Tranding

12:22 AM - 22 Jun 2026

Home / Article / ১৯৭৭, ২১শে জুন থেকে ৩৪ বছরের বাম সরকারের বিকল্পের সাফল্য  (প্রথম পর্ব)

১৯৭৭, ২১শে জুন থেকে ৩৪ বছরের বাম সরকারের বিকল্পের সাফল্য  (প্রথম পর্ব)

গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া: গণতান্ত্রিক অধিকার সুনিশ্চিত করা  ও প্রসারিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্টা এবং  গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষে যা যা সম্ভব তাই করেছে  বামফ্রন্ট সরকার। গ্রাম ও শহরের সাধারণ মানুষকে, বিশেষত শ্রমজীবী মানুষকে, মাথা তুলে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে।

১৯৭৭, ২১শে জুন থেকে ৩৪ বছরের বাম সরকারের বিকল্পের সাফল্য  (প্রথম পর্ব)

১৯৭৭, ২১শে জুন থেকে ৩৪ বছরের বাম সরকারের বিকল্পের সাফল্য  (প্রথম পর্ব)

২১ জুন ২০২৬


বামফ্রন্ট সরকার চলে যাওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গে ১৫ বছর ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বে যে সরকার পরিচালিত হলো সেই সরকারের ব্যর্থতা এত বেশি যে সাফল্য প্রায় চোখে পড়ে না। ফলে পপুলিস্ট পলিটিক্সকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ করে অন্যদিকে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে বিজেপির উত্থান, যা প্রায় অনেকটাই তৃণমূল কংগ্রেসের হাত ধরে হয়েছে,  বিকল্প তৃণমূল বিরোধী সরকার গড়তে সাহায্য করল।  এই সময় আলোচনা হতেই পারে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকার তার সাফল্য কি কি ছিল??
আজ একুশে জুন আজ থেকে ৪৯ বছর আগে ১৯৭৭ সালে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে যে বামফ্রন্ট সরকারের পথ চলা শুরু হয়েছিল, কি কাজ করেছে তা যেমন বামফ্রন্ট বলেছে, তেমনই কী কাজ করতে পারেনি, কেন পারেনি তাও সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরেছে। রাজনৈতিক কারণেই বাম-বিরোধীরা  একদিকে হিংসাত্মকভাবে বামফ্রন্ট সরকারের জনস্বার্থবাহী  উন্নয়নমূলক কাজগুলিকে বাধা দিয়েছে; অন্যদিকে নির্বিচার  কুৎসার তোড়ে উড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছে বামফ্রন্ট সরকারের ইতিবাচক অবদানগুলি। সে কারণেই বামফ্রন্ট সরকারের সাফল্যের কিছু দিক সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো-

বদলে গেল অভিমুখ: ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকারের দায়িত্বভার গ্রহণের মধ্যে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ প্রবেশ করেছিল নতুন এক পর্বে। রাজ্য সরকারের অভিমুখই সেদিন থেকে বদলে যেতে  শুরু করে।

গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া: গণতান্ত্রিক অধিকার সুনিশ্চিত করা  ও প্রসারিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্টা এবং  গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষে যা যা সম্ভব তাই করেছে  বামফ্রন্ট সরকার। গ্রাম ও শহরের সাধারণ মানুষকে, বিশেষত শ্রমজীবী মানুষকে, মাথা তুলে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে। নতুন পরিবেশ পেয়ে শক্তি অর্জন করেছে সংগঠিত গণতান্ত্রিক শক্তি।  বামফ্রন্ট সরকার দায়িত্বে এসেই রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেয়। নকশালপন্থী ও কংগ্রেসীদেরও অনেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। বিনা বিচারে আটকের মতো বর্বর প্রথা রদ করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। বামফ্রন্ট সরকার পুলিসকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা পূরণের কাজে ব্যবহার করেনি। কংগ্রেসী জমানায় গণতান্ত্রিক আন্দোলন ভাঙাই ছিল পুলিসের মূল কাজই। ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারকে বামফ্রন্ট সরকার সর্বদা মর্যাদা দিয়েছে। ধর্মঘট ভাঙতে কখনও পুলিস পাঠায়নি।  বিরোধী রাজনৈতিক কার্যকলাপকে বলপূর্বক দমন করেনি। চৌত্রিশ বছর ধরে বিভিন্ন স্তরে নির্বাচনগুলিতে বিরোধীদের প্রতিদ্বন্ধিতা ও প্রাপ্ত ভোটের হার দেখলেও বিষয়টি পরিস্কার হবে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় রাজ্য সরকার কখনও হস্তক্ষেপ করেনি। সবচেয়ে সমালোচক সংবাদমাধ্যমও সরকারী বিজ্ঞাপন পেয়েছে। দেশের মধ্যে বামফ্রন্ট সরকারই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যস্তরে মানবাধিকার কমিশন গঠন করেছিল।
ধর্মনিরপেক্ষতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও জাতিগত ঐক্যরক্ষায় দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা পালন করেছে বামফ্রন্ট সরকার। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় অতীতের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপত্তা ভোগ করেছেন। জাতিগত ঐক্যের প্রশ্নেই পাহাড়ে পার্বত্য পরিষদ গঠন করা হয়েছিল। নেপালী, সাঁওতালী, উর্দুভাষার স্বীকৃতি ও মর্যাদা রক্ষায় রাজ্য সরকার সর্বদা আন্তরিক থেকেছে।

