Tranding

04:00 PM - 22 Mar 2026

Home / Entertainment / শারদীয়ার দিনগুলোয় বাঙালির পেট পুজো, দুই বাঙলার কথা

শারদীয়ার দিনগুলোয় বাঙালির পেট পুজো, দুই বাঙলার কথা

কদিন আগেই ডার্বি ম‍্যাচের সেই উত্তেজনা দেখে মনে হচ্ছিল বাঙালি আছে বাঙালিতেই। ডার্বি হোক, বাঙাল-ঘটি হোক, কিংবা ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের রেষারেষি, চিংড়ি-ইলিশের বাহারের এই লড়াই কিন্তু চিরন্তন। খাবার হোক কিংবা নিয়ম রীতি, হরেকরকম নতুনত্বে ও দুর্গাপুজো কিন্তু সবার কাছেই আনন্দের রেশ! পেটপুজো থেকে সাজগোজ কারও কোনও কিছুতেই এক্কেবারে খামতি নেই।

শারদীয়ার দিনগুলোয় বাঙালির পেট পুজো, দুই বাঙলার কথা

শারদীয়ার দিনগুলোয় বাঙালির পেট পুজো, দুই বাঙলার কথা

২২ অক্টোবর ২০২৩

"খাই খাই কর কেন 
এসো বসো আহারে 
খাওয়ার আজব খাওয়া 
ভোজ কয় যাহারে"


বাঙালি আড্ডা প্রিয় এবং ভোজনরসিক। তাই এই বাংলায় যে কোনো উদযাপন আড্ডা এবং খাওয়া দাওয়া ছাড়া জমে না। পুজোর রীতি রেওয়াজ, আচারের চেয়ে দুর্গা পুজোর চারটে দিন গড়পড়তা বাঙালির মন থাকে আড্ডা এবং খাওয়াতেই। এটাই বাংলার পূজো। আসলে যা উৎসব আর আনন্দ।  মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরা যদি নাও হয়, দুর্গা পুজোয় পেট পুজো কিন্তু হবেই হবে। 

হালে নানা ফুড ডেলিভারি অ্যাপে ছেয়ে গিয়েছে শহর-আধা শহর। যে কোনও জিভে জল আনা পদ আপনার ড্রয়িং রুমে পৌঁছতে সময় লাগে আধ থেকে ১ ঘণ্টা। অপেক্ষাটা কমেছে ঠিকই। কিন্তু পুজোর কটা দিন যেন আলমারির তাকে নতুন জামা তুলে রাখার মতো সারা বছরের খিদে বাঁচিয়ে রাখে খাদ্যরসিকেরা। কোনোটা ফুচকা খিদে, কোনোটা অষ্টমীর ভোগের খিদে, কোনোটা আবার নবমীর কচি পাঠার ঝোলের খিদে,  কোনোটা রোল খিদে, কোনোটা বিরিয়ানি খিদে। 


পুজোর চারটে দিন চলে যাবে, আপনি একদিনও এগ চিকেন রোল, কিম্বা মাটন রোল খাবেন না, এরকম হতে পারে? কিমবা ধরুন ফুচকা, নামী মণ্ডপের সামনের স্টলে দাঁড়িয়ে কলেজ ছাত্রী প্রেমিকার হাতের ছোঁয়ায় নতুন জামায় তেঁতুল জল পড়ে যাওয়া আর চিকেন মোমো খেতে খেতে  শাড়ির কুচি সামলানো, কিম্বা অনেকদিন না দেখা হওয়া বন্ধুদের সাথে মধ‍্য পঞ্চাশের ওরা যখন হলুদ ট‍্যাক্সি দাঁড় করিয়ে জমিয়ে মাটন বিরিয়ানি, চিকেন চাপ। 


শহর কলকাতার অনেক মজার মধ্যে এইটে একটা মজা। খাওয়া দাওয়ায় গরিব-বড়লোক ভাগ তেমন নেই। হ্যাঁ কে কোথায় খাবেন, সেই সিদ্ধান্ত  অবশ্যই যার যার ট্যাকের। কলকাতার মন এখনও বিরিয়ানিতে মজে। কারোর পাঁচতারায়, কারো আবার রাস্তার লাল কাপড়ে মোড়া স্টলে। 

