Tranding

04:05 PM - 22 Mar 2026

Home / Entertainment / কৃষ্ণ ভিলা (ছোট ও রহস্য গল্প)

কৃষ্ণ ভিলা (ছোট ও রহস্য গল্প)

মিত্রা তাতারকে আদর করতে করতে বলে নাম তার হরিনাথ নিরামিষ মক্কেল চাই তার ভরপেট মাংস ও কতবেল। বলেই হো হো করে হেসে ওঠে।বলে "একটু স্ল্যাং হয়ে গেল না?" তাপস এই সব কতবেল,হরিনাথ এর কিছুই বুঝতে না পেরে বোকার মত তাকিয়ে থাকে।বলে "অনেক হয়েছে এবার খেতে যাও।"

কৃষ্ণ ভিলা (ছোট ও রহস্য গল্প)

কৃষ্ণ ভিলা
(ছোট ও রহস্য গল্প) 


শঙ্কর ভট্টাচার্য 

 

" এতবড় একটা অস্বাভাবিক ঘটনা এখানে ঘটে গেল অথচ যারা এই পদ্মনদীর মাঝখানে এই "কৃষ্ণ ভিলাতে দোল পূর্ণিমাতে উৎসব উপলক্ষে এসেছেন তাদের কারও কোন ঔৎসুক্য লক্ষ্য করলাম না একথা জানতে যে অপরাধী  কে ?অথচ একটা তিন লাখ টাকা দামের মন্দিরের গয়না চুরি হয়ে গেল।"
একটানা এতগুলো কথা বলে একটু নিশ্বাস নেয় অগ্নিমিত্রা ।সবাই  সবার মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে।
এতবড় মন্দিরের শ্বেতপাথরের বারান্দায় বসে জনা কুড়ি কর্মকর্তা ,কর্মচারী সহ প্রায় শ'খানেক লোক।এমনকি মথুরার বিখ্যাত যোগী গম্ভীরানন্দজীও সেখানে উপস্থিত ।

 

এতবড় চুরির  তদন্তের দায়িত্ব যখন অগ্নিমিত্রা নিজের হাতে তুলে নিয়েছিল তখন প্রকাশ্যেই সে ফরমান জারি করেছিল 'যতক্ষন না তদন্ত শেষ হয় ততক্ষণ কেউ এই মন্দির ছেড়ে যেতে পারবে না। তিনি যেই ই হোন না কেন। অগ্নিমিত্রা র অনুরোধে স্হানীয় থানার অফিসার ইন চার্জ অরূপ রতন বসাক দুজন সশস্ত্র পুলিশ দাঁড় করিয়ে দিয়েছে মন্দিরের মূল প্রবেশদ্বারে চব্বিশ ঘন্টার জন্য ।
অরূপবাবু আগে থেকেই চেনে অগ্নিমিত্রা কে।ডায়মন্ডহারবারের ছাত্রীআবাসের কর্মীর ধর্ষণ এবং খুনের যে ঘটনা অগ্নিমিত্রা র সাহায্য না পেলে আসামী খূঁজে বের করাই খুব কঠিন হত।
         


দোলপূর্ণিমা উপলক্ষে তিনদিনের বাসূকীমেলার আয়োজন হয় এই মন্দিরে।মন্দিরের অতি নিকট যে ভক্তরা আছেন তাঁদের আমন্ত্রণ জানানো হয়।অগ্নিমিত্রার স্বামী তাপস মানে তাপস সিনহার একটা ভাল অংকের ডোনেশন দেওয়া আছে এই মন্দিরের নির্মাণকার্যে।সেই সূত্রেই মিত্রা মানে অগ্নিমিত্রার এখানে আসা।যদিও মিত্রা যতনা ধর্ম করতে এখানে এসেছে তার থেকে বেশী ওদের পাঁচ বছরের ছেলে তাতারকে নিয়ে কদিন এই মনোমুগ্ধকর জায়গায় সময় কাটাতে এসেছে।

