দিন কেটে যায়, মাস ঘোরে, নতুন বছর আসে। বুড়িমুখো কোটরকে এখন হাঁ-মুখ কোনও বৃদ্ধ রাক্ষসের মতো ঠেকে। অবসরে তাকে ঘিরে-থাকা দুই পাহারাদার আড়মোড়া ভাঙে, হাই তোলে।
ছোট গল্প ও কবিতা
অনির্বাণ বসু
রুনা চট্টোপাধ্যায়
------------------------------------- newscopes.in 18th july
মুদ্রারাক্ষস
অনির্বাণ বসু
সেই তখন গ্রামে ইয়াব্বড়ো একটা গাছ ছিল। গাছ বলেই সে নড়াচড়া করত না মোটে। শুধু হাওয়া দিলে, তার তাল আর ছন্দে দুলে উঠে জানান দিত নিজের অস্তিত্ব। গাছটার সামনেটায় ছিল একটা কোটর। কোটরের মুখের চারপাশটা ছাল-বাকল জুড়ে অদ্ভুত একটা আদল নিয়েছিল। হঠাৎ করে কেউ দেখলেই চমকে যেত। দেখলেই মনে হত, একটা থুত্থুরে বুড়ি বুঝি তার লোলচর্মসার মুখ নিয়ে ফোকলা দাঁতে হাসছে। সেই কোটরের শুরু দেখা যেত, শেষের তল মিলত না। কোথায় কোন অন্ধকারের অতলে গিয়ে মিশেছে সেই পথ, জানত না কেউ।
গ্রামে প্রায়ই ডাকাত পড়ত। মশাল জ্বেলে হইহই করে আসত আর লুঠে নিয়ে যেত গৃহস্থের সবটুকু সঞ্চয়; টাকাকড়ি, সোনাদানা—এই সব। ঘরের ভিতর লুকিয়ে রাখার যো নেই : ডাকাতে রক্ষে নেই, সিঁধেল চোর দোসর! অথচ সম্পত্তি যতটুকু যা বাঁচানো গেছে এবং আগামী দিনগুলোতে আরও যতখানি সাশ্রয় করতে পারবে, সেই সবটুকুকে তো বাঁচাতে হবে লুঠ হওয়ার থেকে; ফলে গ্রামপ্রধান একটানা তিন দিন ধরে অনেক ভেবে-চিন্তে ফয়সালায় পৌঁছলেন : গ্রামের সবাই নিজেদের সব সম্পত্তি লুকিয়ে রাখবে বড়োগাছের বুড়িমুখো কোটরে। প্রধানের কথামতো কাজ করল গ্রামবাসীরা।
বেশ কিছুদিন কেটে গেল নির্বিঘ্নে। মাঝে কয়েকবার ডাকাতদল ডাকাতি করতে এসে কিছুই না-পেয়ে লোকজনকে মারধোর করে ফিরে গেল যে-পথে এসেছিল, সে-পথেই। চোরেরাও হতোদ্যম হয়ে বোধহয় অন্য গ্রামের সন্ধানে পাড়ি জমিয়েছিল ততদিনে। তবু, আরও নিশ্চিন্ত হতে গ্রামপ্রধান দু’জন পাহারাদার বসালেন গাছটার কাছে।
দিন কেটে যায়, মাস ঘোরে, নতুন বছর আসে। বুড়িমুখো কোটরকে এখন হাঁ-মুখ কোনও বৃদ্ধ রাক্ষসের মতো ঠেকে। অবসরে তাকে ঘিরে-থাকা দুই পাহারাদার আড়মোড়া ভাঙে, হাই তোলে।
একদিন বৃষ্টি নামল মুষলধারে। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি। জল বাড়তে-বাড়তে ঢুকে গেল ঘরের উঠোনে, দালানে। গোটা রাত জুড়ে সেই প্রবল বৃষ্টি আর সচকিত বিদ্যুৎ ভয়ার্ত করে রাখল সকল গ্রামবাসীকে। পরদিন সকালের দিকে থেমে গেল সব ঝঞ্ঝা। ধীরে-ধীরে জল শুষে নিল মাটি। মানুষ বেরিয়ে এল বাইরে। দূরে পড়ে আছে গাছখানা। গতরাতের ভয় আচমকা উধাও; নিজেদের সম্পদের জন্য তখন সবাই একছুটে গাছের কাছে।
গাছের কোটর থেকে মাটির ভিতর পর্যন্ত কোথাও কিচ্ছু নেই। উলটে একটা অগভীর কিন্তু প্রশস্ত সুড়ঙ্গ চলে গেছে সোজা প্রধানের বাড়ির দিকে। সবাই মিলে এবার প্রধানের বাড়ি। ফটক হাঁ করে খোলা, সেখানেও আর কেউ অপেক্ষায় নেই তখন।
We hate spam as much as you do