ক্ষমতায় আসার প্রথম দিন থেকেই ‘ব্রিকসের’ কর্মকাণ্ডকে দু’চক্ষে দেখতে পারেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এক এক করে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের প্রতিটা দেশকে নিশানা করেছেন তিনি। রাশিয়ার উপর আছে যুক্তরাষ্ট্র-সহ পশ্চিমি দুনিয়ার ১৬ হাজারের বেশি নিষেধাজ্ঞা। চিনের সঙ্গে একপ্রস্ত শুল্কযুদ্ধ লড়ে নিয়েছেন ‘পোটাস’ (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস)। শিয়া ধর্মগুরুদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ইরানের ক্ষমতা বদলের জন্য ক্রমাগত উস্কানি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে।
চীন, ইরান, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকার নৌ মহড়া, ট্রাম্পকে পরোক্ষ হুমকি
জানুয়ারি ১২, ২০২৬
কেপটাউনের উপকূলে রাশিয়া, ইরান ও চীনের সঙ্গে সপ্তাহব্যাপী যৌথ নৌ মহড়া শুরু করেছে দক্ষিণ আফ্রিকা।
শনিবার 'উইল ফর পিস ২০২৬' নামের এই মহড়া শুরু হয়। যা শেষ হবে আগামী ১৬ জানুয়ারি।
ভেনেজ়ুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে খোদ দেশের প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে যাওয়া। ‘চিরশত্রু’ রাশিয়ার তেলবাহী জাহাজ আটক করা। কিংবা ঘরোয়া কোন্দলকে কেন্দ্র করে ইরানকে ক্রমাগত হুমকি-হুঁশিয়ারি। নতুন বছরের গোড়াতেই মার্কিন ‘দৌরাত্ম্যে’ ত্রাহিমাম অবস্থা বিশ্বের একাধিক দেশে। এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের উপর পাল্টা প্রত্যাঘাত শানাতে জোট বাঁধল ‘ব্রিকস প্লাস’ ভুক্ত চারটি দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের ‘লাল চোখ’কে উপেক্ষা করে যৌথ সামরিক মহড়ায় নেমেছে তাদের নৌবাহিনী। এর জেরে আটলান্টিকে ‘ক্ল্যাশ অফ টাইটানস’-এর আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না অনেকেই।
উপকূলের কাছে এই মহড়াগুলো কেবল শক্তি প্রদর্শন নয় বরং ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিক্রিয়া।
চীনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই মহড়াগুলো কেবল সামরিক অনুশীলন নয়, বরং উদীয়মান অর্থনীতির জোট ব্রিকসের দেশগুলোর মধ্যে একটি যৌথ সংকল্পের বহিঃপ্রকাশ বলে উল্লেখ করেন দক্ষিণ আফ্রিকার ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্স (এসএএনডিএফ) এর জয়েন্ট অপারেশন ডিভিশনের কমান্ডার ক্যাপ্টেন নন্ডওয়াখুলু থমাস থামাহা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, 'এটি একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকারের প্রদর্শন।' বার্তা সংস্থা এএফপি এ তথ্য জানিয়েছে।
থামাহা আরও বলেন, 'ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠা সামুদ্রিক পরিবেশে এ ধরনের সহযোগিতা কোনো বিকল্প নয়, এটি অত্যাবশ্যক। আমাদের উদ্দেশ্য নৌপথ এবং সামুদ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।'
ব্রিকস জোটটি শুরুতে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা নিয়ে গঠিত হলেও পরে এতে মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সবশেষ ইন্দোনেশিয়া যোগ দেয়।
ক্ষমতায় আসার প্রথম দিন থেকেই ‘ব্রিকসের’ কর্মকাণ্ডকে দু’চক্ষে দেখতে পারেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এক এক করে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের প্রতিটা দেশকে নিশানা করেছেন তিনি। রাশিয়ার উপর আছে যুক্তরাষ্ট্র-সহ পশ্চিমি দুনিয়ার ১৬ হাজারের বেশি নিষেধাজ্ঞা। চিনের সঙ্গে একপ্রস্ত শুল্কযুদ্ধ লড়ে নিয়েছেন ‘পোটাস’ (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস)। শিয়া ধর্মগুরুদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ইরানের ক্ষমতা বদলের জন্য ক্রমাগত উস্কানি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া ‘ব্রিকসের’ অন্য সদস্যদের মধ্যে ব্রাজ়িলের প্রেসিডেন্ট লুইজ় ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা এবং সাউথ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার সরকারের পতনও চান ট্রাম্প। এই দুই দেশের কুর্সিতে নিজের পছন্দসই রাজনৈতিক ব্যক্তিকে বসানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি। তাঁর শর্ত মেনে বাণিজ্যচুক্তিতে নয়াদিল্লি রাজি না হওয়ায় ভারতের উপরেও বিরক্ত ‘পোটাস’। আর তাই আগামী দিনে এ দেশের পণ্যে ওয়াশিংটন ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক চাপাবে বলে ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে।