 

ওদের পরিকল্পনা ছিল তিনরাত্রি এখানে কাটিয়ে চতুর্থ দিন ভোরে কলকাতা রওনা দেবে।চতুর্থ দিন ভোরে যখন মন্দিরের প্রধান পুরোহিত দরজা খুলে বিগ্রহ স্নান করাতে যায় তখন প্রথম তারই চোখে পড়ে রাধার গলার দশভরির সীতাহার উধাও হয়ে গেছে।গোকুলবাবু মানে প্রধান পুরোহিতের তীব্র চীৎকারে ভোর পাঁচটাতেই সকলে জেগে যায় ।এমনকি মন্দির কমিটির কর্তাব্যক্তি যারা ,তারাও খবর পেয়ে ঐ ভোরেই ডায়মন্ডহারবারের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় কলকাতা থেকে।তারপর মথুরার এত বড় কর্তাব্যক্তির উপস্থিতিতে এতবড় ঘটনা ঘটে গেল এতে সকলেই বিব্রত বোধ করে।
        সকলের উপস্থিতিতে যখন বেলা একটা নাগাদ কতৃপক্ষের সভা বসে তখন মিত্রা স্বেচ্ছাতেই এর তদন্তভার নিজের হাতে তুলে নেয় ।
         সকাল থেকেই মিত্রা খুব তৎপর ।প্রথমেই যে কাজটা সে করে মন্দিরের প্রধান প্রবেশ দ্বার বন্ধ করে দেয় ।বাইরে থেকে কারও ঢোকার অনুমতি আছে কিন্তু বেরোবার নয়।স্হানীয় থানার বাবুরা আসার আগে বিগ্রহর দরজাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।ঘটা করে পূজো আরতি আজ বন্ধ, শুধুমাত্র প্রধান পুরোহিত একাই ভিতরে গিয়ে নমো নমো করে পূজো সেরে আসে।তখন ক্ষমা চেয়ে নিয়ে মন্দিরের এক কর্মচারী তাকেও তল্লাশি করে।

             

তাপস একটু রাগ করেই মিত্রা কে বলেছিল " মিত্রা এখানে এসেও কি তোমাকে মাতব্বরি করতে হবে? দেখত আজকে বাড়ী ফেরা হলনা।"
মিত্রা মজা করে বলে "আজকে কি গো? কতদিন ফেরা হয়না দেখ।এর শেষটা আমাকে দেখতে হবে।"
       দুপুরে সর্বসম্মতিক্রমে মিত্রা কে তদন্তভার দেবার পর মিত্রা, তাপসকে বলে "তুমি তাতারকে খাইয়ে দাও, আমি একটু আসছি।"

 

 

ঘরে গিয়ে নিজের ব্যাগ খুলে নিজের ছোট যন্ত্রটা সঙ্গে নিয়ে  ও বেরিয়ে পড়ে।
এরপর তাতারকে খাইয়ে মিত্রার জন্য অপেক্ষা করে করে তাপস  তারপরনিজেও খেয়ে নেয় ।
দশ মিনিটের মধ্যে খাওয়া শেষ করে তাপস যখন সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছে তখন হঠাৎ চোখে পড়ে ,বিল্ডিংটার পিছনের দিকটায় ,যেদিকটায় একটু জঙ্গল আর তারপর বড় বড় বোল্ডার ফেলে নদীর পাড়টা বাঁধানো হয়েছে ঠিক দোতলার ভি আই পি রুমটার নীচে একটা ঝোপের মধ্যে দাঁড়িয়ে হাতে কিছু একটা নিয়ে মিত্রা খুব মনযোগ দিয়ে কিছু একটা দেখছে।তাপসের সাথে চোখাচোখি হতেই ও তাপসকে হাত নেড়ে চলে যেতে বলে।তাপস ঘরে ঢোকার মিনিট দশেকের মধ্যে মিত্রা ঘরে ফেরে।ঢুকেই বলে "হাতটা এতই নোংরা যে ডেটল দিয়ে না ধুলে এই হাত দিয়ে  খাওয়া যাবে না"।বলে বাথরুমে ঢোকে।ফ্রেশ হয়ে বেরোতেই তাপস প্রশ্ন করে "কি পেলে"? মিত্রা তাতারকে আদর করতে করতে বলে
             নাম তার হরিনাথ নিরামিষ মক্কেল
             চাই তার ভরপেট মাংস ও কতবেল।
বলেই হো হো করে হেসে ওঠে।বলে "একটু স্ল্যাং হয়ে গেল না?"
তাপস এই সব কতবেল,হরিনাথ এর কিছুই বুঝতে না পেরে বোকার মত তাকিয়ে থাকে।বলে "অনেক হয়েছে এবার খেতে যাও।"

