জম্মু ও কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা রদ করা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় দেওয়ার পরেই সোমবার দুপুরে রাজ্যসভায় জম্মু ও কাশ্মীরের আইন সংক্রান্ত দুই বিল পেশ করেন অমিত শাহ। বিল পেশের পরই রাজ্যসভায় হই-হট্টগোল শুরু হয়ে যায়। বিরোধীরা আপত্তি জানায়। তবে এই দুই বিল পাশ করাতে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি মোদী সরকারকে।
লোকসভার পর রাজ্যসভায় পাশ জম্মু ও কাশ্মীরের আরও দু'টি সংশোধনী বিল
11th December 2023
এই দিনই রাজ্যসভায় পাশ হয়ে গেল জম্মু ও কাশ্মীরের আরও দু'টি বিল। এই বিল দু'টি গত সপ্তাহেই পাশ হয়েছিল লোকসভায়।
জানা গেছে, এদিন রাজ্যসভায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জম্মু ও কাশ্মীর সংরক্ষণ আইন (সংশোধনী) বিল ও জম্মু ও কাশ্মীর পুনর্গঠন আইন (সংশোধনী) বিল পাশ করেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই এই বিল সংশোধনী বিল দু'টি পাশ হয় রাজ্যসভায়।
২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে জিতে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর নরেন্দ্র মোদী সরকার, জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ সুবিধা সংক্রান্ত ধারা ৩৭০ প্রত্যাহার করে। শুধু তাই নয়, রাজ্যের মানুষের সুযোগ-সুবিধা সংক্রান্ত বেশকিছু আইনও পাশ করা হয়। তার মধ্যেই দু'টি আইন সংশোধনের প্রস্তাব করা হয় এই বছরই।
জম্মু ও কাশ্মীর থেকে সংবিধানের ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার করে কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদী সরকার ঐতিহাসিক পদক্ষেপ করেছিল। এ জন্য সংবিধান সংশোধন করেছিল কেন্দ্রের সরকার। সাউথ ব্লকের সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের সংবিধান বেঞ্চে মামলা দায়ের হয়েছিল। প্রায় চার বছর বাদে সেই মামলার রায় ঘোষণা করে গিয়ে সুপ্রিম কোর্ট এদিন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে জম্মু ও কাশ্মীরে সংবিধানের ৩৭০ ধারার প্রয়োগ কোনও চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ছিল না। তা ছিল অস্থায়ী ব্যবস্থা।
জম্মু ও কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা রদ করা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় দেওয়ার পরেই সোমবার দুপুরে রাজ্যসভায় জম্মু ও কাশ্মীরের আইন সংক্রান্ত দুই বিল পেশ করেন অমিত শাহ। বিল পেশের পরই রাজ্যসভায় হই-হট্টগোল শুরু হয়ে যায়। বিরোধীরা আপত্তি জানায়। তবে এই দুই বিল পাশ করাতে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি মোদী সরকারকে।
জম্মু ও কাশ্মীরের সংরক্ষণ আইন সংশোধন করার কথা বলা হয়েছে নতুন বিলে। এতে নিয়োগ এবং পেশাদার প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে তফসিলি জাতি, উপজাতি এবং অন্যান্য সামাজিক ও শিক্ষাগতভাবে অনগ্রসর শ্রেণির মানুষদের জন্য সংরক্ষণ বাড়ানোর দিকে জোর দেওয়া হয়েছে। এমনকী বিধানসভায় আসন সংখ্যা বাড়িয়ে সেখানেও সংরক্ষণ করার উল্লেখ আছে নতুন বিলে।
এছাড়াও, জম্মু ও কাশ্মীর আইন পুনর্গঠন (সংশোধনী) বিলে ১৫ (ক) এবং ১৫ (খ)--- এই দুই ধারা যোগ করার কথা বলা হয়েছে। এদিন বিল পেশের সময় পাক-অধিকৃত কাশ্মীর নিয়ে বলতে গিয়ে অমিত শাহ টেনে আনেন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরুকে। শাহ বলেন, কাশ্মীরে যদি অসময়ে যুদ্ধবিরতি না ঘোষণা করা হত তবে পাক-অধিকৃত কাশ্মীর থাকতই না। সেটা নেহেরুর 'ভুল' ছিল বলেও উল্লেখ করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
২০২০ সালের মার্চ মাসে জম্মু ও কাশ্মীরের আসন পুনর্বিন্যাসের জন্য সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রঞ্জনাপ্রকাশ দেশাইয়ের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির তরফে ২০২২ সালের মে মাসে জম্মুতে ছ’টি এবং কাশ্মীরে একটি আসন বৃদ্ধি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। সেই প্রস্তাব মেনেই পাশ হয়েছে বিল।
