Tranding

08:45 PM - 06 May 2026

Home / National / কেউ কথা রাখেনি! কৃষক সভার নেতৃত্বে মহারাষ্ট্রে আবার ‘লং মার্চ’ শুরু

কেউ কথা রাখেনি! কৃষক সভার নেতৃত্বে মহারাষ্ট্রে আবার ‘লং মার্চ’ শুরু

এ বার ১৭ দফা দাবি ভিত্তিতে সোমবার থেকে ‘কিসান লং মার্চ’ শুরু হয়েছে। শামিল হয়েছেন ১০ হাজারেরও বেশি কৃষক। আন্দোলনকারীদের আশা, গত বারের মতোই মিছিল যতই মুম্বইয়ের দিকে এগোবে, কলেবরে বাড়তে থাকবে। তাঁদের দাবি, ২০০৬ সালে ইউপিএ সরকারের আমলে চালু হওয়া অরণ্যের অধিকার আইন অবিলম্বে কার্যকর করতে হবে মহারাষ্ট্রে। ওই আইন কার্যকর হলে ভূমিহীন আদিবাসী কৃষকেরা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জমিতে চাষের অধিকার পেতে পারেন। পাশাপাশি, পেঁয়াজ, তুলো, সয়াবিন, সবুজ ছোলার মতো ফসলের সহায়ক মূল্য এবং কৃষিঋণ মকুবের দাবি তুলেছেন তাঁরা।

কেউ কথা রাখেনি! কৃষক সভার নেতৃত্বে  মহারাষ্ট্রে আবার ‘লং মার্চ’ শুরু

কেউ কথা রাখেনি! কৃষক সভার নেতৃত্বে  মহারাষ্ট্রে আবার ‘লং মার্চ’ শুরু

১৬ মার্চ ২০২৩

বসন্তের রোদ গায়ে মেখে আবার ‘লং মার্চ’ শুরু করলেন মহারাষ্ট্রের কৃষকেরা। ঠিক ৫ বছরের ব্যবধানে। নাসিকের ডিন্ডোরি থেকে রাজধানী মুম্বইয়ের উদ্দেশে সেই পুরনো ১৮০ কিলোমিটারের যাত্রাপথ ধরে।

কৃষিঋণ মকুব, ভূমিহীন আদিবাসীদের জঙ্গলের জমির পাট্টা, ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য, সেচের সুবিধা এবং কৃষকদের পেনশনের দাবিতে মহারাষ্ট্রে গত এক দশক ধরেই আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে বৃহত্তম বাম কৃষক সংগঠন ‘অল ইন্ডিয়া কিসান সভা’ (এআইকেএস)। ওই দাবিগুলি সামানে রেখে ২০১৮ সালে পায়ে হেঁটে নাসিক থেকে মুম্বই পৌঁছে গিয়েছিলেন ৫০ হাজারেরও বেশি কৃষক। দেশের ‘অন্নদাতা’দের সেই মিছিলকে সমর্থন করে পাশে দাঁড়িয়েছিল মহারাষ্ট্রের নাগরিক সমাজ। বিরোধীরাও সেই ‘লং মার্চ’-কে সমর্থন করেছিল।

প্রবল চাপের মুখে সে বার কৃষকদের দাবি মেনে ছ’মাসের মধ্যে তা পূরণ করার লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মহারাষ্ট্রের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীস। ঘটনাচক্রে, তিনি এখন উপমুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে। কৃষক সভার অভিযোগ, ৫ বছর পেরিয়ে গেলেও বিজেপি জোটের রাজ্য এবং কেন্দ্র সরকার সেই প্রতিশ্রুতি রাখেনি। বস্তুত, ২০১৯ সালেও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগে মিছিল করেছিলেন তাঁরা। পরবর্তী সময়ে মোদী সরকারের বিতর্কিত ৩ কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে মহারাষ্ট্রে আন্দোলনও সংগঠিত করেছেন।

এ বার ১৭ দফা দাবি ভিত্তিতে সোমবার থেকে ‘কিসান লং মার্চ’ শুরু হয়েছে। শামিল হয়েছেন ১০ হাজারেরও বেশি কৃষক। আন্দোলনকারীদের আশা, গত বারের মতোই মিছিল যতই মুম্বইয়ের দিকে এগোবে, কলেবরে বাড়তে থাকবে। তাঁদের দাবি, ২০০৬ সালে ইউপিএ সরকারের আমলে চালু হওয়া অরণ্যের অধিকার আইন অবিলম্বে কার্যকর করতে হবে মহারাষ্ট্রে। ওই আইন কার্যকর হলে ভূমিহীন আদিবাসী কৃষকেরা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জমিতে চাষের অধিকার পেতে পারেন। পাশাপাশি, পেঁয়াজ, তুলো, সয়াবিন, সবুজ ছোলার মতো ফসলের সহায়ক মূল্য এবং কৃষিঋণ মকুবের দাবি তুলেছেন তাঁরা।

কী দাবীতে কৃষকদের মিছিল?

