দল এবং দেশের জনতার মধ্যে আশার সঞ্চার করে দেশের ৫৯ তম প্রধান মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে চলেছেন বার্নহাম। ব্রিটেন এর ইতিহাসে বিগত ৫০ বছরের মধ্যে সবথেকে বেশি বামমনস্ক ও বামপন্থী প্রধান মন্ত্রী হতে চলেছেন বলে রাজনৈতিক মহলের বিশ্বাস। জন মেজর, টনি ব্লেয়ার, গর্ডন ব্রাউন বা সাম্প্রতিকতম স্টারমার, লেবার পার্টির হলেও, চিন্তাভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে বার্নহাম অনেক বেশি বামপন্থী।
ব্রিটেনের নতুন লেবার প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন বামপন্থী চিন্তার বার্ণহাম,
অয়ন চট্টোপাধ্যায়
19 জুলাই 2026
এই শুক্রবার অ্যান্ডি বার্নহাম আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটেনএর লেবার পার্টির নেতা নির্বাচিত হলেন। গত ২২ জুন কিয়ের স্টার্মার প্রধানমন্ত্রী এবং লেবার পার্টির নেতার পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার কথা ঘোষণা করার পরেই তাঁর সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ রাজনীতিতে। তাঁর উত্তরসূরি মনোনীত হন বার্নহাম।
যার ফলস্বরূপ ওনার ব্রিটেনএর পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পথে আর কোনো বাধা রইলো না। ব্রিটেনএর রাজা কিং চার্লস ওনাকে সরকার গঠনের জন্য আবেদন জানিয়েছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে আসছে সোমবার উনি দেশের প্রধান মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন। লেবার পার্টির নিম্নকক্ষের ৪০৩ জন সদস্যের মধ্যে ৩৭৯ জনই বার্নহামকে সমর্থন জানিয়েছেন। এছাড়া এফিলিয়েটেড শ্রমিক সংগঠনগুলিও তার প্রতি সমর্থন জানায়। গতমাসে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার এর পদত্যাগের পরে বার্নহাম এর দলের নেতা হিসেবে নির্বাচিত হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা ছিল। বিগত নির্বাচনে বিপুল সংখ্যায় জিতে এলেও লেবার পার্টি পরবর্তীকালে আঞ্চলিক নির্বাচনে সুবিধা করতে পারছিলো না। দলের মধ্যে কোনঠাসা হয়ে পড়েন স্যার স্টারমার।
দল এবং দেশের জনতার মধ্যে আশার সঞ্চার করে দেশের ৫৯ তম প্রধান মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে চলেছেন বার্নহাম। ব্রিটেন এর ইতিহাসে বিগত ৫০ বছরের মধ্যে সবথেকে বেশি বামমনস্ক ও বামপন্থী প্রধান মন্ত্রী হতে চলেছেন বলে রাজনৈতিক মহলের বিশ্বাস। জন মেজর, টনি ব্লেয়ার, গর্ডন ব্রাউন বা সাম্প্রতিকতম স্টারমার, লেবার পার্টির হলেও, চিন্তাভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে বার্নহাম অনেক বেশি বামপন্থী।
ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির নতুন নেতা হিসাবে নির্বাচিত হওয়ার পরেই পাঁচ দফা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অ্যান্ডি বার্নহাম। সেই সঙ্গে সে দেশের ৫৯তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের বিদায়ী মেয়র বললেন, ‘‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান।’’ আগামী সোমবার প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার আগেই মন্ত্রিসভা চূড়ান্ত করে ফেলবেন বলেও জানিয়ে দিয়েছেন বার্নহাম।