 

দুপুরে ওরা তিনজন মিলে একটা গুছিয়ে ঘুম দিয়ে  নিল।সাড়ে পাঁচটা নাগাদ ঘুরতে যাবার জন্য যখন নীচে নামছে তখন দেখল নাটমন্দিরের বারান্দায় এখানকার সর্বোত্তম ব্যাক্তি মানে স্বামী গম্ভীরানন্দ একটা স্টীলের আরামকেদারায় বসে আছে।ওদের প্রোগ্রাম ছিল গার্ডেন যাবার ।মিত্রা চেঁচিয়ে বলে "তোমরা যাও আমি আসছি।"নীচে নেমে মিত্রা সোজা চলে এল যোগী গম্ভীরানন্দের কাছে।স্বামীজিকে প্রনাম করে তার সামনে বসতেই উনি প্রশ্ন করলেন চোখা হিন্দীতে "কাতিল কা কাহানী তো বহুত দুর আভি সুরাগ কুছ মিলা?"

 


একটু ঘাবড়ে গেলেও তাৎক্ষনিক জবাব মিত্রা র "মিলা নেহী কুছ আভিতক,লেকিন আশা হায় কি মিল যায়গা জলদি।"
এবার মিত্রার অবাক হবার পালা।শুদ্ধ  বাঙলায় স্বামী প্রশ্ন করলেন "আপনি তো বহুত খাটছেন অগ্নিমিত্রা দেবী কিন্তু নিজের শরীরের দিকে নজর রাখছেন?" 
একটু অবাক হলেও পরমুহূর্তে মিত্রা বলে "আপনি তো ভালই বাঙলা জানেন।"
পাল্টা উত্তর গম্ভীরানন্দের "শুধু বাঙলা নয়,আমি অনেক ভাষাই জানি।"
তাপসের কাছে শুনেছে এই যোগী গম্ভীরানন্দ খুব শিক্ষিত এবং নামী লোক।এনার মুখ থেকে কৃষ্ণলীলা এবং তার ব্যাখ্যা শোনার জন্য  মথুরায় হাজার হাজার লোক ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে।এখানে আসার দ্বিতীয় দিনে আরতির পর তার কিছু নমুনাও পেয়েছে মিত্রা ।এসব যখন ভাবছে মিত্রা তখনই যোগীর গম্ভীর গলা "আপকা শরীর পর ধ্যান দেনা।"বলেই হাঁটা দেয় যোগী।সবটা শুনে স্বগতোক্তি করে মিত্রা  "বাঃ বেশ ভাল লোক তো" এইটুকু বলেই গার্ডেনের দিকে রওনা দেয় ।ওখানে একটা বেন্চীতে বসে বাপ আর ছেলে নদীর রাতের শোভা নিরীক্ষন করছিল।ঠান্ডা টা এখনও একটু আছে।তাতারের ঠান্ডা লাগতে পারে এই ভয়ে ওরা বেশীক্ষন বসেনা উঠে পড়ে।
সিঁড়ি দিয়ে আগে উঠছিল তাপস আর তাতার আর পিছনে মিত্রা ।হঠাৎ ওর মনে হয় দুটো চোখ ওদের নিরীক্ষন করছে।হঠাৎ  পিছনে তাকাতেই  কিন্তু কিছুই চোখে পড়েনা শুধু দেখে সিঁড়ির প্রথম ধাপে বসে বাগানের মালি একটা পাথর দিয়ে তার হাঁসুয়া টাতে শান দিচ্ছে।
