Tranding

04:04 PM - 22 Mar 2026

Home / Article / ৫০ বছর পরিচিত একজন কমরেডকে আমি কীভাবে বিদায় জানাব ?  

৫০ বছর পরিচিত একজন কমরেডকে আমি কীভাবে বিদায় জানাব ?  

আমাদের ছাত্রজীবন যখন শেষ হয়ে আসছিল, তখন স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে বেরিয়ে আসা প্রবীণ প্রজন্মের পার্টি নেতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে পার্টিকে তার ভবিষ্যত নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে। প্রকাশ কারাট এবং সীতারাম ইয়েচুরি ১৯৮৪ সালে অষ্টম পার্টি কংগ্রেসে কেন্দ্রীয় কমিটিতে এবং পরে দলের পলিটব্যুরোতে উন্নীত হন। এই পদক্ষেপ স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে উঠে আসা নেতাদের এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র স্থাপন করেছিল।

৫০ বছর পরিচিত একজন কমরেডকে আমি কীভাবে বিদায় জানাব ?  

৫০ বছর পরিচিত একজন কমরেডকে আমি কীভাবে বিদায় জানাব ?  

 

প্রবীর পুরকায়স্থ , ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪

Newsclik এ প্রকাশিত ( অনুবাদ - চিরন্তন গাঙ্গুলি)

 

সীতারাম ইয়েচুরি তাঁর জীবন শোষণমুক্ত পৃথিবীর জন্য কাজ করে কাটিয়েছেন। এটি সেই উদার উত্তরাধিকার যা তিনি আমাদের সকলের জন্য রেখে গেছেন যারা অব্যাহত সংগ্রাম এবং সংহতির দৃষ্টিভঙ্গি ভাগ করে নেয়।

কমরেড সীতারাম ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার সময় এবং পরে জেএনইউয়ের একজন ছাত্রকর্মী এবং নেতা ছিলেন। আমিও তখন জেএনইউ-এর ছাত্র ছিলাম। জেএনইউ-এর আচার্যের পদ থেকে ইস্তফা দিতে বলা জেএনইউ পড়ুয়াদের লেখা চিঠি পড়ে শোনাচ্ছেন জেএনইউ-এর পড়ুয়ারা, এটিতে সীতারামের কথা আমাদের এখনও মনে আছে: সামান্য এলোমেলো, কোঁকড়ানো চুল এবং একটি হাসিমুখ । তাঁর বৈশিষ্ট্য ছিল , এই হাসি এবং সবার প্রতি তাঁর বন্ধুত্ব, এমনকি যাদের সঙ্গেও তাঁর তীব্র রাজনৈতিক মতপার্থক্য ছিল। প্রথমে একজন ছাত্রনেতা হিসেবে, তারপর দলের নেতা হিসেবে এবং দেশের বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তির মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি ও রাজনৈতিক জোট গড়ে তুলতে সক্ষম হন সীতারাম। এমনকি যাদের সঙ্গে তিনি দ্বিমত পোষণ করতেন তাদের কাছ থেকেও তিনি শ্রদ্ধা অর্জন করতেন। তার চলে যাওয়া বড় ধাক্কা; এবং আরও বেশি কারণ এটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন আমাদের বৃহত্তর জোটের প্রয়োজন যা আমরা স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জাতির গঠন পরিবর্তনের চলমান প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করবে।

হ্যাঁ, আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে যে জাতি পেয়েছিলাম তা গভীরভাবে ত্রুটিমুক্ত  ছিল না। এটি আমাদের সামন্ততান্ত্রিক অতীত থেকে বেরিয়ে এসেছিল, যা ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ তার সমস্ত বৈষম্য দিয়ে সংরক্ষণ করেছিল, তার সাম্রাজ্যবাদী শোষণের  জন্য বিপুল উদ্বৃত্তের সৃষ্টি ও তার দখলকে নিশ্চিত করেছিল। ঔপনিবেশিক ও সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য জাতি হিসেবে আমরা আমাদের পথ তৈরি করলেও আমাদের লক্ষ্য ছিল একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও সাম্যবাদী ব্যবস্থা। এমন একটি শৃঙ্খলা যেখানে আমরা ঔপনিবেশিক শোষণ থেকে মুক্ত একটি অর্থনীতি গড়ে তুলব এবং যেখানে সকল নাগরিক সমান হবে। এটি ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি যা আমরা সকলেই ভাগ করে নিয়েছি।