সরকারি বিনিয়োগের ওপর জোর, বৃহত্তম সরকারি আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা, শ্রমজীবীদের অধিকার রক্ষা ওনার সরকারের অগ্রাধিকার হবে। পানীয় জল, বিদ্যুৎ, পরিবহন ইত্যাদি অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা গুলি তিনি সরকারি নিয়ন্ত্রণে রাখার বরাবরের পক্ষপাতি। তিনি বলেছেন, আক্ষরিক অর্থে, তিনি দেশের পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ সমস্ত প্রান্তের মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করবেন। ইংল্যান্ড এর সাথে সাথে তিনি ওয়েলস, স্কটল্যান্ড, Northern আয়ারল্যান্ড এর মানুষদের জন্যেও সমানভাবে তার সরকার কাজ করবে।
দেশের মানুষের জন্য উন্নত সামাজিক সুরক্ষার সাথে সাথে দেশের আরো বেশি মানুষের কাছে যাতে সামাজিক সুরক্ষা পৌঁছে যেতে পারে তার ব্যবস্থা তিনি করবেন বলে জানিয়েছেন। সরকারি জনসেবা বর্তমানে অত্যন্ত চাপের মুখে। NHS, ব্রিটেনএর জনস্বাস্থ্য পরিষেবা, যা বিপুল সংখক নাগরিকদের বিনামূল্যে পরিষেবা প্রদান করে, সাধারণ মানুষের করের টাকায় চলে। ব্রিটেনএর গণপরিবহন ব্যবস্থাও অনেক দেশের কাছে ঈর্ষণীয়। টিউব, বাস, DLR (ডকল্যান্ড লাইট Railways) নিয়ে গড়ে ওঠা TFL বা ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডন এখনো অবধি সরকারি পয়সায় চলে এবং সরকার নিয়ন্ত্রণাধীন। বিভিন্ন সরকারি পরিষেবার কর্মচারীরা দীর্ঘ কাজের সময় ও স্বল্প পারিশ্রমিক নিয়ে আন্দোলন করছিলেন। পূর্ববর্তী রক্ষণশীল, Conservative Tory পার্টির শাসনকালে এদের দাবি বারবার উপেক্ষিত হয়েছে। বার্নহাম এই ইসুগুলিকে অগ্রাধিকার দেবেন বলে জানিয়েছেন। এর সাথে সাথে, সমাজের বিভিন্ন বর্গের মানুষের জীবন যাত্রার মানকে উন্নত করার দিকে তার সরকার মন দেবে বলে তিনি জানিয়েছেন। কাউন্সিল হাউসিং, সরকারি সহায়তায়, ভর্তুকিতে, ব্রিটেনে কম আয়ের ও বিভিন্ন অসহায় মানুষদের জন্য গড়ে তোলা আবাসন প্রকল্প। এটি আশ্রয়হীন, আর্থিকভাবে অসুবিধায় পড়া মানুষদের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক সুরক্ষা। ক্ষমতায় আসার পর তার সরকার, ব্রিটেনএর ইতিহাসে, বৃহত্তম কাউন্সিল হাউসিং প্রকল্পের কাজ শুরু করবে বলে জানিয়ে দিয়েছে। ৯০ এর দশকের মাঝামাঝি, রেলএর বেসরকারি করণের পর থেকে UK বাসি, বর্ধিত পরিবহন খরচ, সিগন্যাল failureএ নাজেহাল হয়ে গিয়েছিল। এটি চরমে ওঠে conservative পার্টি র শাসনের শেষের দিকে। লেবার পার্টি লিডারশিপ এর লক্ষই ছিল রেলএ পরিবহন খরচ কমিয়ে আনা ও ধীরে ধীরে রেলকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। এগুলি তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু ক্ষমতায় না থাকার জন্য তারা সে সুযোগ পাচ্ছিলেন না। ২০২৪এ, ১৪ বছর পর, নতুনভাবে ক্ষমতায় আসার পর, লেবার পার্টি সেই অভিমুখে কাজ শুরু করে। Andy বার্নহাম সেই কাজকে সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রেল পরিবহনে ভাড়া কমানো, সঠিক সময়ে রেল চলাচল তার সরকারের লক্ষ্য হবে। লেবার সরকার ক্ষমতায় আসার পর NHSএ ওয়েটিং লিস্ট এর দৈর্ঘ্য কমতে থাকে। বার্নহাম সেই ইতিবাচক প্রবণতাকে বজায় রাখার আশ্বাস দিয়েছেন। চিরাচরিত বিদ্যালয় শিক্ষার সাথে সাথে, কারিগরি ও প্রযুক্তি প্রশিক্ষণের সামঞ্জস্য ঘটিয়ে যুব সমাজকে যাতে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুত করা যায় বা কর্মসংস্থানের উপযোগী করে তোলা যায়, সেই দিকেও তার দৃষ্টি থাকব। একই সাথে তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছেন যে তার সরকার শিল্প সহায়ক হবে।