এতক্ষন বাইরে থেকে তাতার ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল ।বাবাকে বায়না করে কোলে নেবার।তাপস ওকে কোলে নেয় ।তাপসের কাছ থেকে ঘরের চাবিটা নিয়ে মিত্রা ঘর খুলেই চীৎকার করে ওঠে "বেরোবার সময় জানলাটা বন্ধ করনি?আজ রাতে আর মশার উপদ্রবে শোয়া যাবেনা"বলেই ঘরের আলোটা জ্বেলে একলাফে গিয়ে বাইরে বাগানের দিকের জানলাটা বন্ধ করে যখন ফিরছে তখনই তাতার চীৎকার করে ওঠে "মা দেখ এটা কি তোমার পায়ের সামনে।"মিত্রা দেখে একটা কাগজের মোড়কের মত কি পড়ে আছে।মিত্রা নীচু হয়ে তুলতে যাবে তখনই তাপস বলে "হাত দিয়ে তুলনা।কি না কি কে জানে"।তা সত্ত্বেও মিত্রা  তোলে।দেখে একটা ইঁটে জড়ানো মামুলি একটা কাগজ।তাতে কয়েকটা লাইন লেখা।
              সাপ খেলানো সাপাড়ু
               বদের বেটী বদাড়ু
               ও বেটী তুই মরতে এলি?
                 ভাগ যা আভি অন্ধাগলি।
কাগজটা মিত্রা এগিয়ে দেয় তাপসের দিকে।

 

তাপস সবটা পড়ে প্রশ্ন করে "কি এটা?"
জানালাটা বন্ধ করতে করতে মিত্রা বলে "মশা মারার ঐ রোল অনটা এনেছ তো?তোমরা বাপ ছেলে মেখে শুও।আমিও মাখব।জানলাটা এখন বন্ধ করা যাবেনা।আমার মনে হয় আমাকে ভয় দেখাবার আরও চেষ্টা হবে আর তাতে আমারই সুবিধা  হবে।"
বোকার মত ভাবটা কাটিয়ে তাপস বলে "এটা তো তোমাকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।"
মিত্রা, তাপসের দুটো গালে হাত দিয়ে বলে "একদম ঠিক গো।গোয়েন্দার যোগ্য স্বামী তুমি। যাক তাতারকে একটু চোখে চোখে রেখ।আর এদের কাছ থেকে কার্বলিক এসিড চেয়ে  একটা ছোট শিশি করে জানলাতে রেখে দাও।হ্যা আজ একটু আগে আগে খেয়ে শুয়ে পড়ব।বড় ক্লান্ত  লাগছে।"
           


হঠাৎ ফোনটা বেজে ওঠে।পর্দায় নম্বর টা দেখে মিত্রা  ফোনটা ধরে।"হ্যালো মিস্টার কামদার বলুন।"কামদার মানে মিতেশ কামদার ।এই মন্দিরের ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি ।ধর্মে জৈন কিন্তু রাধাকৃষ্ণের পরম ভক্ত ।ওপাশের গলা শোনা গেলনা।এপাশ থেকে মিত্রা বলে "না ,মাছ এখন জালের আশপাশ দিয়ে ঘোরাফেরা করছে।জালে এখনও  পড়েনি।"

 

