ভারতের এই অদ্ভুত ‘ডিজিটাল পলিটিক্যাল থিয়েটার’ বা মিম-রাজনীতির উৎপত্তি কিন্তু এক গভীর ক্ষোভ এবং সামাজিক প্রতিবাদ থেকে। গত ১৫ মে দেশের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি শুনানির সময় করা বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এই ঝড়ের সূত্রপাত। অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্টে ভুয়ো আইন ডিগ্রির এক মামলার শুনানির সময় তিনি দেশের কিছু কর্মহীন যুবকদের একাংশকে ‘আরশোলা’ (Cockroach) এবং ‘পরজীবী’ (Parasite)-র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। যদিও পরবর্তীতে শীর্ষ আদালতের তরফে স্পষ্ট করা হয় যে, প্রধান বিচারপতির ওই মন্তব্য স্রেফ জালিয়াতি চক্রের চাঁইদের উদ্দেশ্যে ছিল, সাধারণ যুবকদের জন্য নয়।
CJP র পর এবার NPF.. ককরোচ এর পাল্টা এই প্যারাসাইটিক ফ্রন্ট?
23 May 2026
ভারতের ডিজিটাল রাজনৈতিক ময়দানে এবার শুরু হল এক নজিরবিহীন মহাযুদ্ধ! মাত্র কয়েক দিন আগে নেটপাড়ায় জন্ম নেওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP) যখন ইনস্টাগ্রামে খোদ মোদী-শাহের বিজেপি-কে ফলোয়ার সংখ্যার নিরিখে গোল দিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়ছে, ঠিক তখনই আরশোলার দাপট থামাতে সোশ্যাল মিডিয়ার অলিন্দে আত্মপ্রকাশ করল আরও এক মারাত্মক ব্যঙ্গাত্মক বা স্যাটিরিক্যাল ফ্রন্ট - ‘ন্যাশনাল প্যারাসাইটিক ফ্রন্ট’ (NPF) বা এনপিএফ। এই মুহূর্তে ভারতীয় নেটিজেনদের দেওয়ালে দেওয়ালে ছড়িয়ে পড়েছে এই নতুন দলের পোস্টার। ভারতের যুবসমাজ এই দুই কাল্পনিক বা প্যারোডি দলকে নিয়ে এমনভাবে চর্চায় মেতেছে, যা দেখে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতেই পারে যে দেশে বুঝি নতুন কোনও লোকসভা নির্বাচন ঘোষণা হয়ে গিয়েছে!
ভারতের এই অদ্ভুত ‘ডিজিটাল পলিটিক্যাল থিয়েটার’ বা মিম-রাজনীতির উৎপত্তি কিন্তু এক গভীর ক্ষোভ এবং সামাজিক প্রতিবাদ থেকে। গত ১৫ মে দেশের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি শুনানির সময় করা বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এই ঝড়ের সূত্রপাত। অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্টে ভুয়ো আইন ডিগ্রির এক মামলার শুনানির সময় তিনি দেশের কিছু কর্মহীন যুবকদের একাংশকে ‘আরশোলা’ (Cockroach) এবং ‘পরজীবী’ (Parasite)-র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। যদিও পরবর্তীতে শীর্ষ আদালতের তরফে স্পষ্ট করা হয় যে, প্রধান বিচারপতির ওই মন্তব্য স্রেফ জালিয়াতি চক্রের চাঁইদের উদ্দেশ্যে ছিল, সাধারণ যুবকদের জন্য নয়। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। প্রধান বিচারপতির সেই তির্যক অপমানকেই ‘অস্ত্র’ বানিয়ে ময়দানে নেমে পড়ে দেশের কোটি কোটি কর্মহীন ও হতাশ যুবসমাজ। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ আর ‘ন্যাশনাল প্যারাসাইটিক ফ্রন্ট’ তারই প্রমাণ।
কী এই ন্যাশনাল প্যারাসাইটিক ফ্রন্ট
সহজ কথায়, এনপিএফ কোনও সরকার নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নয়, এটি সম্পূর্ণ মিম এবং প্যারোডির ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি ডিজিটাল যুব আন্দোলন। তবে এদের থিমটি অত্যন্ত চতুর। এরা নিজেদের সাধারণ বা ট্র্যাডিশনাল রাজনীতির বিরোধী তো বটেই, একই সঙ্গে এরা নিজেদের ঘোষণা করেছে ভাইরাল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র প্রধান ও অফিশিয়াল বিরোধী দল (Formal Opposition) হিসেবে!