আমাদের ছাত্রজীবন – সীতারাম এবং আমার – কেবল আমাদের লেখাপড়ায় গুরুত্ব দিয়ে যে ধরণের হওয়া  উচিত ছিল তা হয়নি  বরং এটি কৃষক ও শ্রমিকদের সাথে  একাত্ব বোধ এবং সংহতি প্রকাশ করতে শেখার সময়ও ছিল। আমরা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভিয়েতনামের সংগ্রামের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছি, আমরা চিলির রক্তাক্ত অভ্যুত্থান সম্পর্কে আমাদের মতামত প্রকাশ করেছি যা আলেন্দেকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল এবং নৃশংস পিনোচেট শাসনকে নিয়ে এসেছিল। পড়ুয়ারা, এবং অবশ্যই জেএনইউ-এর পড়ুয়ারা দেশের রেল ধর্মঘটের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন। দিল্লির টেক্সটাইল শ্রমিক; পিনোশেট অভ্যুত্থানের পরপরই কিসিঞ্জারের সফরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ; এবং, অবশ্যই, ভিয়েতনামী জনগণের সংগ্রামের সাথে সংহতি। জেএনইউএসইউ সভাপতি হিসাবে সীতারামের তিনটি মেয়াদ এর প্রথমটা বছরের শেষের দিকে এসেছিল , যখন অবশেষে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা হয়েছিল এবং পরের বছর দুটি নির্বাচনে সে লড়াই করেছিল এবং জিতেছিল।

আমাদের ছাত্রজীবন যখন শেষ হয়ে আসছিল, তখন স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে বেরিয়ে আসা প্রবীণ প্রজন্মের পার্টি নেতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে পার্টিকে তার ভবিষ্যত নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে। প্রকাশ কারাট এবং সীতারাম ইয়েচুরি ১৯৮৪ সালে অষ্টম পার্টি কংগ্রেসে কেন্দ্রীয় কমিটিতে এবং পরে দলের পলিটব্যুরোতে উন্নীত হন। এই পদক্ষেপ স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে উঠে আসা নেতাদের এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র স্থাপন করেছিল।

কমরেড সীতারাম—আরও স্পষ্ট করে বললে, আমাদের প্রজন্ম—জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় স্তরে স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতাদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল। জাতীয় স্তরে, কংগ্রেস, যার দৃঢ় ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্বাসযোগ্যতা ছিল এবং একটি স্বাধীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, "উদারীকরণ" স্লোগান তা ঢেকে দিয়েছিল। ঔপনিবেশিকতার ফেলে আসা জনগণের নাকাল দারিদ্র্য মোকাবেলার প্রয়োজনীয়তা থেকে সরে এসেছে। আমরা এখন যে স্লোগান শুনতে পাচ্ছি – ধনীরাই দরিদ্রদের টেনে তুলবে, এর মানে  বোঝায় যে রাষ্ট্রের কাজ হল ধনীদের সাহায্য করা – কংগ্রেসের অনেকে পুঁজিপতিদের “Liberate the animal spirit" এর  প্রয়োজনীয়তার পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন। অর্থনীতিতে তাঁর দৃঢ় ভিত্তি নিয়ে সীতারাম ভারতীয় "সংস্কারগুলির" আসল স্বরূপ যা পদ্ধতিগতভাবে সরকারী খাতকে বিক্রি করছিল এবং অর্থনীতির "কমান্ডিং উচ্চতা" বড় পুঁজির হাতে তুলে দিচ্ছিল ,তা উন্মোচন করার কাজটি হাতে নিয়েছিল । ভারতের রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে তাঁর বিভিন্ন লেখালেখি এবং নয়া-উদারবাদী ব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁর তীক্ষ্ণ সমালোচনা পার্টির কর্মীদের তাদের প্রচারের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান সরবরাহ করেছিল।