ওপাশ থেকে আবার কিছু কথা,প্রত্যুত্তরে মিত্রা বলে "আশা করছি কালকে না হলেও পরশু সব মিটে যাবে।আর তার পরদিন মানে শনিবার সকালে আমরা বাই বাই।"ফোন ছেড়ে দেয় অগ্নিমিত্রা ।
রাত নটার মধ্যে ডিনার শেষ করে ঘরে চলে আসে ওরা।তারপর আধ ঘন্টাটেক আড্ডা মেরে তাপস আর তাতার শুয়ে পড়ে।আর মিত্রা বিছানার একপাশে তার নোট বইটা নিয়ে বসে।হাতের কাছে টেবিলে রিভালবারটা রেখে দেয় ।নিজের কিছুনোট করার ছিল,করে শুয়ে পড়ে।ভোরের অনেক আগেই ঘুম ভেঙে যায় ।মোবাইল জ্বালিয়ে সময়টা দেখে ,তিনটে পনের ।খানিকক্ষণ বিছানায় এদিক ওদিক করে উঠে পড়ে মিত্রা ।
ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায় ।সামনেই নদী।পূর্ণিমা সবে গেছে।চাঁদের আলো এখনও ভালই আছে।হঠাৎ চোখ যায় বাঁ দিকের কোনে।ওদিকে একটা অস্থায়ী ঘাট আগে দেখেছে মিত্রা ।স্নান করবার,জল নেবার।একটা ছোট নৌকা আর তার ওপর দুজন লোক মনে হচ্ছে এদিকেই তাকিয়ে আছে।একজন হাত নেড়ে কাউকে কিছু ঈশারা করছে।

 

ঝটিতি ঘরে ঢুকে তাপসকে ডেকে বলে "তাপস আমি বেরোচ্ছি ।দরজাটা খোলা রইল"সঙ্গে যন্ত্রটা নিতে ভোলেনা।নীচে নেমে ঘাটের দিকে দৌড় লাগায়।দেখতে পায় একটা ছায়ামূর্তি ঘাট থেকে খুব দ্রুত পায়ে ওপরে উঠে আসছে।ওদিকে রিভালবার তাক করে চীৎকার করে ওঠে মিত্রা "হে ই ই যেই হোন দাঁড়িয়ে যান।আপনি কিন্তু আমার নাগালের মধ্যে আছেন।"

 

থেমে যায় মূর্তি টা।তীব্র গতিতে ওদিকে ছুটছে মিত্রা ।চীৎকার শুনে মূল ফটকে থাকা রাতপ্রহরী রাও ছুটে আসছে।মূর্তির কাছে যেতেই সে বলে "আমি গোকুল, এখানকার পুরোহিত গো দিদিমনি।"
"আপনি এত রাতে ঘাটে কি করতে গিয়েছিলেন"?চেঁচিয়ে বলে মিত্রা ।
অগ্নিমিত্রার অমন মূর্তি আর হাতে রিভালবার দেখে চমকে যায় গোকুল ।তুতলিয়ে বল"আমি তো রোজই এই সময় ঘাটে যাই স্নান করতে।আপনি এদেরকে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন।"বলে রাত প্রহরীদের দেখিয়ে দেয় ।তারাও ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায় ।
এবার মিত্রা প্রশ্ন করে " আপনি যখন স্নান করছিলেন তখন কোন নৌকো দেখেছিলেন ঘাটে?"
এবার সপ্রতিভ উত্তর গোকুলের "দেখেছি বইকি।আলবৎ দেখেছি।একটা ছোট ডিঙি নৌকো এসে একটূ দুরে ভিড়ল।তাতে দুটো লোকও ছিল ।আমাকে স্নান করতে দেখে মনে হয় আর এ ঘাটে এলনা।"
"ওদের কোন কথা শুনেছেন?" প্রশ্ন মিত্রা র।
"হ্যা  তাও শুনেছি।একজন আর একজনকে বলছে  তোর দেরীর জন্য  আজকের কাজটা হলনা।মদ খেলে তোর আর কোন হুঁশ থাকেনা।এখন কি কৈফিয়ত দেব বলত? টাকা নিয়ে  বসে আছি।মালটাকে আজকেই নিকেশ করার কথা।এখন কি উত্তর দেব।চল ফিরে চল।অনেক হয়েছে।এই বলে ওরা বিদেয় হয়ে গেল,আর আমিও ভয় পেয়ে ওদেরকে ডাকতে এলাম।"
মিত্রা  প্রহরীদের জিজ্ঞেস করে "তোমরা ঘাট পাহারা দাও না?"
ওদের মধ্যে একজন বলে "আসলে এই ঘাটে নৌকা ভেড়াবার জায়গা নেই।আর সেই জন্যই আমরা ওদিকে যাই বটে তবে খুব একটা নজর রাখিনে এটা সত্য ।"
এরপর মিত্রা ফিরে যায় নিজের ঘরে।ততক্ষণে মিত্রা র হাঁকডাক শুনে সবাই প্রায় জেগে গেছে আর মিত্রা র অমন চেহারা দেখে সকলে একটু ভয়ও পেয়েছে।