দেশজুড়ে দুর্নীতির পরিবেশে ব্যতিক্রমী: বিশেষত নয়া উদারবাদী পর্বে  সরকারী দুর্নীতি যখন কি কেন্দ্রে, কি রাজ্যে রাজ্যে প্রাতিষ্টানিক রূপ নিয়েছে, তখন  বামফ্রন্ট সরকার ছিল স্পষ্টতই  ব্যতিক্রমী প্রতিষ্টান।

ভূমি সংস্কার: কৃষি ও কৃষকের স্বার্থে ভূমিসংস্কারে বামফ্রন্ট সরকারের অবদান অতুলনীয়। বিশ্বব্যাঙ্ক পর্যন্ত ২০০৬ সালের ‘ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট’-এ বামফ্রন্ট সরকারের ভূমিসংস্কার নীতির সপ্রশংস উল্লেখ করে। সারা দেশের জমির মাত্র ৩% পশ্চিমবঙ্গে। অথচ গোটা দেশে ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে যত জমি বন্টিত হয়েছে তার ২২% পশ্চিমবঙ্গেই হয়েছিল। ভূমি সংস্কারের ফলেই রাজ্যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা ৮৪শতাংশ কৃষি জমির মালিক। জাতীয় স্তরে তা ৩৪ শতাংশের সামান্য বেশি। বামফ্রন্ট সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গে ৩০লক্ষাধিক কৃষক পেয়েছেন ১১লক্ষ ২৭হাজার একরেরও বেশি জমি।  পাট্টা প্রাপকদের প্রায় ৩৭% তফসিলি জাতিভূক্ত, প্রায় ১৮% আদিবাসী এবং ১৮% সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। ভূমিসংস্কার কর্মসূচীর সঙ্গে লিঙ্গ বৈষম্য মোকাবিলার বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছিল। পাট্টা পেয়ে জমির মালিক হয়েছিলেন কৃষক পরিবারের মহিলারাও। নারী-পুরুষ যৌথ পাট্টা দেওয়া হয়েছিল ৬লক্ষ ১৮হাজারেরও বেশি। শুধুমাত্র মহিলারা পাট্টা  পেয়েছিলেন ১লক্ষ ৬১হাজারেরও বেশি।  জমির পাট্টা বিলি ধারাবাহিকভাবে চলেছে। সপ্তম সরকারের আমলেও ২০০৬ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ১৬ হাজার ৭০০ একর জমির পাট্টা বিলি হয়।সেই সময়পর্বে বস্তুতপক্ষে পশ্চিমবঙ্গেই শুধুমাত্র জমি বন্টিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১৫লক্ষ ১৩হাজার নথিভূক্ত বর্গাদারের আইনী অধিকার সুরক্ষিত করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। বর্গা উচ্ছেদ আটকাতে ১৯৭৭সালের সেপ্টেম্বরেই ভূমি সংস্কার আইনের সংশোধন করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে রাজ্যে বর্গা নথিভূক্ত জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১১লক্ষ ১৫হাজার একর।   এছাড়া ‘চাষ ও বসবাসের ভূমিদান’ প্রকল্পে খেতমজুর, গ্রামীণ কারিগর ও মৎস্যজীবীদের ৫কাঠা পর্যন্ত জমি দেওয়া হয়েছে বিনামূল্যে। প্রায় ২লক্ষ পরিবার এই প্রকল্পে উপকৃত।বনাধিকার আইন ২০০৬ কার্যকর করার ক্ষেত্রেও বামফ্রন্ট সরকার উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছিল।

শুধু গ্রাম নয়, শহরেও গরীব মানুষকে বসবাসের জমি দিতে একগুচ্ছ পদক্ষেপ নিয়েছিল বামফ্রন্ট সরকার। যেমন, উদ্বাস্তুদের নি:শর্ত জমি প্রদান, ঠিকা প্রজাস্বত্ব আইনের সংশোধন করা, কুড়ি বছরের উপর সরকারী জমিতে বসবাসকারীদের মাত্র ১ টাকায় ৯৯ বছরের লিজ দেওয়া, ইত্যাদি। 

(বাকি পরবর্তী পর্বে)

Your Opinion

We hate spam as much as you do