Tranding

03:30 PM - 04 Feb 2026

Home / Others / লিটল ম্যাগাজিনের প্রাণপুরুষ সন্দীপ দত্তের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ বইপাড়া

লিটল ম্যাগাজিনের প্রাণপুরুষ সন্দীপ দত্তের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ বইপাড়া

..কলেজস্ট্রিটের পথে ঘুরে ঘুরেই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাচীন পত্রিকাদের তিনি নিয়ে আসতেন নিজের বাড়িতে। ১৯৭০ সালে কলেজে পড়া শুরু করতেই পত্রপুটের সম্পাদনা শুরু করেছিলেন তিনি। পরে কলেজ স্ট্রিট সংলগ্ন মির্জাপুরের সিটি স্কুলের শিক্ষক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন সন্দীপ। সঙ্গে সারা জীবন ধরেই লিটল ম্যাগাজিন এবং সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন তিনি।

লিটল ম্যাগাজিনের প্রাণপুরুষ সন্দীপ দত্তের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ  বইপাড়া

লিটল ম্যাগাজিনের প্রাণপুরুষ সন্দীপ দত্তের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ  বইপাড়া

 16 Mar 2023, 


প্রায় দুই মাস আগে সন্দীপবাবুর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। এর জেরে তাঁকে বাইপাসের ধারে অবস্থিত একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভরতি করা হয়েছিল। পরে তাঁকে এসএসকেএম হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানেই গতকাল সন্ধ্যায় মৃত্যু হয় তাঁর।
৭২ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন সাহিত্যিক সন্দীপ দত্ত। তাঁর প্রয়াণে গোটা সাহিত্য জগৎ, বিশেষ করে লিটল ম্যাগাজিনের পরিসরে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সন্দীপবাবু গ্রন্থাগারিক হওয়ার পাশাপাশি লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রাহক হিসেবে বইপাড়ায় সর্বজন বিদিত এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। ১৯৭৮ সালের ২৩ জুন টেমার লেনে এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরেই ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন তিনি। বুধবার সন্ধ্যায় এসএসকেএম হাসপাতালে মৃত্যু হয় তাঁর।


১৯৫১ সালের ২৪ জুলাই জন্ম হয়েছিল তাঁর। কলেজ স্ট্রিটের ১৮এম টেমার লেনের বাড়িতে জন্ম হয়েছিল তাঁর। সেখানেই পরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র। সেন্ট পলস স্কুল এবং তারপর স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিষয়ে স্নাতকোত্তর এবং বিএড করেন। ২০০০ সাল থেকে একে একে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা - লিটল ম্যাগাজিন ভাবনা, স্ল্যাঙ্গুয়েজ, ভুবনেশ্বরী, বিবাহ মঙ্গল, ভাটা, বাংলা ভাষা বিতর্ক, পত্রপুট, উজ্জ্বল উদ্ধার, অল ইন্ডিয়া লিটল ম্যাগাজিন ভয়েসের মতো লিটল ম্যাগাজিন শুরু হয় তাঁরই হাত ধরে। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের আজীবন সদস্য ছিলেন তিনি।


কলেজস্ট্রিটের পথে ঘুরে ঘুরেই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাচীন পত্রিকাদের তিনি নিয়ে আসতেন নিজের বাড়িতে। ১৯৭০ সালে কলেজে পড়া শুরু করতেই পত্রপুটের সম্পাদনা শুরু করেছিলেন তিনি। পরে কলেজ স্ট্রিট সংলগ্ন মির্জাপুরের সিটি স্কুলের শিক্ষক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন সন্দীপ। সঙ্গে সারা জীবন ধরেই লিটল ম্যাগাজিন এবং সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন তিনি। প্রায় দুই মাস আগে সন্দীপবাবুর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। এর জেরে তাঁকে বাইপাসের ধারে অবস্থিত একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভরতি করা হয়েছিল। পরে তাঁকে এসএসকেএম হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানেই গতকাল সন্ধ্যায় মৃত্যু হয় তাঁর। জানা গিয়েছে, বেশ কয়েক দিন ধরেই সন্দীপবাবুর ডায়ালিসিস চলছিল। গ্যাংগ্রিন হওয়ার কারণে একটি পা বাদ দিতে হয়েছিল তাঁর।