এছাড়া নানা মাপের কাটলেট, চাওমিন,  তো রয়েইছে। মেলায় গেলে বুড়ির চুল। তবে বছরের অন্য সময় ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা ক্যাফেরা এইসময় যেন কিছুটা নিষ্প্রভ, কিছুটা একলা। 

ঐ যে বছরের অন্য সময় জিন্স, টপ, ট্রাউজার, ফর্মাল থাক না, এ'কটা দিন, শাড়ি, পাঞ্জাবি, সালোয়ার। তেমনই বছরের বাকি সময়টা ক্যাফে রঙিন, পুজোর কটা দিন ক্যাফের বাইরেটা।

কদিন আগেই ডার্বি ম‍্যাচের সেই উত্তেজনা দেখে মনে হচ্ছিল বাঙালি আছে বাঙালিতেই। ডার্বি হোক, বাঙাল-ঘটি হোক, কিংবা ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের রেষারেষি, চিংড়ি-ইলিশের বাহারের এই লড়াই কিন্তু চিরন্তন। খাবার হোক কিংবা নিয়ম রীতি, হরেকরকম নতুনত্বে ও দুর্গাপুজো কিন্তু সবার কাছেই আনন্দের রেশ! পেটপুজো থেকে সাজগোজ কারও কোনও কিছুতেই এক্কেবারে খামতি নেই। 

কথায় আছে, তখন এপার বাংলা আর ওপার বাংলায় পুজোর নিয়মে কোনও পার্থক্য না থাকলেও পেটপুজোয় কিন্তু কিছু না কিছু তফাৎ ছিলই। 


পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ অধিবাসীদের মধ্যে যে বিষয়টি ভীষণ নজরকাড়া সেটি হল অষ্টমী মানেই ফুলকো লুচির সঙ্গে হরেক পদের আয়োজন। ছোলার ডাল থেকে মিষ্টি আলুর দম, এবং মুগ হালুয়া থেকে চিনির পায়েস। প্রথা মেনে অষ্টমী মানেই নিরামিষ। বলা যেতে পারে অন্ন সেদিন খাওয়াই হয় না। আর নবমী মানেই পেট পুরে মাংস ভাতের এলাহী আয়োজন। সঙ্গে অন্যপদ থাকে বটে তবে এটিই মূল আকর্ষণ।


পুজো মানেই সকাল-বিকেল লুচি আর ছোলার ডাল বা আলুর দম মাস্ট।
যেটুকু শোনা যায়, দশমী মানেই ছিলেকাটা নিমকি আর নাড়ুর বোঝাই ছিল বিজয়ার আসল টান। বাড়ি বাড়ি ঘুরলে গোটা কয়েক নাড়ু না নিয়ে কেউই ফিরতেন না। তবে খাবারের আস্বাদনে বেশ ভাগ আছে বইকি! একটু নজর দিলেই দেখা যায় বেশিরভাগ ব্রাহ্মণ বাড়িতে পুজোর তিনটি দিন সকলেই নিরামিষ খান অর্থাৎ ষষ্ঠী-সপ্তমী-অষ্টমী তিনদিন বাইরে যেমনই হোক না কেন বাড়ির ভেতর কিন্তু একদম আমিষের ক্ষেত্রে ফুলস্টপ। পার্বণের অন্যান্য দিন গুলিতেও নিরামিষ পোলাও কিংবা খিচুড়ির টান ছিল বেশি। 


বিজয়া মানেই নিমকি আর নাড়ু
এবার আসা যাক ওপার বাংলার গল্পে। এইখানে কিন্তু বেজায় জটিল ব্যাপার স্যাপার। এক একটি জেলায় এক এক ধরনের খাবার আর নানান নিয়মেও ছড়াছড়ি। একটু ঘুরে আসা যাক! 