মিছিলে হাঁটার পথেই সারা ভারত কৃষক সভার রাজ্য সভাপতি উমেশ দেশমুখ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “সরকারের কাছে আমাদের দাবীগুলো খুব স্পষ্ট। এবছর পেঁয়াজ চাষ করে উত্তর মহারাষ্ট্রের হাজার হাজার কৃষক বিপুল পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। কুইন্টাল (একশো কেজি) প্রতি মাত্র ৭০০ টাকা করে পাওয়া যাচ্ছে, যা উৎপাদন খরচের অর্ধেক। সরকার সর্বনিম্ন সংগ্রহ মূল্য ২,০০০ টাকা কুইন্টালপ্রতি নির্দিষ্ট করুক, যার মধ্যে অনুদান হিসাবে দেওয়া হোক ৫০০/৬০০ টাকা করে।“

ফসলের ক্ষতি হলে বীমার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ করা, বিদ্যুতের বিল আর কৃষি ঋণ মওকুফ করাসহ আরও একগুচ্ছ দাবী নিয়ে কৃষকরা এখন এগোচ্ছেন মুম্বাইয়ের দিকে।

ওই মিছিলে যে শুধু পেঁয়াজ-চাষীরা যোগ দিয়েছেন তা নয়। সংগঠকরা বলছেন দুধ উৎপাদনকারী, সয়াবিন, তুলো আর ডাল-চাষীরাও যে ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ছেন, সেগুলোরও সমাধান চান তারা।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এবছর কৃষকরা ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। পাঞ্জাব থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের আলু-চাষী হোন, তেলেঙ্গানা, অন্ধ্র প্রদেশ আর মহারাষ্ট্রে পেঁয়াজ-চাষী হোন বা ছত্তিশগড়ের আনাজ-চাষী – বহু জায়গাতেই ক্ষতির পরিমাণ কমাতে তারা ক্ষেতেই ফসল নষ্ট করে দিচ্ছেন।

মহারাষ্ট্রের পেঁয়াজ চাষী কৃষ্ণ ডোংরে যেমন তার ক্ষেতের ১৫ হাজার কেজি পেঁয়াজ পুড়িয়ে ফেলেছেন, তেমনই ট্র্যাক্টর চালিয়ে তিন একর জমির পেঁয়াজ নষ্ট করে দিয়েছেন সেখানকারই আরেক পেঁয়াজ-চাষী রাজেন্দ্র বোঢ়গুঢ়ে।

বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে বোঢ়গুঢ়ে সম্প্রতি জানিয়েছেন, “তিন একর জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছিলাম এই মওসুমে। পেঁয়াজ মণ্ডিতে আড়ৎদারের কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়া পর্যন্ত এক লাখ দশ হাজার টাকা মতো খরচ হয় প্রতি একরের ফসলে। এক একরে ১৫০ কুইন্টাল তো হয়, ভাল ফলন হলে ১৭০-৮০ কুইন্টালও হয়। সেই হিসাব যদি করেন, তাহলে এক একরের ফসল থেকে গড়ে আমি দাম পাচ্ছি ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০ টাকা যা আমার খরচের অর্ধেক। তো সেই ফসল আড়তে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আরও বাড়তি খরচ করে লোকসানের বোঝা বাড়াবো না কি?”

পশ্চিমবঙ্গ, পাঞ্জাবে ক্ষতির মুখে আলু-চাষীরা

মহারাষ্ট্রের নাসিক থেকে বহু দূরে পশ্চিমবঙ্গের সিঙ্গুর, যে অঞ্চলটি আলু ফলনের জন্য পরিচিত। নাসিকের পেঁয়াজ-চাষীরা যখন অতিরিক্ত ফলনের জন্য ক্ষতির মুখে পড়েছেন, তেমন সিঙ্গুর এলাকায় আবার এবছর বিঘা প্রতি আলুর ফলন কম হয়েছে।

সেখানকার এক কৃষক প্রহ্লাদ মণ্ডলের কথায়, “চাষের উৎপাদন খরচ গতবছরের তুলনায় এবছর অনেকটা বেড়ে গেছে। যে সার আমরা গতবছর কিনেছি ১২০০/১৩০০ টাকায়, এবছর সেই সার কিনতে হয়েছে ২,২০০-২,৩০০ টাকায়। কৃষি শ্রমিকদের মজুরি ৩০০ থেকে বেড়ে ৪০০ টাকা হয়েছে। প্রতি ঘণ্টায় জলের খরচ বেড়েছে ৫০ টাকা করে। আমার এক বিঘা জমিতে আলু চাষ করতে প্রায় ৩০-৩৫,০০০ টাকা খরচ হয়েছে। তারওপরে আমার মতো এলাকার অনেকের জমিতেই ফলন প্রায় অর্ধেক হয়েছে।

