Tranding

12:11 PM - 22 Mar 2026

Home / Article / ঐতিহাসিক খাদ্য আন্দোলন :  ৩১আগষ্ট ১৯৫৯এর আগে ও পরে।

ঐতিহাসিক খাদ্য আন্দোলন :  ৩১আগষ্ট ১৯৫৯এর আগে ও পরে।

৩১ শে আগস্ট খাদ্যমন্ত্রীর অপসারন ও খাদ্যের দাবিতে এবং পুলিশি দমন-পীড়নের প্রতিবাদে কলকাতায় শহীত মিনার ময়দানে লক্ষ লক্ষ মানুষের জমায়েত হলো। মহাকরণ অভিমুখে চলমান শান্তিপূর্ণ মিছিলের উপর পুলিশ লাঠি চালায়। সহস্রাধিক মানুষ পুলিশের আক্রমণে আহত হলেন। সাধারণভাবে বলা হয় ৮০ জন, কিন্তু আরো কতজন মানুষ ঐ  আক্রমনে মারা যান তার হিসেব মেলেনি বলে জানা যায় । শেষ রাতে প্রচুর মৃতদেহ পাচার করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। 

ঐতিহাসিক খাদ্য আন্দোলন :  ৩১আগষ্ট ১৯৫৯এর আগে ও পরে।

ঐতিহাসিক খাদ্য আন্দোলন :  ৩১আগষ্ট ১৯৫৯এর আগে ও পরে।

August 31, 2022


*১৯৪৭ সালে দেশভাগের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হবার পর কেন্দ্র ও রাজ্যে যাদের হাতে শাসনভার আসে তারা হলো দেশী- বিদেশী পুঁজিপতি ও গ্রামীণ জমিদার – জোরদারদের প্রতিনিধি । তাদের তোষন করার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসাবে দেশে খাদ্য সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে।


*১৯৫৯ সাল ছিল একটা ঘটনাবহুল বছর, এই বছরে খাদ্য সংকট চরমে ওঠে। খোলা বাজার থেকে চাল, গম প্রভৃতির মতো অনেকগুলি অত্যাবশ্যক দ্রব্য উধাও হয়ে যায় এবং বহু  গ্রামে দুর্ভিক্ষের অবস্থা সৃষ্টি হয়।


শ্রমিক কৃষক ও অন্যান্য শ্রমজীবী জনসাধারণের মধ্যে প্রবল বিক্ষোভ দেখা দেয়। তাঁরা খাদ্যের দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন এবং লাগাতার গণ আন্দোলন ও গন-বিক্ষোভ প্রদর্শনের রাস্তা গ্রহন করেন। জনসাধারণের দাবিগুলি সহানুভুতির সঙ্গে বিচার –বিবেচনা করার পরিবর্তে তখনকার পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস সরকার বিক্ষোভকারীদের উপর নির্মম দমন-পীড়ণের রাস্তা গ্রহন করে বলে অভিযোগ ।
জনসাধারণ চেয়েছিলেন সস্তা দরে তাদের প্রয়োজনের খাদ্য-পরিবর্তে পান তাঁরা লাঠি,কাঁদানে গ্যাস এবং বুলেট।

 

*১৯৫৯ সালে খাদ্য আন্দোলন পরিচালনা করে বামপন্থী দলগুলি ও গণ সংগঠন সমুহ। ‘মূল্যবৃদ্ধি ও দুর্ভিক্ষ পতিরোধ’ গঠন করে এই আন্দোলন গড়ে তোলা হয়।


*১৯৫৯ সালের ৩ রা ফেব্রুয়ারি বিধানসভায় দাবি উত্থাপনের মাধ্যমে শুরু  হয় প্রথম পর্যায়।


*১৫ ই জুন কংগ্রেস সরকারের খাদ্য নীতির প্রতিবাদে কলকাতায় প্রথম কেন্দ্রীয় সমাবেশ সংগঠিত হয়। সঙ্গে সঙ্গে জেলায় জেলায় চলতে থাকে বিক্ষোভ সমাবেশ।

*২৫ জুন পালিত হয় রাজ্যব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট ও হরতাল।