 কুমিল্লায় বেশিরভাগ বাড়িতেই পুজো মানেই নিরামিষ আয়োজন। পোলাও, খিচুড়ি, লাবড়া থেকে আরও কত কি! অষ্টমীতে অন্ন খাওয়ার কোনও বারণ একেবারেই নেই। আর নবমী মানেই কব্জি ডুবিয়ে মাংস সঙ্গে যেকোনও একটি মাছের পদ। দশমীতে মন্ডা পিঠে আর রসমালাই ছিল বিশেষ ব্যাপার ময়মনসিংহে  তিনদিনের নিরামিষ খাবার। নবমীতে তখন নাকি বলির মাংস প্রসাদ হিসেবেই সবাই খেত। মিষ্টিতে চিনির পায়েস আর মুড়ির মোয়া একেবারেই ম্যান্ডেটরি! তবে সুন্দর একটি বিষয় ছিল বেশ, বিজয়ায় বাড়ি এলেই তাকে নাকি পান সেজে দেওয়া হত এটি নাকি সৌজন্যের প্রতীক। 


খুলনায় এখানকার মতোই অষ্টমীতে ছোট্ট লুচি, কুচি নারকেলের ছোলার ডাল, সঙ্গে গুড়ের আর তিলের নাড়ু। শুনলেই কেমন মন ভাল হয়ে যায়। সিলেটের আবার বেশ রসালো একটি নিয়ম। নবমীতে চুইঝালের মাংস রান্নাই নাকি তাদের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ ছিল। বরিশালে একেবারেই নিরামিষ খাবারের নাকি কোনও চল ছিল না। অষ্টমীতে মাছের মুড়ো দিয়ে যেকোনও স্পেশাল আইটেম রাখতেই হবে মেনুতে। নবমী মানেই খাসির মাংসের আয়োজন। আর শখের ওপর ভিত্তি করেই ক্ষীরের মোয়া আর মুড়ির মোয়া তৈরি হত। 


মাছের মুড়ো ও ক্ষীরের মোয়া
এক্কেবারে আলাদা কিন্তু ঢাকা শহরের খাওয়াদাওয়া। হাজার নিয়ম রীতি মেনেই আজও একইরকম ভাবে আয়োজন করা হয়। অষ্টমী অবধি নিরামিষ অবধারিত। দশমীতে মাছের মাথার তরকারি, রুই কিংবা কাতলা মাছ ভাজা, লাল শাক ভাজা এগুলো কিন্তু হতেই হবে। আরেকটি নিয়মের মধ্যে পড়ে যাত্রা থালা! তবে এর সঙ্গে খাবারের যোগ কী? আছে! ঠাকুরের থালাতেই কাঁচা হলুদ-সিঁদুর-তেল-প্রদীপ জ্বালিয়ে তাতে রাখা হয় দুটি পুঁটি মাছ, এমনকি সারা বছরে অঙ্গে পড়ে থাকা সোনার গয়না খুলে রাখা হয় তাতে। মা দুর্গার বিদায়ক্ষণে যতক্ষণ না পর্যন্ত সেই প্রদীপ নিভছে থালায় হাত দেওয়া চলে না। পরেই সেই দুটি পুঁটি মাছ কেবলমাত্র হলুদ এবং নুন দিয়ে কাঁচা অবস্থায় রান্না করার পরেই পরিবারের সকলে অল্প করেই খান সেটি।

ওই যে বলে পুজোয় এক একজনের হরেক রকম খাবার দাবার! কিন্তু স্বাদ মানুষকে একত্র করে রেখেছে। পুজোর ভোগ হোক কিংবা বিজয়ার মিষ্টি, দুই পক্ষের নিত্যনতুন কিছু না কিছু বাংলার
  সংস্কৃতির এক অটুট সম্পর্ক। নিয়ম বদলেছে অনেক, আবার অনেকেই পুরনো রীতি আজও মেনে আসছেন। 

পুজো মানেই বাড়িতে মিষ্টিমুখ হবেই। এই সময় বাড়িতে বন্ধু, আত্মীয়দের আগমন লেগেই থাকে। মিষ্টি ছাড়া বাঙালির খাবার অসম্পূর্ণ। এই পুজোর দিনে মিষ্টি উপভোগ করতে কে না ভালবাসে। তাও যদি সেটা হয় দুর্গাপুজো । তবে তার আনন্দই আলাদা।

Your Opinion

We hate spam as much as you do