 

সকাল হতেই মিত্রা ফোন করে অরূপবাবু কে আর আধ ঘন্টার মধ্যে তিনিও ফোর্স নিয়ে চলে আসেন।সব শুনে আরও চারজনকে বসিয়ে যান।দুজন ঘাটে আর দুজন টহল দেবে।
মিত্রা বলে আপনার ফোর্স বাইরেই থাক,ভিতরটা আমি সামলে নেব।
এরপর ভালয় ভালয় দিনটা কেটে যায় ।রাতে খাবার খেয়ে ঘরে এসে মিত্রা বলে "আমি বেরিয়ে যাচ্ছি  দরজাটা বন্ধ করে তোমরা ঘরে থাক।"

 

তাপস কোন প্রশ্ন করেনা।কারন সকাল মিত্রা গলায় গুন গুন করে সুর ভাঁজছে মানে এখন ও সমাধানের দোরগোড়ায় ।
এবার তাপসের কোমর জড়িয়ে ধরে বলে "একটা সিগারেট দেবে?একটু টেনে দম নিয়ে যাই।এদিকেত সিগারেট খাবার মানা নেই।"
তাপস সিগারেট দিয়ে বলে "জানলা খুলে ওখানে দাঁড়িয়ে খাও।ঘরে ছেলে ঘুমোচ্ছে ।"
জানলা খুলতেই কারও গলা শুনতে পায় মিত্রা "এই তোমাকে শেষবারের মত বলছি"।গলাটা চেনা লাগে।ওর জানলা থেকে কয়েকটা জানলা দুরে একটা জানলা খোলা।ঘর থেকে আলো আসছে।সম্ভবত ঐ ঘর থেকেই কোন পুরুষ কন্ঠের চীৎকার ভেসে এল।খুব দ্রুত সিগারেটটাতে কয়েকটা টান দেয় মিত্রা ।তাপস প্রশ্ন করে কার গলা বুঝতে পারলে?
মিত্রা হেঁয়ালি করে বলে "পারলাম এবং এও বুঝলাম যে আসামী বেশ ভাল করেই বুঝে গেছে যে সে আমার জালে বন্দী।"এইটুকু বলে খুব দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে যায় ।

 

