তাঁর হাতে দুই - তিন ধরণের গুগলি ছিল যার ভেলকিতে প্রথম সারির ব্যাটসম্যানদের স্টাম্প একাধিকবার তিনি ছিটকে দিয়েছেন। ক্রিকেটে স্পিন বোলিংয়ের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ক্রিকেট দুনিয়ায় তাঁর আগমনের আগে বোলিং মানেই ছিল ফাস্ট বোলারদের দাপাদাপি। কিন্তু স্পিন বোলিং যে বড় বড় ব্যাটসম্যানদের রাতের ঘুম কেড়ে নিতে পারে তা ওয়ার্ন আসার আগে কেউ কল্পনা করেনি। বৈচিত্র, নিয়ন্ত্রণ একিউরেসির মিশ্রনে স্পিন বোলিংকে তিনি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যান।
শেন ওয়ার্ন এর ঝলমলে ক্যারিয়ারের এক ঝলক
গতকাল বিকেলে তাঁর মৃত্যুর খবর আসতেই ক্রিকেট দুনিয়ায় শোকের ছায়া নেমে আসে। রিকি পন্টিং থেকে সচিন তেন্ডুলকর, স্টিভ ওয় থেকে বিরেন্দ্র সহবাগ, সকলেই কিংবদন্তী লেগ - স্পিনারের আকস্মিক প্রয়াণে স্তম্ভিত! মাত্র ৫২ বছর বয়সে তাঁর চলে যাওয়া কেউই মন থেকে মেনে নিতে পারছেন না। রোড মার্শ, তারপর ওয়ার্ন, পরপর দুইদিনে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট দুই কিংবদন্তিকে হারাল।
তা কেমন ছিল শেন ওয়ার্ন এর ক্যারিয়ার? আসুন, একবার চোখ বোলানো যাক তাঁর রঙিন ক্যারিয়ারে। শেন কেইথ ওয়ার্ন টেস্ট বোলার হিসেবে তাঁর ১৫ বছরের ক্যারিয়ারে (১৯৯৯ - ২০০৭) ৭০৮ টি টেস্ট উইকেট পেয়েছেন। ১৯৯৯ সালের ওয়ার্ল্ড কাপ জয়ী স্কোয়াডের সদস্যও তিনি। উইসডেনের শতাব্দীর সেরা পাঁচ ক্রিকেটারের তালিকায়ও তিনি ছিলেন।
২০০৬ সালে তিনি ৭০০ টেস্ট উইকেটের মালিক হয়ে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেন যা তার আগে কেউ করে দেখাতে পারেননি। তাঁর হেয়ার - স্টাইল, ইয়াররিং, গা - ছাড়া মনোভাব তরুণ ক্রিকেটারদের কাছে তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলে। ১৯৯১ সালে সিডনিতে ভারতের বিরুদ্ধে অভিষেকের আগে তাঁর অভিজ্ঞতা বলতে ছিল সাতটি শেফিল্ড ম্যাচ। তবে অভিষেক টেস্টে একেবারেই দাগ কাটতে ব্যর্থ হন তিনি, ১৫০ রানে মাত্র ১ উইকেট হাসিল করে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েন। তবে এরপর তাঁর উল্কার গতিতে উপরে ওঠা। মোরাতুয়ায় শ্রীলংকার বিরুদ্ধে অপ্রত্যাশিত ভাবে তিনি অস্ট্রেলিয়াকে জয় এনে দেন। তারপর ১৯৯২ - ৯৩ এর বক্সিং ডে টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা খেলা খেলেন। এরপর ১৯৯৩ সালে ২৫.৭৯ এর গড় এ ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে এ্যাশেস সিরিজে তিনি ৩৪ টি উইকেট পান যা তাঁকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয় এবং এক কিংবদন্তীর জন্ম হয়। ওল্ড ট্রাফর্ডে তাঁর প্রথম ডেলিভারি গ্যাটিংয়ের স্টাম্প উড়িয়ে দেয় যা 'শতাব্দীর সেরা বল' হিসেবে ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। আউটসাইড লেগের প্রায় ২ ফিট দূর থেকে বল ঘুরে গ্যাটিংকে স্থানুর মত দাঁড় করিয়ে রেখে স্টাম্প ছিটকে দেয়। তার আগে আগে ওইরকম ডেলিভারি কেউ দেখেনি পৃথিবীতে।
গ্যাটিং আউট হওয়ার পরও বুঝতে পারেননি যে তিনি আউট। বল যে অতটা স্পিন করতে পারে তা তিনি জানতেন না! আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০০০ উইকেটের মালিক ওয়ার্ন নিঃসন্দেহে অস্ট্রেলিয়ার সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের মধ্যে একজন। তিনিই একমাত্র অস্ট্রেলিয়ান যার ঝুলিতে ৭০০র বেশী উইকেট আছে। সব থেকে বেশী উইকেট পাওয়া লেগ স্পিনারদের তালিকায়ও ভারতের অনিল কুম্বলের পরেই তাঁর স্থান। এখানে উল্লেখযোগ্য, ৮০০ উইকেটের গণ্ডী আজ অব্দি শুধু একজনই টপকেছেন। শ্রীলংকার সেই মুত্তাইয়া মুরলীধরনও ওয়ার্নয়ের চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছেন না। শারজাতে তাঁকে যার বিধ্বংসী ব্যাটিং মাটি ধরিয়ে দিয়েছিল সেই 'লিটল মাস্টার' শচীনও শোকস্তব্ধ। আইপিএলে ২০১১ সালে তাঁর ক্রিকেট জীবনের সায়াহ্নে তিনি রাজস্থান রয়্যালসের হয়েও খেলেছেন। ক্রিকেট দুনিয়া নিঃসন্দেহে এক কিংবদন্তীকে হারাল।
We hate spam as much as you do