ম্যাচের ২৪ মিনিটেই ইস্টবেঙ্গল খেলার গতির বিরুদ্ধে এগিয়ে যেতে পারত। কিন্তু ব্রাজিলিয়ান মার্সেলো মোহনবাগান গোলরক্ষক অমরজিৎকে একা পেয়েও সঠিক জায়গায় বল প্লেস করতে পারেননি। দ্বিতীয়ার্ধের প্রারম্ভীক পর্বে ইস্টবেঙ্গল খানিকটা খোলস ছেড়ে বের হয়। যার সুবাদে ৫৬ মিনিটে কর্নার ও সিডেলের গোল (১ - ০)। এরপর বাকি সময়টা জুড়ে শুধুই জামসেদ পুত্র কিয়ান।
গতকালের খেলা,এক নতুন তারকার জন্ম, নিভে গেল লাল হলুদ মশাল
বাইচুং,এডে চিডির পর তিনি ডার্বিতে হ্যাট্রিক করার নজির তৈরী করলেন সেই ক্লাবের বিরুদ্ধে যেই ক্লাবে খেলে তাঁর বাবা মহাতারকার তকমা পেয়েছিলেন। কিন্তু তফাৎ হচ্ছে, বাইচুং বা চিডি শুরু থেকেই মাঠে ছিলেন, অর্থাৎ প্রথম একাদশ তাঁদের বাদ দিয়ে গড়ার কথা ভাবা যেত না কারণ দুজনেই তখন তারকা। তিনি দীপক টাংরির জায়গায় যখন মাঠে নামলেন তখন দল এক গোলে পিছিয়ে, হাতে সময় তিরিশ মিনিটের কিছু বেশী। কিন্তু মর্যাদার ডার্বিতে ডুবন্ত পাল তোলা নৌকোর পালে তিনিই হাওয়া লাগালেন।
বয়স সবে একুশ, এটিকে মোহনবাগনের হয়ে এটি ছিল তাঁর দ্বিতীয় ম্যাচ। দল এগিয়ে গেলে কোচ তাঁকে হয়ত নামতেনও না। কিন্তু হুয়ান ফেরান্দো তাঁর তুরূপের তাস সঠিক সময়ে বার করলেন এবং কোচ হিসেবে এই মাস্টারস্ট্রোক তাঁর আজীবন মনে থাকবে। তিনি হয়তো ভাবতেও পারেননি এই মহারণে কিয়ান নাসিরি নামক এক একুশ বছরের অনভিজ্ঞ ফুটবলার সমস্ত লাইম লাইট শুষে নেবে এবং যাকে সম্ভাব্য হিরো অফ দ্য ম্যাচ ভাবা হচ্ছিল সেই লিস্টন কোলাসোর্ নাম আর ম্যাচের শেষে ভাবাই যাবে না।
শুরু থেকেই ম্যাচের রাশ এটিকে মোহনবাগানের হাতে ছিল। হাবাস জমানার বিরক্তিকর ডিফেন্সিভ ফুটবলের বদলে হুয়ান ফেরান্দার সৌজন্যে যথারীতি পজেশনাল ফুটবল খেলতে দেখা গেল হুগো বুমো, ডেভিড উইলিয়ামস, লিস্টনদের। প্রান্তিক আক্রমণে বারবার ছিন্নভিন্ন হয়েছে লাল হলুদের রক্ষণ। বিশেষ করে বলতেই হবে লিস্টন কোলাসোর কথা, যিনি তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা খেলা এদিন খেললেন। লেফ্ট উইং দিয়ে তাঁর দৌড় অমরজিৎকে বার বার মাটি ধরিয়েছে।
রাইট উইং দিয়েও বেশ কয়েকবার মনবীর আক্রমণ শানিয়েছেন কিন্তু লিস্টনের তুলনায় তা নগন্য। তবে সমস্ত আক্রমণ লাল হলুদ ডিফেন্সের পায়ের জঙ্গলে হারিয়ে গেছে। প্রথমার্ধে ইস্টবেঙ্গল ডিফেন্সে আদিল খান ও হীরা মন্ডল অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিলেন। এদিন ইস্টবেঙ্গল মূলত কাউন্টার অ্যাটাকের উপর ভরসা রেখেছিল।
ম্যাচের ২৪ মিনিটেই ইস্টবেঙ্গল খেলার গতির বিরুদ্ধে এগিয়ে যেতে পারত। কিন্তু ব্রাজিলিয়ান মার্সেলো মোহনবাগান গোলরক্ষক অমরজিৎকে একা পেয়েও সঠিক জায়গায় বল প্লেস করতে পারেননি। দ্বিতীয়ার্ধের প্রারম্ভীক পর্বে ইস্টবেঙ্গল খানিকটা খোলস ছেড়ে বের হয়। যার সুবাদে ৫৬ মিনিটে কর্নার ও সিডেলের গোল (১ - ০)। এরপর বাকি সময়টা জুড়ে শুধুই জামসেদ পুত্র কিয়ান।