যে জানলা থেকে চীৎকার এসেছিল সেটা মনে রাখার জন্য জানলার ঠিক বাইরে একটা আমঢ়া গাছকে নিশানা করে রেখেছিল মিত্রা ।নীচে নেমে এসে সেই আমঢ়া গাছটার নীচে দাঁড়িয়ে ওপর দিকে তাকায় ।জানলাটা এখন বন্ধ ।ঘরে আর আলোও জ্বলছে না মিত্রা বোঝে ঘরটা বকুলদির।এই ছোট ঘরে একাই থাকে বকুলদি।গ্রামের মেয়ে ।বাল্যবিধবা,ব্রাহ্মণ সন্তান ।দু বেলা পূজোর পর বিগ্রহ  পরিষ্কার করার দায়িত্ব ওঁর।সেই কারনে ও সন্দেহের তালিকাতে প্রথম নাম।
বকুলদির ঘরের দরজার সামনে এসে হালকা টোকা দেয় দরজায় ।ভিতর থেকে প্রশ্ন "কে?"
মিত্রা বলে 'দরজাটা খোল বকুল দি।"
দরজা খুলে যায় ।খুব দ্রুত ঘরে ঢোকে মিত্রা ।মিনিট পনের থেকে যা জানার ছিল বকুলদির কাছ থেকে সেটা জেনে পা টিপে বাইরে বেরিয়ে  আসে।এবার বিশেষ একটা ঘরের সামনে রাখা একটা ভাঙা আলমারির একটি কোনে নিজেকে লুকিয়ে দাঁড়ায় মিত্রা ।খূব নিঃশব্দে কাজটা করে সে।হাতে নাইট ভিসন ক্যামেরা,যে ঘরে ওর টার্গেট তার দরজার দিকে তাক করা।মিনিট চল্লিশ পর একটি ছায়া মূর্তি দরজার পাশে এসে দাঁড়ায় ।দরজায় আলতো করে টোকা দেয় ।খানিক পরে দরজা খুলে যায় ।ঘরের মালিক তোয়ালে পরা ,খালি গা।ঘরে একটা হালকা নীল আলো জ্বলছে।ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে এক মহিলা তার কাপড় ঠিক করতে করতে।দ্রুত পায়ে ঐ ছায়া মূর্তির সাথে উধাও হয়ে যায় ।দরজা বন্ধ হয়ে যায় ।মিত্রা নিজের ঘরের দিকে হাঁটা দেয় ।
ঘরে গিয়ে দুটো ফোন করে একটা কামদারকে আর একটা অরূপ বাবুকে।বলে "কাল সকাল দশটার মধ্যে কৃষ্নভিলাতে চলে আসুন।" আর তাপসকে বলে কালকে আমরা দুপুর একটায় রওনা হব,সব গুছিয়ে ফেল।
        

 

পরের দিন মন্দির চত্ত্বরে তখন কর্তৃপক্ষ, স্টাফ এবঃ পর্যটক নিয়ে প্রায় শ'খানেক লোক।অরূপবাবু সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে"আজকে আমরা সবাই শ্রোতা আর একমাত্র অগ্নিমিত্রা দেবী বক্তা।
     


অগ্নিমিত্রা শুরু করে "আমি খুব আনন্দিত যে খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমরা অপরাধী কে খুঁজে বের করতে পেরেছি ।এরজন্য কতৃপক্ষ এবং পূলিশ যে সাহায্য আমাকে করেছেন তাতে আমি কৃতজ্ঞ ।আমি পেশাদার গোয়েন্দা নই আর ভাল বক্তাও নই ফলে অল্প কটি কথাই আমি বলব।
      