জম্মু-কাশ্মীর সংশোধিত পুনর্গঠন বিলে জম্মু-কাশ্মীর বিধানসভার আসনসংখ্যা ৮৩ থেকে বাড়িয়ে ৯০ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার পক্ষ। বিলে যাযাবর গোষ্ঠী থেকে দু’জন (যাঁদের এক জন মহিলা) ও পাক অধিকৃত কাশ্মীর থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন এমন এক জন-সহ মোট তিন জনকে মনোনীত করবেন উপরাজ্যপাল। আর জম্মু-কাশ্মীর সংরক্ষণ বিলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মহিলা বিশেষ করে তফসিলি জাতি ও জনজাতির সমাজের নারীদের শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, উপরাজ্যপাল নন, পূর্ণাঙ্গ রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্যপাল পাবে তিন জন বিধায়ক মনোনয়নের ভার। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, জনবিন্যাস কিংবা জনসংখ্যার ভিত্তিতে নয়, ‘ধর্মীয় মেরুকরণ’ মেনেই বিধানসভায় জম্মুর জন্য আসন বাড়িয়ে উপত্যকাকে কব্জা করতে চাইছে বিজেপি।
কেন্দ্রশাসিত থাকবে লাদাখ
জম্মু ও কাশ্মীরকে পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়ার নির্দেশ দিলেও লাদাখকে ‘কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল’ হিসাবেই রাখার নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির সংবিধান বেঞ্চের রায়— কোনও রাজ্যের একটি নির্দিষ্ট অংশকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ঘোষণা করা যায়। তা সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩-এ বর্ণিত রয়েছে।
কেন্দ্রের ওই সিদ্ধান্তের পর কাশ্মীর থেকে আলাদা হতে পেরে উচ্ছ্বাসের বাঁধ ভেঙেছিল লাদাখে। বিশেষ মর্যাদা বিলোপ নিয়ে কাশ্মীর উপত্যকা যখন উত্তাল, তখন সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি দেখা গিয়েছিল লেহ্-র রাস্তায়। কিন্তু তার দু’বছর পেরোতে না পেরোতেই ‘মোহভঙ্গ’ হয় লাদাখের! আলাদা রাজ্যের মর্যাদা পেতে সেখানে সাম্প্রতিক কালে বেশ কয়েক বার বিক্ষোভও হয়েছে।
চলতি বছরের গোড়ায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে সম্প্রতি লাদাখের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিতে ছিলেন দেশের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই, লাদাখের সাংসদ এবং লাদাখের দু’টি (লেহ্ এবং কারগিল) স্বশাসিত পরিষদের প্রতিনিধিরা। কিন্তু লেহ্ পরিষদের নেতারা কমিটির বৈঠকে যোগ দিতে রাজি হননি। স্বতন্ত্র রাজ্য কিংবা সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্ভুক্তির দাবি তুলে পরিষদের নেতারা জানিয়ে দেন, দাবি পূরণ না হলে আলোচনা বৃথা। এতে অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছিল মোদীর সরকারকে। পরবর্তী কালে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থও হন লাদাখের নেতারা। তাঁদের বক্তব্য ছিল, উন্নয়নের নামে গণতন্ত্র ছিনিয়ে নিয়েছে কেন্দ্র! কিন্তু আপাতত কেন্দ্রের সিদ্ধান্তই বহাল রাখল শীর্ষ আদালত।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ এক্স হ্যান্ডলে জানান, এই রায়ের ফলে গরিব এবং বঞ্চিতদের অধিকার পুনরুদ্ধার হবে। বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপ, পাথর ছোড়ার মতো ঘটনা এখন থেকে অতীত হয়ে যাবে। গোটা অঞ্চলে এখন ঐক্যের সুর বাজবে। তাঁর কথায়, “জম্মু-কাশ্মীর এবং লাদাখ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল, এবং তা থাকবেও। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে আমাদের সরকার জম্মু-কাশ্মীর এবং লাদাখে শআন্তি ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর।”
লোকসভার বিরোধী দলনেতা তথা কংগ্রেস সাংসদ অধীর চৌধুরী এই রায় প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, বার বারই তাঁদের দাবি ছিল কবে জম্মু-কাশ্মীরকে পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হবে। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর দ্রুত জম্মু-কাশ্মীরকে রাজ্যের মর্যাদা দিয়ে সেখানে দ্রুত নির্বাচন করানোর ব্যবস্থা করা হোক।
কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ওমর আবদুল্লা সুপ্রিম কোর্টের রায় শোনার পর জানান, তিনি হতাশ। তবে আশাহত হননি। ওমরের কথায়, ‘‘আমি হতাশ। তবে আশাহত নই। আমাদের লড়াই জারি থাকবে। বিজেপির এই জায়গায় পৌঁছতে বহু বছর সময় লেগেছে। আমরাও দীর্ঘ লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত।’’ ডেমোক্র্যাটিক প্রোগ্রেসিভ আজাদ পার্টি-র চেয়ারম্যান তথা প্রাক্তন কংগ্রেস নেতা গুলাম নবি আজাদ এই রায়কে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলেছেন। তাঁর কথায়, “জম্মু-কাশ্মীরের মানুষ এই রায়ে খুশি নন। তবে আমাদের এটি মেনে নিতে হবে।”
We hate spam as much as you do