বৃহত্তর ম্যানচেস্টারএর পূর্ববর্তী এই মেয়র, তার মেয়াদকালে, অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণএর ওপর জোর দিয়েছিলেন। যেখানে যেখানে বাজারি অর্থনীতি ব্যর্থ হয়েছিল, সেখানে সেখানে তিনি শিল্পকে সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীনে আনেন।
মেয়র হিসেবে তার শাসনকালে, গ্রেটার ম্যানচেস্টার উৎপাদনশীলতায় দেশের মধ্যে সবথেকে এগিয়ে ছিল, উন্নতির সূচকেও দেশের অন্যান্য শহরকে পিছনে ফেলে দিয়েছিলো ম্যানচেস্টার। একটা সময়ে শহরের কিশোর কিশোরীদের নিজের শহর ছেড়ে ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য দক্ষিণে, লন্ডনএর দিকে পাড়ি দিতে হতো। সেই প্রবণতাও এখন অনেক কম। তার সময়ে গ্রেটার ম্যানচেস্টারএ পরিবহনে, সরকারি উদ্যোগে Bee নেটওয়ার্কও অনেক পরিণত ও সুসংহত হয়ে ওঠে।
বার্নহাম এর মতে, ব্রিটেন এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কার্যকলাপ অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত , লন্ডন কেন্দ্রিক, যা কিনা আঞ্চলিক অসাম্যের জন্ম দেয় ও রাজধানী এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের পক্ষে কাঠামোগতভাবে পক্ষপাতের সৃষ্টি করে। এর ফলে ম্যানচেস্টার, লিভারপুল এর মতো অঞ্চল, যা কিনা শিল্প বিপ্লবের জন্ম দিয়েছিলো, যা কিনা শ্রমজীবী গোষ্ঠীর প্রাণকেন্দ্র, বহুদিন ধরে উপেক্ষিত হচ্ছিল। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরই তিনি ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট থেকে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করে স্থানীয় প্রশাসনকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনেক স্বাধীনতা দেবেন, যাতে আঞ্চলিক ভাবে ছোট শিল্প, হাই স্ট্রিটএর দোকান, pub, রেস্তোরাগুলিকে আরো উৎসাহ দেওয়া যায় আরো সাহায্য করা যায়।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি নিয়ে স্নাতকোত্তর, ক্যাথলিক পরিবারে জন্মগ্রহণকারী বার্নহাম নিজেকে একেবারেই ধর্মপ্রাণ নন বলেই চিহ্নিত করেছেন। নিজেকে তিনি সোসালিষ্ট বা সাম্যবাদী হিসেবে চিহ্নিত করতে ভালোবাসেন।
অনেকেই তাকে নিউ ইয়র্কের মেয়র, ডেমোক্রেটিক সোশালিস্টস অফ আমেরিকার জোহরান মামদানির সাথে তুলনা করছেন। মুদ্রাস্ফীতির চাপে নাভিশ্বাস ওঠা সাধারণ মানুষএর কষ্ট লাঘব করার প্রতিশ্রুতি দিয়েই এরা শাসনের ভার নিয়েছেন।
৫৬ বছর বয়সী বার্নহাম, ২০১৬ থেকে দেশের সপ্তম প্রধান মন্ত্রী হতে চলেছেন, যা কিনা রাজনৈতিক স্থায়িত্বের অভাবকেই তুলে ধরে। লেবার লিডার হিসেবে তার প্রথম ভাষণে তিনি লেবার পার্টিকে তার মূল আদর্শ, মেহনতি মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে অবিচল থেকে, সব মানুষের পার্টি হয়ে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন।
We hate spam as much as you do