দলের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, আমাদের এই পরজীবী বা প্যারাসাইট নামটা অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। দেশের এক ভাঙা ও পচে যাওয়া শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে আমরা নিজেদের যুক্ত করতে চাই - কিন্তু তা কোনও ফায়দা বা রক্ত চোষার জন্য নয়, বরং এই পচা সিস্টেমটাকে ভেতর থেকে উপড়ে ফেলে আমূল বদলে দেওয়ার জন্য।
ককরোচ বনাম প্যারাসাইট: তফাত কোথায়
দুই দলই সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির একই মন্তব্য থেকে তৈরি হলেও, এদের কাজের মেজাজে সামান্য তফাত রয়েছে। ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি মূলত একটু ‘বামপন্থী ও সমাজতান্ত্রিক পপুলিজম’ বা আমজনতার সরল মেজাজে বিশ্বাসী। তারা সরাসরি দেশের বেহাল বেকারত্ব ও পরীক্ষা কেলেঙ্কারী নিয়ে রাজনৈতিক এলিটদের দিকে আঙুল তুলছে। তৃণমূল কংগ্রেসের মহুয়া মৈত্র বা কীর্তি আজাদের মতো হেভিওয়েট নেতারাও সরাসরি আরশোলা পার্টির পোস্টে কমেন্ট করে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এমনকি যমুনার নোংরা ঘাট পরিষ্কার করতে আরশোলার পোশাক পরে নেমে পড়েছেন সিজেপি-র কর্মীরা!
অন্যদিকে, ন্যাশনাল প্যারাসাইটিক ফ্রন্ট বা এনপিএফ অনেক বেশি থিয়েট্রিক্যাল বা নাট্যরূপ ধারণ করেছে। তারা সরাসরি সিজেপি-র ‘ভোট ব্যাঙ্ক’-এ থাবা বসাতে এক কাল্পনিক বিপ্লবী ভাষা ব্যবহার করছে। তাদের মূল লক্ষ্য হল, ভারতীয় রাজনীতিতে শাসন বা সরকারের নামে যে ‘নাটক’ চলে, তাকেই ব্যঙ্গের চরম সীমায় নিয়ে গিয়ে সাধারণ মানুষের চোখের ঠুলিটা খুলে দেওয়া।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ভারতে এই ধরণের ডিজিটাল প্যারোডি আন্দোলনের বিপুল সাফল্য প্রমাণ করছে যে, দেশের বর্তমান কর্মসংস্থান, আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিকাঠামোগত ব্যর্থতা নিয়ে শিক্ষিত যুবসমাজের মনের ভেতরের ক্ষোভ কতটা তীব্র। সরাসরি আন্দোলনের রাস্তায় না গিয়ে মিম কালচার বা কমিকসকে ঢাল বানিয়ে তরুণেরা আসলে দেশের শীর্ষ নেতা ও বিচারব্যবস্থার অহংকারকে এক বিরাট ধাক্কা দিচ্ছে। এই আরশোলা আর পরজীবীর লড়াই ইভিএম পর্যন্ত পৌঁছক বা না পৌঁছক, নেটদুনিয়ার ‘সিংহাসন’ যে তারা ইতিমধ্যেই কেড়ে নিয়েছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
We hate spam as much as you do