*১৩ ই জুলাই শুরু  হলো জেল ভরো আন্দোলন। এক মাসের মধ্যে ১৬৩৪ জন গ্রেপ্তার হলেন।  ৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত হলো খাদ্য কনভেনশন।


*এতো ঘটনার পরেও রাজ‍্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ গ্রহন হল না।


*এই পরিস্থিতিতে ১৭ ই আগস্ট দল ও গণ সংগঠন সমুহের ঐ মঞ্চ -‘মল্যবৃদ্ধি ও দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ কমিটি’ ঘোষনা করল- ২৩ আগস্ট থেকে সারা পশ্চিমবঙ্গে খাদ্যের দাবিতে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম শুরু  করা হবে।


*এই ঘোষনায় তৎকালীন  কংগ্রেসী সরকার চিন্তিত হয়ে উঠল এবং এই আন্দোলনকে দমন করার জন্য এলাকায় এলাকায় দমনের পরিকল্পনা গ্রহণ করল। এই সময় স্বাভাবিকভাবেই শ্রেনীর স্বার্থ দেখাই রাজ‍্য সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। 

*২৩ আগস্ট থেকে শুরু  হলো খাদ্য আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়।

২৬ আগস্ট মাঝরাতে বামপন্থী নেতা ও কর্মীদের ধড়পাকড় ও ঘরে ঘরে খানাতল্লাসী শুরু  হলো। দুই সপ্তাহে মোট ২৬৩৪ জনকে সরকার গ্রেপ্তার করা হল ।
কিন্তু  বামপন্থী নেতা ও কর্মীদের উপর দমন- পীড়ণের প্রতিবাদে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সোচ্চার হয়ে উঠলেন। কলকারখানা হাটে বাজারে,মহল্লায়,গঞ্জে সর্বত্র মানুষ স্বতঃস্ফুর্তভাবে প্রতিবাদে শামিল হলেন।
*রাজ‍্য সরকারের তীব্র প্রশাসনিক চাপ সত্বেও ২৩ শে আগস্ট থেকে শুরু  হওয়া দ্বিতীয় পর্যায়ের খাদ্য আন্দোলন দমন করা সম্ভব হলো না। সাধারন মানুষও গ্রেপ্তার হতে শুরু  করলেন। ২৭ আগস্ট পযর্ন্ত প্রায় ৭০০০ জন নর-নারী গ্রেপ্তার হলেন।

৩১ শে আগস্ট খাদ্যমন্ত্রীর অপসারন ও খাদ্যের দাবিতে এবং পুলিশি দমন-পীড়নের প্রতিবাদে কলকাতায় শহীত মিনার ময়দানে লক্ষ লক্ষ মানুষের জমায়েত হলো। মহাকরণ অভিমুখে চলমান শান্তিপূর্ণ মিছিলের উপর পুলিশ লাঠি চালায়। সহস্রাধিক মানুষ পুলিশের আক্রমণে আহত হলেন। সাধারণভাবে বলা হয় ৮০ জন, কিন্তু আরো কতজন মানুষ ঐ  আক্রমনে মারা যান তার হিসেব মেলেনি বলে জানা যায় । শেষ রাতে প্রচুর মৃতদেহ পাচার করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। 