১৯৭২ সাল। ন্যাশনাল লাইব্রেরি। মেঝেতে স্তূপাকার করে জমানো হয়েছে অজস্র লিটল ম্যাগাজিন। কোনোটির বয়স বছর দশেক, কোনোটি আবার ৫০-৬০ বছরের পুরনো। এককথায় বলতে গেলে, সাহিত্যপ্রেমী যে-কারোর কাছেই সে-সব মণিমাণিক্য। কিন্তু ব্যাপার কী? এভাবে মেঝেয় লুটোপুটি খাচ্ছে কেন তারা? জঞ্জালের মতো এইসব পত্রিকা নাকি ফেলে দেওয়া হবে ন‍্যাশানাল লাইব্রেরি থেকে! বিষয়টা বুঝতেই রক্ত ছুটেছিল কলেজপড়ুয়া তরুণ সন্দীপের শিরায় শিরায়।  গলা ফাটিয়ে চিৎকার না করে নিঃশব্দে শুরু করেছিলেন এক আশ্চর্য বিদ্রোহ। আশ্রয় দিয়েছিলেন ফুটপাথে ফেলে দেওয়া লিটল ম্যাগাজিনদের।

 

সন্দীপ দত্ত । বাংলার যে-কোনো লিটল ম্যাগাজিন নির্মাতার কাছেই তিনি অভিভাবক। আশ্রয়ের জায়গা। লিটল ম্যাগাজিন চর্চা, আঞ্চলিক সাহিত্যকে জিইয়ে রাখা বা ছোটো পত্রিকার লেখক-সম্পাদকদের প্রশ্রয় জোগানো তো বটেই, লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাস সংরক্ষণে গোটা জীবন লড়াই চালিয়ে গেছেন তিনি। 


 ছোটো থেকেই সাহিত্যের সঙ্গে সন্দীপের ছিল এক নিবিড় সম্পর্ক। তবে ক্লাসিক্যাল লিটারেচারের বদলে তাঁকে বেশি টানত ছোটো পত্রিকা। শখ ছিল সংগ্রহের। কলেজস্ট্রিটের পথে ঘুরে ঘুরেই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাচীন পত্রিকাদের তিনি নিয়ে আসতেন নিজের বাড়িতে, সঙ্গে পেপার কাটিং সংগ্রহ করার নেশা। কলকাতার বুকে কোথাও সাহিত্য সভা হলে, সেখানেও নিঃশব্দে হাজির হতেন তরুণ সন্দীপ। 

১৯৭০ সালে কলেজে পা রাখার পরই স্বতন্ত্র একটি ছোটো পত্রিকার সম্পাদনা শুরু করেন তিনি। ‘পত্রপুট’। তার বছর দুয়েক পরই ন্যাশনাল লাইব্রেরির সেই আশ্চর্য ঘটনা। যা শুধু সন্দীপ দত্তের জীবনই নয়, বদলে দিয়েছিল বাংলার লিটল ম্যাগাজিনের পরিমণ্ডলকেও। 


 ১৯৭২-এর ২৭-৩০ সেপ্টেম্বর। এক অভিনব বিদ্রোহের মশাল জ্বালিয়েছিলেন সন্দীপ দত্ত। জাতীয় লাইব্রেরি থেকে লিটল ম্যাগাজিন উজাড় করে দেওয়ার প্রতিবাদে নিজের বাড়িতেই আয়োজন করেছিলেন এক আশ্চর্য গ্রন্থ প্রদর্শনীর। না, কবিতা, গল্প কিংবা উপন্যাস নয়, বরং ফুটপাথ থেকে কুড়িয়ে আনা লিটল ম্যাগাজিন দিয়েই সাজিয়ে তোলা হয়েছিল এই প্রদর্শনী। 


