখনও সম্পূর্ণ হয়নি । ঘুরে ঘুরে উঠছে। চৈত্রে যেমন ছোটো ঘূর্ণি–বলয় ওঠে ফাটল ধরা মাঠ । এখনো সে সম্পূর্ণ রূপময়ী হয় নি, বড়জোর হতে চলেছে। তাই অনাবৃত। প্রসারিত আনুভূমিক রেখা থেকে। কলমের রেখা অক্ষের উভয়দিকে নিচে থেকে ঘুরে খানিকটা কৌণিক ভাবে বেঁকে ভারটিক্যাল লাইনের দিকে মিশেছে।
ঠিক যেমন কুমোরের চাকা থেকে ইচ্ছেমত তৈরি করা হয়। চুলের যে অংশ মাথার দুপাশে ছড়ানো তাতেও আছে গতিময় আবর্তন। মুঠো করা দুটো প্রসারিত হাতও ঘূর্ণি সম্ভাবনাকে সমর্থন করছে । ঘূর্ণ-চক্রের গতি অভিমুখ ক্লক-ওয়াইজ। শরীর ঘিরে কালো চুলের বেষ্টন দেখে তা স্পষ্ট অনুভূত ।
এ ছবিতে বিশৃঙ্খল রেখার টান শৃঙ্খলিত । শৃঙ্খলা থেকে একপ্রকার জ্যামিতি – নির্জীব জ্যামিতি থেকে জীবন্ত নারি, প্রত্ন থেকে প্রকৃতি – মানবিপ্রতিমা । মনে পড়ছে অহল্যার কথা । স্বাপদে- সঙ্কুলে – শ্মম্পে পাষাণ থেকে জেগে উঠেছে সে । লক্ষক্লান্তিজয়ী ধুলিরশয্যা ছেড়ে ধীরে ধীরে ফিরে আসা অভিশপ্তা অহল্যা।
একইভাবে বিশৃঙ্খলা থেকে শৃঙ্খলার জ্যামিতি – সেখান থেকে জীবন্ত এক নারী প্রকৃতি । এই ছবি সাধারণে প্রথমে দেখতে পারেননা , কবি দেখিয়ে দিলে তবে দেখা যায় । কবির মহাজীবনের কাব্য – রং – রেখা – সঙ্গীত – কর্মের প্রতি ডাক দিয়ে -------------- বাইশে শ্রাবণ বলছে – থেমে থেকো না , এগিয়ে চলো , ‘চরৈবতি চরৈবতি’ – এইই জীবন , কেউ মরেনা – সবাই অমৃতের সন্তান ।
We hate spam as much as you do