 প্রথমে পর্যবেক্ষণের সময় একটি বিশেষ ঘরের পিছনের জঙ্গলে পড়ে থাকা একটা কনডোমের ছেঁড়া  প্যাকেট আমার নজরে আসে।ওটাকে যে কোন ঘরের কারোরই ভাবা যেতে পারত ,যদি না বাকী অর্ধেকটা ঐ বিশেষ ঘরের জানলার নীচে না থাকত।তখনই  বুঝলাম এই মন্দিরে পাপ জমেছে।আমাকে ভয় দেখানো চিঠি দেওয়া  হয়েছে এমনকি বাইরে থেকে লোক এনে খুনেরও চেষ্টা হয়েছে।তখনই বুঝতে পারি আমার ধারনা সত্যি এবং অপরাধী এখনও এই মন্দিরেই আছে।
এরপর সরাসরি চলে এল নাটকের শেষ অঙ্ক ।গতকাল রাত।আমার ঘরের জানলা খোলা ছিল।হঠাৎ ই এক পুরুষ কন্ঠের চীৎকার শুনতে পাই।"এই তোমাকে শেষবারের মত বলছি"।জানলাটা নিশানা করে দেখি সেটি বকুলদির ঘর।যার একমাত্র অধিকার মন্দিরের ভিতরে ঢোকার আর এই জন্যই তিনি কতৃপক্ষের সন্দেহের তালিকায় এবং বর্তমানে সাসপেন্ড হয়ে আছেন।গভীর রাতে সেই ঘরে গিয়ে কথা বলে জানতে পারি যে এই মন্দিরের এক বিশেষ পূন্যাত্মা আসলে উত্তর প্রদেশের লোক নন।তিনি বাঙালী এবং বর্ধমানে র নাদনঘাটের লোক।

 

বছর পঁচিশ আগে মহিলা সংক্রান্ত এক বড় রকমের ঝামেলায় জড়িয়ে সে আত্মগোপন করে।ঘটনাচক্রে বকুলদিও নাদনঘাটের লোক।সেই সময়  বকুলদির ভরা যৌবন যাতে আকৃষ্ট হয়ে সেই নিধিরাম বর্তমানে গম্ভীরানন্দ বকুলদিকেও ভোগ করার চেষ্টা  করেছিল।কিন্তু সম্ভব হয়ে ওঠেনি।এই মন্দির প্রতিষ্ঠা হবার পর যখন বকুল দি এখানে চাকরি নেয় তখন সে আবার নিধিরামের লালসার বলি হয়।কয়েকদফা প্রস্তাব ও দেয় এবং হুমকিও দেয় যোগীর সেবাদাসী হবার জন্য ।আরও জানতে পারি প্রতি রাতেই ওনার নতুন নতুন নারী শরীরের প্রয়োজন ।এবং তা জোগান দেবার দায়িত্ব পরমের ওপর।যে এখানকার মালি এবং মথুরা থেকে যোগীরই আমদানি ।
               


 উনি যখন বুঝতে পেরে যান যে উনি প্রায় ধরা পড়ে গেছেন তখন উনি বকুলদিকে চুরি করা হারটা রাখতে প্রথমে অনুরোধ এবং পরে জোরাজুরিও করেন।ব্যর্থ হয়ে ঘরে ফিরে আসেন।পরম তখন ওনার ঘরে বিছানা করার নামে নতুন নারী শরীর নিয়ে অপেক্ষা করছিল।এবং সেবা সম্পূর্ণ হলে তাকে স্বস্হানে রেখে আসার জন্য বাইরে কোথাও লুকিয়ে ছিল সে।সেবা ভালমত করার পর সেই নারীকে পরম চুপিসারে নিয়ে চলে যায় ।এই পুরো ঘটনাটা আমার নাইট ভিশন ক্যামেরা তে ছবি তোলা আছে।ক্যাসেটটা আমি অরূপবাবুকে দিয়ে যাচ্ছি, সঙ্গে অন্যন্য প্রমাণ গুলো।যদি  প্রয়োজন হয় ক্যাসেটটা সবার সামনেই চালাতে পারেন।

 

সবাইকে অবাক করে গম্ভীরানন্দ বলে "তার আর দরকার নেই।আমি নিজেই সব দোষ স্বীকার করে নিচ্ছি ।এখুনি আমি রাধামার দশভরির হারটা পুলিশের হাতে হস্তান্তর করছি।
হাসিমুখে অগ্নিমিত্রা সকলকে বলে "চললাম ।আপনারা আমার প্রনাম নেবেন।"

Copyright reserved

 

Your Opinion

We hate spam as much as you do