Tranding

03:13 AM - 07 May 2026

Home / Entertainment / ইচ্ছে -- অনুগল্প

ইচ্ছে -- অনুগল্প

ওর স্বপ্ন মূলত দুটো। এক, বৈজ্ঞানিক হওয়া। বৈজ্ঞানিক হওয়া তো দুরস্ত। ক্লাসের পরীক্ষায় পাশ করাটাই ওর কাছে একটা বিভীষিকা। সারা বছর ভিডিও গেমস, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, টিকটকে বুঁদ হয়ে থেকে পরীক্ষার এক সপ্তাহ আগে পড়া শুরু করলে যা হয় আর কী। দু’নম্বর স্বপ্ন হচ্ছে বড় ফুটবলার হওয়া। কিন্তু স্কুলের সাব জুনিয়র ফুটবল স্কোয়াডেই সুযোগ পায় না ও। ফুটবলটা কিন্তু খারাপ খেলে না অসীম।

ইচ্ছে  -- অনুগল্প

ইচ্ছে 


- উত্থান দাশ  ২০.০৮.২৩


অসীমের মূলত দুটো ইচ্ছে রয়েছে। আরও বলা ভালো, কিছু করে দেখানোর স্বপ্ন রয়েছে। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়িত করতে গেলে যা যা প্রয়োজন, অর্থাৎ অধ্যাবসায়, পরিশ্রম, ইত্যাদির লেশমাত্র ওর মধ্যে নেই। ফলে যাবতীয় ইচ্ছা তথা স্বপ্ন অধরা মাধুরী হিসেবেই রয়ে গিয়েছে। এই অবধি পড়ে তোমাদের মনে দুটো প্রশ্ন জাগছে। এক হচ্ছে অসীমটা আবার কে? আর দুই হল ওর ইচ্ছে গুলিই বা কী? অসীম তোমাদের মতোই একজন স্কুল পড়ুয়া। সেন্ট জেভিইয়ার্সের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র যে কিনা প্রত্যেক বছরই টেনেটুনে কোনো ক্রমে পাশ করে যায়। 

 

ওর স্বপ্ন মূলত দুটো। এক, বৈজ্ঞানিক হওয়া। বৈজ্ঞানিক হওয়া তো দুরস্ত। ক্লাসের পরীক্ষায় পাশ করাটাই ওর কাছে একটা বিভীষিকা। সারা বছর ভিডিও গেমস, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, টিকটকে বুঁদ হয়ে থেকে পরীক্ষার এক সপ্তাহ আগে পড়া শুরু করলে যা হয় আর কী। দু’নম্বর স্বপ্ন হচ্ছে বড় ফুটবলার হওয়া। কিন্তু স্কুলের সাব জুনিয়র ফুটবল স্কোয়াডেই সুযোগ পায় না ও। ফুটবলটা কিন্তু খারাপ খেলে না অসীম। ওর প্ৰিয় ফুটবলার লিভারপুলের প্রাক্তনী তথা ইংলিশ ফুটবলের কিংবদন্তী স্টিভেন জেরার্ড। জেরার্ডের মতো অসীমও মাঝমাঠে খেলে। ওর প্লে – মেকিং, ফার্স্ট টাচ, ড্রিবলিং স্কিলস খারাপ নয়। 


কিন্তু সমস্যা একটাই। যে কারণে প্রত্যেকবারই ট্রায়াল থেকে বাদ পড়ে যায় ও। দেখা হলেই, স্কুল টিমের ফুটবল কোচ রবীন স্যার, ওর দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গের হাসি ছুঁড়ে দেন। তখন লজ্জায় ওর কান দুটো লাল হয়ে ওঠে। কারণটা আর কিছুই নয়। ওর স্থূলকায় চেহারা। সামান্য দৌড়লেই হাঁপিয়ে ওঠে ও। যা ফুটবলার হিসেবে বড্ড বেমানান। ফুটবল আর ফিটনেস যে সমার্থক সেটা অসীমের থেকে ভালো কেউ জানে না। ওর থলথলে ভুঁড়িই যে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে সেটা ও ভালোই বুঝতে পারে। 

কম্পিউটারে ফিফা খেলতে খেলতে কখন যে স্তুপাকার পিৎজা, বার্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাইস প্লেট থেকে ওর পেটে চলে যায়, তা ও নিজেও জানতে পারে না। কিন্তু ভালো ফুটবলার হতে গেলে ফাস্ট ফুড নৈব নৈব চ। সেটা অসীমও খুব ভালো করে জানে। কিন্তু লোভ সম্বরণ করা ওর পক্ষে কার্যত অসম্ভব। ফলে, ইচ্ছে দুটো ইচ্ছে হয়েই রয়ে গিয়েছে। 

 

