স্প্যানিশ আক্রমণের তীব্রতায় এদিন খড়-কুটোর মতো উড়ে গিয়েছে ফ্রান্স। স্বাভাবিক ছন্দে একেবারেই পাওয়া যায়নি দিদিয়ে দেশঁ’র ছেলেকে। স্পেনের সংঘবদ্ধ ফুটবলের সামনে এদিন যেন মাঠ থেকেই হারিয়ে গিয়েছিলেন এম্বাপ্পেরা। ম্যাচের শুরু থেকে শেষ বাঁশি বেজে ওঠা পর্যন্ত সম্পূর্ণ ম্যাচের রাশ নিজেদের হাতে রেখে দিয়েছিল স্পেন।
আজ্জুরিদের স্পর্শ করে মধুরেন সমাপয়েতের অপেক্ষায় স্পেন
উত্থান দাশ
১৫ জুন - ২০২৬
তাহলে কি দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের পুনরাবৃত্তি হচ্ছেই? এম্বাপ্পেদের যেভাবে ফুৎকারে উড়িয়ে দিলেন ইয়ামালরা, তাতে সেই সম্ভাবনা আরও জোরালো হচ্ছে। শুধু কি তাই? টানা ৩৭টি ম্যাচে অপরাজিত থেকে ইতালিকে স্পর্শ করল স্পেন। সুতরাং বিশ্বকাপ ফাইনালে শেষ হাসি হাসলে, আরও এক অনন্য নজির গড়ে ফেলবে লা রোজারা। টানা ৩৮টি ম্যাচ অপরাজিত থেকে বিশ্বকাপ ঘরে তোলার নজির পৃথিবীর কোনো দলের নেই। সুতরাং মধুরেন সমাপয়েতের অপেক্ষায় ইয়ামালদের সহনাগরিকেরা।
এই বিশ্বকাপে, যেভাবে নিজেদের মেলে ধরেছিল ফ্রান্স, তাতে ফুটবল প্রেমী থেকে শুরু করে ঝানু বিশ্লেষক। অনেকেই জিদান - ওঁরিদের দেশকে সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। আজ জিতলে, পরপর ৩টি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার রেকর্ড গড়ে ফেলতেন এম্বাপ্পে - ডেম্বেলেরা। আর বিশ্বকাপ জিতলে ব্রাজিলের সঙ্গে একটি নিরিখে একাসনে বসে পড়তে দ্য ব্লুজরা। এর আগে একমাত্র সেলেকাওরাই পরপর তিনটি বিশ্বকাপে ফাইনাল খেলেছে - ১৯৯৪,১৯৯৮ ও ২০০২। তারমধ্যে ১৯৯৪ ও ২০০২ সালে একেবারে বিশ্বসেরার শিরোপা নিয়েই ঘরে ফিরেছিল জোগো বোনিতোর রূপকাররা। ফ্রান্সের সামনেও সেই ইতিহাস গড়ার হাতছানি ছিল। ২০১৮’র সালের রুশ বিশ্বকাপে জেতার পর ২০২২ সালে ফের ফাইনালের টিকিট জোগাড় করে ফেলেন এম্বাপ্পেরা। কাতারে মেসিদের কাছে পরাস্ত হয়ে পরপর দু’বার বিশ্বসেরার শিরোপা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয় ফ্রান্স। তবে এই বিশ্বকাপে যেভাবে সেমিফাইনাল অবধি খেলেছিল তারা, তাতে ব্রাজিলকে ছুঁয়ে ফেলার প্রভূত সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু স্পেন যেভাবে খেলল, তাতে কার্যত মাথা তুলেই দাঁড়াতে পারলেন না এম্বাপ্পেরা।
স্প্যানিশ আক্রমণের তীব্রতায় এদিন খড়-কুটোর মতো উড়ে গিয়েছে ফ্রান্স। স্বাভাবিক ছন্দে একেবারেই পাওয়া যায়নি দিদিয়ে দেশঁ’র ছেলেকে। স্পেনের সংঘবদ্ধ ফুটবলের সামনে এদিন যেন মাঠ থেকেই হারিয়ে গিয়েছিলেন এম্বাপ্পেরা। ম্যাচের শুরু থেকে শেষ বাঁশি বেজে ওঠা পর্যন্ত সম্পূর্ণ ম্যাচের রাশ নিজেদের হাতে রেখে দিয়েছিল স্পেন। ইনিয়েস্তাদের উত্তরসূরীদের ফুটবল শৈলী কেবল মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখে যেতে হয়েছে নীল জার্সিধারীদের। বললে অতিশয়োক্তি হবে না যে ফুয়েন্তের ট্যাকটিক্স এদিন দেশঁকে অসহায় আত্মসমর্পণ করিয়েছে। যেন বেটোফেনের সামনে পাড়ার জলসায় গান গাওয়া কিশোর কন্ঠী গায়ককে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। অথবা মাইকেলেঞ্জেলোর সঙ্গে মূর্তি গড়ার লড়াইয়ে সদ্য হাতেখড়ি হওয়া সরস্বতী পুজোর কারিগর। বা সেক্সপিয়রের বিপক্ষে সাপ্তাহিক পত্রিকায় গল্প পাঠানো, সদ্য গোঁফের রেখা গজিয়ে ওঠা লেখক। আজকের খেলা দেখে এমনটাই মনে হয়েছে ফুটবল বিশ্লেষকদের।
দলগত সংহতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হলে কি ফলাফল হতে পারে তা আজ দেখিয়ে দিলেন গোলরক্ষক উনাই সাইমন থেকে শুরু করে গোলদাতা ওয়ারজাবাল ও পেড্রো। রড্রি, অলমো, রুইজ। এই ত্রয়ীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা স্প্যানিশ মাঝমাঠ আজকের জয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ২০ মিনিটে প্রথম গোল স্পেনের। তীব্র গতিতে এগিয়ে আসা ইয়ামালকে রুখতে গিয়ে, বক্সের মধ্যে ফাউল করে ফেলেন লুকাস ডিগন। পেনাল্টি থেকে জাল কাঁপান ওয়ারজাবাল (১-০)। এই নিয়ে পাঁচ - পাঁচটি গোল করে ফেললেন স্প্যানিয়ার্ড। দ্বিতীয়ার্ধে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন দেশঁ। সমতা ফেরানোর লক্ষ্যে রক্ষণ অনাবৃত রেখে আরও বিপদ ডেকে আনেন তিনি। অলমোর থেকে বল পেয়ে বিশ্বমানের গোল করে ফেলেন পেড্রো (২-০)। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, এই দিনেই ২৩৭ বছর আগে বাস্তিল দুর্গ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফরাসী বিপ্লবে ধুলোয় লুটোপুটি খেয়েছিল রাজমুকুট। ঠিক সেই দিনেই এম্বাপ্পেদের রাজতন্ত্রেরও অবসান ঘটল! আর একটা ধাপ। সেটা উতরোলেই ইতিহাস গড়ে ফেলবেন ইয়ামালরা।
We hate spam as much as you do