 ’৭৮ সালে ট্যামার লেনের পৈতৃক ভিটেয় একতলার বৈঠকখানায় তিনি গড়ে তোলেন আশ্চর্য এক গ্রন্থাগার। সেখানে নাকি শুধুমাত্র পাওয়া যাবে ছোটো পত্রিকা। মাত্র ৬৫০ পত্রিকা সম্বল করেই শুরু হয়েছিল কলকাতার এই প্রথম লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহশালা— ‘লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি বাংলা সাময়িকপত্র পাঠাগার ও গবেষণাকেন্দ্র’। ১৯৮৬ সালে যা পরিচিতি পায় ‘কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণাকেন্দ্র’ নামে। পরবর্তীতে বিভিন্ন কাগজের লক্ষাধিক সংখ্যার আশ্রয়কেন্দ্র হয়ে ওঠে সন্দীপ দত্তের ছোট্ট এই বৈঠকখানা।


তবে শুধুমাত্র এই লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাতা বলা হলে অবমূল্যায় করা হবে তাঁকে। আসলে তাঁকে বাংলা লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের অন্যতম ধারক, পৃষ্ঠপোষক এবং অভিভাবক বলা হলেও অত্যুক্তি করা হয় না এতটুকু। লিটল ম্যাগাজিনের অধিকার, সম্মান প্রতিষ্ঠার জন্যেও যে আজীবন লড়াই করে গেছেন তিনি। 


১৯৮২ সাল সেটা। লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে তাঁর গবেষণার প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। হতাশ হননি সন্দীপবাবু। বরং বছরখানেক বাদে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণেই আয়োজন করেছিলেন লিটল ম্যাগাজিন প্রদর্শনী ও আলোচনাসভার। এসেছিলেন শঙ্খ ঘোষ, পবিত্র সরকার, শুদ্ধসত্ত্ব বসু, বার্ণিক রায়, দেবকুমার বসুর মতো ব্যক্তিত্বরা। না, সকলে সাদরে গ্রহণ করেননি তাঁর এই উদ্যোগ। সুকুমার সেন সাফ জানিয়েছিলেন, লিটল ম্যাগাজিন আসলে জঞ্জাল। 

সুকুমারের এই কটূক্তিকেই পরবর্তীতে হাতিয়ার করেন সেন সন্দীপ দত্ত। ‘পত্রপুট’-এর বইমেলা সংখ্যায় বড়ো বড়ো করে ছাপা হয়েছিল ‘জঞ্জাল রাবিশকে প্রশ্রয় দেবেন না’। সঙ্গে ‘লিটল ম্যাগাজিন কিনুন/ লিটল ম্যাগাজিন পড়ুন’ স্লোগানে সাজানো টুপি পরে, বইমেলায় প্রচার শুরু করেন তিনি। বলতে গেলে তাঁর এই অক্লান্ত লড়াই লিটল ম্যাগাজিন করিয়েদের এনে দিয়েছে দাঁড়াবার প্ল্যাটফর্ম। বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে অনুষ্ঠিত হওয়া আজকের লিটল ম্যাগাজিন মেলাগুলিও তাঁর আয়োজিত লিটল ম্যাগাজিন প্রদর্শনীর এক বিবর্তিত রূপ।


 একইসঙ্গে লোকশিল্পেরও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন সৃজনশিল্পী সন্দীপ রায়। তাঁর লাইব্রেরিতে গেলেই আন্দাজ পাওয়া যাবে তাঁর শিল্পরুচির। তাছাড়াও কলকাতার বুকে লেখকব্যাঙ্ক তৈরি, একাধিক ছোটো পত্রিকা ও গ্রন্থের সম্পাদনা, শিক্ষকতা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরব উপস্থিতি তাঁর। অসুস্থতা সত্ত্বেও শেষ বয়সে হাজির হতেন বাংলার বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন মেলা, বইমেলার লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নের টেবিলে টেবিলে। কাঁপা হাতেই সংগ্রহ করতেন পত্রিকার নতুন সংখ্যা। ইতিহাস, আঞ্চলিক সাহিত্য ও বাংলা ভাষা সংরক্ষণের প্রতি এ এক অকৃত্রিম ভালোবাসাই বটে। এমন এক নিরব যোদ্ধার প্রয়াণে ব‍্যাপক ক্ষতি হয়ে গেল হাজার হাজার নামযশহীন সাহিত‍্য স্রষ্টার।

 

Your Opinion

We hate spam as much as you do