তবে আরও একবার প্রশংসা করতে হবেই লিস্টনের এবং অবশ্যই বঙ্গসন্তান প্রবীর দাসের। নিশ্চিত গোল দৃষ্টিনন্দন স্লাইডিং ট্যাকেলে ব্লক করে দেওয়া হোক বা ঘন ঘন ওভার ল্যাপে উঠে আক্রমণ সানানো, প্রবীর দাস আজ নামের প্রতি সুবিচার করেছেন। ৬৩ মিনিটেই মোহনবাগান সমতা ফিরিয়ে আনতে পারত। বামপ্রান্ত দিয়ে সেই লিস্টন দর্শনীয় স্টেপওভারে অমরজিৎকে আউটসাইড ডজ করে বেরোতে গেলে অমরজিৎ তাঁকে বক্সের মধ্যে বিশ্রী ফাউল করেন। যথাযথ ভাবেই রেফারি পেনাল্টির নির্দেশ দেন।
কিন্তু ডেভিড উইলিয়ামস এদিন ডার্বি ম্যাচের চাপ বোধহয় নিতে পারেন নি। তাঁর শট গোলপোস্টের অনেক উপর দিয়ে বেরিয়ে যায়। এরপর ৬৬ মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে ওভার ল্যাপে উঠে আসা প্রবীর দাসের মাইনাস কেউ মিট করতে না পারায় বল বাম প্রান্তে নো - ম্যান্স ল্যান্ডে চলে যায়। সেখান থেকে বল ধরে লিস্টন কোলাসোর শট আদিল ও সৌরভের গায়ে ডিফলেক্ট হয়ে কিয়ানের পায়ে পড়ে। অরক্ষীত কিয়ান বিনা বাধায় নিখুঁত প্লেসিংয়ে বল জালে জড়ান (১-১)।
এরপর দুদলই একাধিক সুযোগ কাজে লাগিয়েও কাঙ্খিত লক্ষে পৌঁছতে পারে নি। ৯০ মিনিটেও ফলাফল একই থাকায় দু দলের সমর্থকরাই ধরে নিয়েছিলেন যে ম্যাচ ড্র থাকবে সে যতই রেফারি ৬ মিনিট অ্যাডেড দিন কিন্ত আজ তো তারই দিন। ৯৩ মিনিটে বাম প্রান্ত থেকে উড়ে আসা ক্রসে ডেভিড উইলিয়ামস প্রাণপণে মাথা ছুঁইয়ে পেনাল্টি মিস সুদে আসলে পুষিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বল সাইড পোস্টে ধাক্কা খেয়ে চলে আসে সেই কিয়ান নাসিরির কাছে। দর্শনীয় ভলিতে তিনি যখন জাল কাঁপাচ্ছেন তখন ইস্টবেঙ্গল ডিফেন্স দর্শকের ভূমিকায়। পরের মিনিটেই তিনি হ্যাট্রিক সম্পন্ন করে ফেলেন। মনবীর সিংহ ডানদিক থেকে ইস্টবেঙ্গল রক্ষণকে ফালাফালা করে ঢুকে গোলে শট নেওয়ার মুহূর্তে আদিল খান ফাইনাল ট্যাকেল করেন। বল ডিফেলেক্ট হয়ে আবার চলে আসে সেই কিয়ানের কাছে। বা পায়ের নিখুঁত প্লেসিংয়ে মাটি - ঘেঁষা শটে জাল কাঁপান। এখানে উল্লেখ যোগ্য যে প্রতিটি গোলই কিয়ান করেছেন সেকেন্ড চান্সে অর্থাৎ কল্লোলিনী তিলোত্তমা এক সুযোগ সন্ধানী স্ট্রাইকারকে পেল যাকে এবার থেকে আর জামসেদ নাসরির পুত্র বলে সম্বোধন করা হবে না।
এটিকে মোহনবাগান : অমরিন্দর, তিরি, শুভাশিস, প্রীতম, প্রবীর, ম্যাকহিউ, দীপক (কিয়ান), বুমো, মনবীর, লিস্টন, উইলিয়ামস (লেনি)
এসসি ইস্টবেঙ্গল : অরিন্দম, আদিল, অঙ্কিত (পোরসে), হীরা, সিডেল (রফিক), লুয়াঙ, সৌরভ, পেরিসোভিচ (শুভ), মারসেলো (লালরিনলিয়ানা), নাওরেম (হাওকিপ)
We hate spam as much as you do