এই নৌ মহড়ায় চীন ও ইরান ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে, রাশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত পাঠিয়েছে করভেট শ্রেণির জাহাজ। স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা একটি ফ্রিগেট যোগ করেছে। এছাড়া ইন্দোনেশিয়া, ইথিওপিয়া ও ব্রাজিল পর্যবেক্ষক হিসেবে মহড়ায় যোগ দিয়েছে।
'এক্সারসাইজ মোসি' নামে এই মহড়াগুলো গত বছরের নভেম্বরেই হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনের সঙ্গে সংঘাতের কারণে তা স্থগিত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ওই সম্মেলন বর্জন করেছিল।
ওয়াশিংটন দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রিকস জোটের বিরুদ্ধে 'মার্কিনবিরোধী' নীতির অভিযোগ তুলেছে। বিশ্বজুড়ে আগে থেকেই আরোপিত শুল্কের ওপর সদস্য দেশগুলো অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছে।
রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কসহ বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে দক্ষিণ আফ্রিকা আগেও যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনার মুখে পড়েছে। গাজা যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটনের মিত্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত- তার মধ্যে একটি।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে আফ্রিকানারদের—যারা শ্বেতাঙ্গ বসতিস্থাপনকারীদের বংশধর—উপর কথিত 'গণহত্যা' এবং তাদের জমি বাজেয়াপ্ত করার অভিযোগও তোলেন। দক্ষিণ আফ্রিকা এ অভিযোগ অস্বীকার করে।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (এএনসি) নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য সরকারের অন্যতম অংশ দ্য ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (ডিএ) এই মহড়ার সমালোচনা করেছে।
এক বিবৃতিতে ডিএ বলেছে, 'এই মহড়াগুলোকে "ব্রিকস সহযোগিতা" বলা আসলে একটি রাজনৈতিক কৌশল, যার মাধ্যমে আসল সত্য আড়াল করা হচ্ছে। বাস্তবে সরকার রাশিয়া ও ইরানের মতো বিতর্কিত ও নিষেধাজ্ঞাভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক বেছে নিচ্ছে।'
দেশটির নর্থ ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির রাজনৈতিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আন্দ্রে ডুভেনহাগে তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলুকে শুক্রবার আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এই যৌথ নৌ মহড়া ওয়াশিংটন ও প্রিটোরিয়ার সম্পর্ক আরও খারাপ করতে পারে।
তিনি বলেন, 'আমার কোনো সন্দেহ নেই যে এটি যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য পশ্চিমা দেশের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলবে। বিষয়টি খুবই গুরুতর হতে পারে। এই মুহূর্তে আমাদের দেশের বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক ও আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। এটি সমস্যাজনক; এটি ভুল মানুষের কাছে ভুল বার্তা দিচ্ছে।'
শুক্রবার স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যম নিউজরুম আফ্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দক্ষিণ আফ্রিকার উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী বান্তু হলোমিসা জানান, এসএএনডিএফ দীর্ঘদিন ধরেই অন্যান্য দেশের সঙ্গে এ ধরনের যৌথ নৌ মহড়ায় অংশ নিচ্ছে।
তিনি বলেন, 'এটা প্রথমবার নয় যে এসএএনডিএফ বন্ধুসুলভ দেশগুলোর সঙ্গে এমন মহড়া করছে। মনে রাখতে হবে, দক্ষিণ আফ্রিকা এখন ব্রিকসের অংশ এবং আরও অনেক দেশ ব্রিকসে যোগ দিয়েছে।'
২০২৩ সালে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে নৌ মহড়া আয়োজন করায়ও সমালোচিত হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা, কারণ তা ইউক্রেনে মস্কোর আগ্রাসনের প্রথম বার্ষিকীর সঙ্গে মিলে গিয়েছিল।
এই তিন দেশ প্রথমবারের মতো যৌথ নৌ মহড়া চালায় ২০১৯ সালে।
We hate spam as much as you do