*ঐদিন গঙ্গারামপুর, বর্ধমান, বহরমপুর, ও মেদিনীপুরেও পুলিশ লাঠিচার্জ করে।

শুরু  হলো খাদ্য আন্দোলনের তৃতীয় পর্যায়। দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ল কংগ্রেসী সরকারের এই দমনের কাহিনী।
১লা সেপ্টেম্বর পুলিশের লাঠি চালনা ও হিংস্র তান্ডবের বিরুদ্ধে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হলো। এই ধর্মঘটটি ছাত্রদের উপরেও পুলিশ আক্রমণ করে। লাঠিচার্জ করে, গুলি চালায়। কলকাতার বিভিন্ন স্থানে পুলিশের বেপরোয়া গুলি চালনার ফলে ৮ জন নিহত ও ৭৭ জন আহত হলেন।
এই সমস্ত হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে ৩রা সেপ্টেম্বর পালিত হলো সাধারণ ধর্মঘট ও হরতাল। সেদিনও রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে গুলি চললো। মারা গেলেন ১২ জন এবং আহত হলেন ১৭২ জন গ্রেপ্তার করা হলো নির্বিচারে।
তৎকালীন কংগ্রেস সরকার কালোবাজারী ও মুনাফাখোরদের স্বার্থে, এভাবে শত শত নিরপরাধ শান্তিপ্রিয় নর-নরীর উপর অকথ্য অত্যাচার চালাতে থাকলো।
কিন্তু  এতো অত্যাচার সত্বেও মানুষের প্রতিবাদ স্তব্ধ করা গেল না। মানুষ খাদ্যের দাবিতে আরও উত্তাল হয়ে উঠলেন।
৮ সেপ্টেম্বর সারা রাজ্যে পালিত হলো ছাত্রদের ডাকে শহীদ দিবস।
*রক্তস্নাত কলকাতার বুকে
১০ সেপ্টেম্বর সংগঠিত হলো অবিস্মরণীয় মৌন মিছিল। হাতে হাতে প্ল্যাকার্ড-হত্যাকান্ডের প্রকাশ্য তদন্ত চাই, খাদ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ চাই।
১৮৫৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হলো।
১৯ শে সেপ্টেম্বর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় লনে শহীদ স্তম্ভ বানানো হলো।
২৪ সেপ্টেম্বর সত্যাগ্রহ পালন করলেন নানা সংগঠন।

*২৬ সেপ্টেম্বর কলকাতা সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারে খাদ্য আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে শহীদ স্তম্ভ নির্মাণের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হলো।
সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, ব্যাপ্তি ও সংঘর্ষের বিচারে ১৯৫৯ সালের খাদ্য আন্দোলনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য বিরাট।
বামপন্থী দল ও গণসংগঠনসমূহ ঠিক করলো, প্রতি বছর ৩১ শে আগস্ট খাদ্য আন্দোলনের শহীদ দিবস হিসাবে পালিত হবে।
সেই সময় বিধানসভায় যে আগুন ঝরানো প্রতিবাদ হয়েছিল তার সম্পর্কে আনন্দবাজারের সাংবাদিক গত দুবছর আগে লিখেছেন 

" বিধানসভায় জ্যোতি বসু, হেমন্ত বসু, গুলাম ইয়াজদানি, সুবোধ বন্দ্যোপাধ্যায়, যতীন চক্রবর্তী একে একে বিবৃতি পড়েছেন ৩১ অগস্টের ঘটনার। সংবাদপত্রগুলো তা রিপোর্ট করেছে, যাতে সরকারি প্রচারের পাশাপাশি আর একটা বয়ান লেখা থাকে। অশালীন গালি দিয়েছেন দু’পক্ষই, জ্যোতিবাবু জুতো তুলেও দেখিয়েছেন। তবু ভাষণের সারবত্তা ছিল। খাদ্যনীতির ব্যর্থতা চিরে চিরে দেখিয়েছেন বিরোধীরা। ভাগ্যিস, এখন যেমন সংসদ-বিধানসভার বিতর্ক কলতলার ঝগড়ায় পরিণত হয়েছে, তখনও তেমন হয়নি। বিধানসভার ওই সব তথ্য-ঠাসা বিবৃতি আর বক্তৃতাই আজ আমাদের উত্তরাধিকার "

পরে ঠিক হয়, শুধু  খাদ্য আন্দোলনের শহীদ নন, সকল শহীদের স্মরনেই ৩১ শে আগস্ট শহীদ দিবস হিসাবে পালিত হবে। এবং সে ভাবেই হয়ে আসছে।

প্রতিবছরই এই শহীদ দিবসটি খাদ্যের দাবির লড়াইয়ের ভিন্ন ভিন্ন বিষয় নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়। এবারও তাই হয়েছে। 
বামপন্থীদের বক্তব্য শুধু  শহীদদের স্মরণ করা নয়, কঠিন-কঠোর লড়াইয়ের জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করার শপথ নেবার দিন ৩১শে আগস্ট।

Your Opinion

We hate spam as much as you do