“অন্যদিকে সরকার থেকে যে সহায়ক মূল্য ঘোষণা করেছে, তা হল ৬৫০ টাকা প্রতি একশো কেজি। আমি ৩০-৩৫,০০০ টাকা খরচ করে পাচ্ছি ১৫-১৬,০০০ টাকা,” জানাচ্ছিলেন. মণ্ডল।

পশ্চিমবঙ্গের আলু-চাষীরাও সম্প্রতি রাস্তায় আলু ফেলে দিয়ে বিক্ষোভ করেছেন।আবার পাঞ্জাব বা উত্তরপ্রদেশের মতো অনেক রাজ্যে আলুর প্রচুর ফলন হয়েছে এবছর। তাই সেখানে আলুর দাম অত্যধিক পড়ে গেছে।

দারুণ ফলন এবছর, তাই দাম মুখ থুবড়ে পড়েছে

ভারতের কৃষি এবং কৃষকদের নিয়ে ‘নিউজপোটলি’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেলের সাংবাদিক অরভিন্দ শুক্লা
বিবিসি বাংলাকে বলেন, “গত বছর এই নাসিকের পেঁয়াজই চাষীরা বিক্রি করেছেন ২০ টাকা কেজি দরে, যেটা ১০০ টাকা করে কিনে খেয়েছি আমরা। কৃষকদের একটা স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, এবছর যে ফসলের দাম বেশি উঠল, পরের বছর তারা সেটা আরও বেশি করে চাষ করেন। এবছর ঠিক সেটাই হয়েছে। গতবছর বেশি দাম পেয়েছেন দেখে এবছর আরও বেশি করে চাষ করেছেন, আর তাদের সাহায্য করেছে আবহাওয়া। তাই বেশিরভাগ জায়গায় আলু বা পেঁয়াজের ফলন অত্যধিক বেশি হয়েছে, আর দাম মুখ থুবড়ে পড়েছে।“

তিনি ইসরায়েলের উদাহরণ দিয়ে বলছিলেন, “সেখানে চাহিদা অনুযায়ী চাষ করা হয়। যাতে অতিরিক্ত ফলনের কারণে দাম না পড়ে যায়, আবার খাদ্য ভাণ্ডারেও টান না পড়ে। আমাদের দেশে তো সেই ব্যবস্থাপনা নেই। দেশের জন্য কী পরিমাণ আনাজ লাগবে, বিদেশে কতটা রপ্তানি হবে, সেই সব তথ্য মিলিয়ে কৃষকদের নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে যে এই পরিমাণের বেশি চাষ করা যাবে না।"

"আর সুষ্ঠু বণ্টন ব্যবস্থা তো নেই-ই। এই নাসিকে দেখে এলাম আলুর দাম কিলোপ্রতি ২৫ টাকা আর আমি উত্তরপ্রদেশের যে শহরে থাকি সেই বারাবাঙ্কিতে আলু চার টাকা। সুষ্ঠু বণ্টন ব্যবস্থা থাকলে কী এই অবস্থা হয়?”

'রাজনৈতিক দল বা সরকারের মাথ্যব্যথা নেই'

মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, পশ্চিমবঙ্গ বা উত্তরপ্রদেশের কৃষকরা বলছেন, কোনও অত্যাবশ্যকীয় আনাজ যেমন আলু বা পেঁয়াজের দাম যখন বাজারে খুব বেড়ে যায়, তখন সরকার তড়িঘড়ি ব্যবস্থা নিতে নামে যাতে সাধারণ মানুষের ওপরে চাপ বেশি না পড়ে।

কিন্তু যখন কৃষকরা অত্যধিক কম দামে আনাজ বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন, তখন রাজনৈতিক দল বা সরকারের মাথা ব্যথা হয় না, সেগুলো নিয়ে জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো প্রাইম টাইম টকশো করে না।

কৃষি বিশেষজ্ঞ দেবেন্দ্র শর্মা বিবিসিকে বলেন, “যখন শহরাঞ্চলের মানুষদের বেশি দামে সবজি কিনতে হয়, তখন দেশের মিডিয়া ঝাঁপিয়ে পড়ে, সরকার চাপে পড়ে, কিন্তু যখন কৃষকদের সামান্য দামে ফসল বিক্রি করে দিতে হয়, তখন কাউকে এগিয়ে আসতে দেখা যায় না।“

পেঁয়াজের দাম নিয়ে সরকার অবশ্য গত সপ্তাহ থেকেই ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। তারা জাতীয় কৃষি সমবায় ন্যাফেডের মাধ্যমে পেঁয়াজ কিনতে শুরু করেছে, যার ফলে পেঁয়াজের দাম কিছুটা হলেও বেড়েছে। কিন্তু তা চাষীদের ক্ষতি এখনও পূরণ করার মত অবস্থায় আসে নি।

Your Opinion

We hate spam as much as you do