আর দু’সপ্তাহ পর ইউনিট টেস্ট চালু হতে চলেছে। আর কিছুক্ষণ পরেই ফিজিক্স পড়াতে আসবেন বিনয় স্যার। ফোর্স থেকে যে নিউমেরিকালস গুলো হোমওয়ার্ক দিয়েছিলেন আগের ক্লাসে, সেগুলোর একটাও করা হয়নি। মাথার চুল ছিঁড়তে ছিঁড়তে তড়িঘড়ি অঙ্ক গুলো করার চেষ্টা করছে অসীম। কিন্তু ফর্মুলা গুলো ভালো ভাবে মুখস্থ না থাকায় কালঘাম ছুটে যাচ্ছে। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়বার শব্দ শুনে চমকে উঠল ও। স্যারের আসতে তো আধ ঘন্টা মতো বাকি আছে। বাবা – মা যে যার অফিসে। রঘুদা এক সপ্তাহের জন্যে ছুটি নিয়ে দেশের বাড়িতে গিয়েছে। তাহলে এই অসময়ে কে? 
“কে-এ -এ”, একটা জোরে হাঁক দিল অসীম। 
“আমরা”, কারা যেন সমস্বরে জবাব দিল। 
দরজা খুলতেই একটা ঠান্ডা শিহরণ বয়ে গেল ওর শিরদাঁড়া দিয়ে। দরজার ওই প্রান্তে দুজন অসীম ওর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। তোমরাও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলে তো? আচ্ছা বুঝিয়ে বলছি। হুবহু অসিমের মতো দেখতে দুজন ছেলে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। চেহারায় খানিকটা ফারাক চোখে পড়ছে। যে ছেলেটা ফুটবল খেলার পোশাক পড়ে রয়েছে, তার পেটানো চেহারা। চোখে মুখে আত্মবিশ্বাস ঝরে পড়ছে। অপর ছেলেটির গায়ে সাদা অ্যাপ্রন, যেরকমটা 


বৈজ্ঞানিকরা গবেষণাগারে পড়ে থাকেন। 
“ভিতরে আসতে বলবে না?”, মৃদু হেসে বলল ফুটবলারটি। 
অসীমের হতভম্ব ভাবটা তখনও কাটেনি। কোনও রকমে বলে উঠল, “ত – ত – তোমরা ক-ক-কে বল তো?”
 এবার গম্ভীর গলায় বৈজ্ঞানিক বলে উঠল, ‘আমরা তোমার ইচ্ছে থেকে জন্ম নিয়েছি। তোমার ইচ্ছে আছে কিন্তু ইচ্ছেশক্তি নেই তাই আমরা তোমার সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছি। যতদিন না তোমার ইচ্ছেশক্তি আমাদেরকে পূর্ণ রূপ দেবে ততদিন এইভাবেই রয়ে যাব আমরা।”
“আমাকে কী করতে হবে?”, সম্মোহিতের মতো বলে উঠল অসীম। 
“ইচ্ছা শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। ফুটবল মাঠে, জিমে নিজেকে নিংড়ে দিতে হবে। ওজন কমিয়ে শরীরটাকে ঝরঝরে বানিয়ে ফেলতে হবে”, বলল অসীমের ফুটবলার সত্ত্বা।
বৈজ্ঞানিক অসীম গম্ভীর ভাবে বলল “আর প্রত্যেক দিন ৮ ঘন্টা করে পড়াশোনা করতে হবে। একটা রুটিন করে নেবে। বিজ্ঞান আর অংকে বিশেষ জোর দেবে...”


“ওরে ওঠ ওঠ। ডাইনিং টেবিলে চল। তোর ফিজিক্স স্যারের জ্বর হয়েছে বলে আসতে পারেননি আর তুইও ঘুমিয়ে একেবারে কাদা হয়ে গিয়েছিস”, মায়ের ঠেলায় ঘুম ভেঙে গেল অসীমের। 

 

এই গল্পের লেজুড় হিসেবে দুটো ঘটনা জুড়ে দিলাম। এবারের ষান্মাসিক পরীক্ষায় ৮৯ শতাংশ নম্বর পেয়ে তৃতীয় হয়েছে অসীম। অন্যদিকে আসন্ন সুব্রত কাপের স্কোয়াডে প্রথম এগারোয় সুযোগ করে নিয়েছে। তার চেয়েও বড় কথা স্কুল টিমের নতুন অধিনায়কের নাম ‘অসীম দত্ত’। তাহলে বন্ধুরা, পরিশ্রম আর অধ্যাবসায়, এই দুই অস্ত্রে ভর করে, নিজেদের ইচ্ছেশক্তিকে কাজে লাগিয়ে স্বপ্ন পূরণ করা যায়। তোমরা করবে তো?

Your Opinion

We hate spam as much as you do