আন্তর্জাতিক স্তরে, সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির দুর্বল হয়ে পড়ার অর্থ হ'ল এই  ক্রমবর্ধমান বিশ্বাস যে মার্কিন সাম্রাজ্য - নতুন রোম – এটাই একমাত্র বিকল্প , সেই সময় ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা বলেছিলেন End of the history ! ভারতীয় রাজনৈতিক শ্রেণী বিশ্বাস করেছিল যে এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র উপায় হ'ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জোট বাঁধা, তৃতীয় বিশ্বের সাথে জোট নিরপেক্ষতা ও সংহতির প্রতি হালকা  সম্পর্ক   অব্যাহত রাখা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের অধীনে বৈশ্বিক পুঁজির সাথে জোটবদ্ধ হয়ে অনেক বেশি আগ্রাসী, পুঁজিবাদী ভারতের দিকে এই এগিয়ে যাওয়া দক্ষিণপন্থীদের পথ উন্মুক্ত করেছিল, বিজেপির, মুল সংগঠন জনসংঘ এইভাবেই পশ্চিমের সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার পক্ষে যুক্তি দিয়েছিল। বিজেপি ভেবেছিল দেশের অর্থনীতির পরিকল্পনা ভয়ঙ্কর সমাজতন্ত্র। তাই মোদী সরকারের প্রথম কাজ ছিল যোজনা কমিশনকে তুলে দেওয়া। এটি যুক্তি দিয়েছিল যে অর্থনীতি সম্পূর্ণরূপে পুঁজিপতি শ্রেণির হাতে তুলে দেওয়া উচিত, যারা সবচেয়ে ভাল জানে। অন্য কথায়, আমাদের আজ আমরা যে উন্মুক্ত ধান্দার পুঁজি দেখি তার দিকে যাওয়ার কথাই বলা হয়েছিল ।

কিন্তু আপনি যদি জনগণের কাছে সুবিধা পৌঁছে দিতে না পারেন তবে আপনি কী করতে পারেন? একটি প্রাচীন গৌরবময় অতীতের কথা যা আক্রমণকারীরা ধ্বংস করেছিল তা বলে তাদের ডাইভার্ট করুন । এখন নিজেদের অধিকার দাবি না করে মানুষের উচিত অতীতের কথিত গৌরব নিয়ে গর্ব করা। নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করার পরিবর্তে তাদের উচিত 'শত্রু'র কলঙ্কে জর্জরিত সহনাগরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। অন্তর্ভুক্তিমূলক ভারতের পরিবর্তে, উদ্দেশ্য হ'ল সংবিধানে কল্পিত ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের ভিত্তিতে নির্মিত জাতিকে ভেঙে ফেলা। এটাই বিজেপির কৌশল ।

আবার কমরেড সীতারাম ছিলেন সেই আঠা যা বিজেপির বিভাজনমূলক প্রকল্পের বিরোধিতাকারী বিভিন্ন ভিন্ন শক্তিকে একত্রিত করেছিল। রাজনৈতিক, সামাজিক এমনকি ভাষাগত সীমারেখার ঊর্ধ্বে উঠে বিভিন্ন অংশের সাথে কথা বলার দক্ষতা তাকে ধর্মনিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতি রক্ষার বৃহত্তর সংগ্রামে অপরিহার্য করে তুলেছিল যা জাতীয় আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম, দেশ এবং তার ভবিষ্যতকে সবকিছুর আগে রাখার তাঁর নিঃস্বার্থ কাজ, আমরা যে ঐক্যের উন্মোচন দেখেছি এবং সাম্প্রতিক নির্বাচন ফলাফলে বিজেপিতে যে ক্ষয় হয়েছে , তা সম্ভব হত না

হ্যাঁ, তার কাজ শেষ হয়নি। কিন্তু তিনি আমাদের কোন দিকে যেতে হবে সে সম্পর্কে একটি পরিষ্কার দৃষ্টিভঙ্গি রেখে গেছেন। এই কাজ করতে গিয়ে কমরেড সীতারাম নিজের জীবন 'বাঁচানোর' বদলে 'ব্যয়' করে দেন। নিপীড়নমুক্ত পৃথিবীর জন্য কাজ করে তিনি তাঁর জীবন কাটিয়েছেন; এবং এটি সেই উদার উত্তরাধিকার যা তিনি আমরা যারা অব্যাহত সংগ্রাম এবং সংহতির তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি অন্তরে গ্রহণ করি  , সেই আমাদের সকলের জন্য রেখে গেছেন । লাতিন আমেরিকার বিখ্যাত লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট গালায়েনোর উদ্ধৃতি, Utopia is on the horizon. I move two steps closer; it moves two steps further away …. As much as I may walk, I’ll never reach it. So whats the point of utopia? The point is, to keep walking. “ 'ইউটোপিয়া এখন দিগন্তে। আমি দু'পা এগিয়ে যাই; দু'পা এগোচ্ছে আরও দু'পা এগিয়ে... আমি যতই হাঁটতে পারি না কেন, আমি কখনই তার কাছে পৌঁছাতে পারব না। তাহলে ইউটোপিয়া দিয়ে লাভ কী? মোদ্দা কথা হলো, হাঁটতে থাকা।

কমরেড সীতারামের সংগ্রাম থেকে এটাই আমাদের শিক্ষা। সীতারামের সাথে আমরা সকলেই এই ইউটোপিয়ান উত্তরাধিকার ভাগ করে নিই।

Your Opinion

We hate spam as much as you do