প্রাথমিক ভাবে পুলিশ এবং দমকল কর্মীদের নিয়ে তৈরি উদ্ধারকারী দল ১৬ জনকে টানেল থেকে বের করে আনতে সক্ষম হলেও পরে জানা যায়, যে অংশে ধস নেমেছে তার উল্টো দিকে আরও ২৭ জন কর্মী আটকে রয়েছেন। রাতে উদ্ধার কাজে যোগ দেন পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমের এনডিআরএফ দল। মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত ধস সরিয়ে ১৮টি মৃতদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। পরে বুধবার সকালে উদ্ধার হয় আরও দু'জন শ্রমিকের মৃতদেহ। তবে শ্রমিকদের বের করে আনতে উদ্ধারকারী দলকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়।
সিকিমে সুড়ঙ্গ ধসে মৃতের সংখ্যা ২০, অধিকাংশই উত্তরবঙ্গের, নিখোঁজ বহু
July 22, 2026
সিকিমের নামচি জেলায় তিস্তার নির্মীয়মাণ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে ভয়াবহ ধসের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে হলো ২০। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা। এখনও ৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে সিকিম প্রশাসন সূত্রে খবর। দুর্ঘটনার পর থেকে টানা উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF), সেনাবাহিনী, রাজ্য পুলিশ, দমকল এবং NHPC-র বিশেষজ্ঞ দল। দুর্ঘটনায় অন্তত ২৭ জন সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে পড়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে দু’জন কোনওক্রমে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। ২০ জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে। বাকি পাঁচজনের খোঁজে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
কী ভাবে ঘটল দুর্ঘটনা?
সোমবার দুপুরে নামচি জেলার সামারদুং এলাকায় NHPC-র তিস্তা স্টেজ-VI জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গে আচমকাই ধস নামে। পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের জেরে সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখ সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসস্তূপে আটকে যায়। মুহূর্তের মধ্যে ভিতরে আটকে পড়েন বহু শ্রমিক ও প্রকল্পের কর্মী। প্রশাসনের একটি সূত্রের দাবি, সুড়ঙ্গের ভিতর জমে থাকা মিথেন গ্যাসে আচমকা বিস্ফোরণ হয়। বিস্ফোরণের কারণেই ধস নামে সুড়ঙ্গের ভিতরে।
উদ্ধারকাজে বড় বাধা
প্রাথমিক ভাবে পুলিশ এবং দমকল কর্মীদের নিয়ে তৈরি উদ্ধারকারী দল ১৬ জনকে টানেল থেকে বের করে আনতে সক্ষম হলেও পরে জানা যায়, যে অংশে ধস নেমেছে তার উল্টো দিকে আরও ২৭ জন কর্মী আটকে রয়েছেন। রাতে উদ্ধার কাজে যোগ দেন পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমের এনডিআরএফ দল। মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত ধস সরিয়ে ১৮টি মৃতদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। পরে বুধবার সকালে উদ্ধার হয় আরও দু'জন শ্রমিকের মৃতদেহ। তবে শ্রমিকদের বের করে আনতে উদ্ধারকারী দলকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। ধস পেরিয়ে টানেলের ভিতরে ঢুকতে গিয়ে অনেকেই মিথেন গ্যাসের তীব্রতায় অসুস্থ বোধ করেন, কয়েকজন জ্ঞানও হারিয়ে ফেলেন।
তবে শুধু মিথেন গ্যাসই নয়, এর পাশাপাশি সুড়ঙ্গের ভিতরে ক্রমাগত ধস নামার আশঙ্কা, পাথর ও কাদার স্তূপ এবং সংকীর্ণ জায়গা উদ্ধারকাজকে অত্যন্ত কঠিন করে তোলে। নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ধাপে ধাপে ধ্বংসস্তূপ সরানো হয়। ফলে অভিযান সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে।
প্রশাসনের আশা, নিখোঁজ পাঁচজনের সন্ধানে চলা অভিযান যত দ্রুত সম্ভব শেষ করা যাবে। তবে উদ্ধারকারী দল জানিয়েছে, পাহাড়ি এলাকার প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং ধসের ঝুঁকির কারণে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হচ্ছে।
জলপাইগুড়ির পুলিশ সুপার সুজাতা কুমারী বীণাপানি জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির লোকজনদের দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সব ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন জলপাইগুড়ির অতিরিক্ত জেলাশাসক এবং ট্রাফিকের ডিএসপি।
মৃতদের মধ্যে উত্তরবঙ্গের শ্রমিকও
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃত ২০ শ্রমিকের মধ্যে ১৩ জনকে শনাক্ত করা গিয়েছে। তাঁদের মধ্য়ে নয় জন জলপাইগুড়ির বাসিন্দা, দু'জন আলিপুরদুয়ারের, একজন পাঞ্জাবের এবং একজন সিকিমের। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন ৪৩ বছর বয়সি অনীশ মোহন, তিনি কেরালার জিওলজিস্ট। জলপাইগুড়ি জেলার মৃত নয় জন মেটেলি এবং বিন্নাগুড়ির বাসিন্দা।
প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, ডুয়ার্সের চা বাগানে প্রত্যেকেই একসময় শ্রমিকের কাজ করতেন। কিন্তু তৃণমূল জমানায় বাগান রুগ্ন হয়ে পড়ে। ঠিকমত বেতনও পাচ্ছিলেন না। সেজন্য শ্রমিকের কাজ নিয়ে বাধ্য হয়ে বাইরে চলে গিয়েছিলেন। মৃত্যুর খবর আসার পরেই শোকস্তব্ধ ডুয়ার্সের নাগরাকাটা ও মেটেলি ব্লক। মেটেলি ব্লকের ছয়জন এবং নাগরাকাটা ব্লকের তিনজন ধসে মারা গিয়েছেন। ডুয়ার্সের মেটালি ব্লকের কিলকোট চা বাগানের ১১ লাইন শ্রমিক মহল্লার বাসিন্দা গ্রাবিয়েল টিজ্ঞা, শিবা মুডা এবং বিকেশ্বর ওঁরাও দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন। ইনডং চা বাগানের টন্ডু লাইন শ্রমিক মহল্লার বাসিন্দা শ্যাম ওঁরাও এবং নাগেশ্বরী চা বাগানের বাসিন্দা অমিতলাল গোরের মৃত্যু হয়েছে।
মেটেলি ব্লক ছাড়াও নাগরাকাটা ব্লকের বাসিন্দা তিনজনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। গ্রাসমোর চা বাগানের বাসিন্দা আনন্দ টোপ্পো, সুখানি বস্তির বাসিন্দা অর্জুন সাওতাল এবং শুলকাপাড়ার বাসিন্দা বালো ওঁরাও রয়েছেন। এছাড়াও কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছে। বানারহাট ব্লকের বিন্নাগুড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীনে থাকা তেলিপাড়া চা বাগানের বাসিন্দা আদেশ ওঁরাওয়ের মারা যাওয়ার খবর রয়েছে।
ঘটনাস্থলে ভারী যন্ত্রপাতি ও বিশেষ উদ্ধার সরঞ্জাম আনা হয়েছে ৷ ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে টানেলের ভিতরে নিরাপদ প্রবেশপথ তৈরির কাজ করছে বাহিনী। প্রশাসন জানিয়েছে , টানেলের ভিতরে আটকে পড়া প্রত্যেক ব্যক্তির খোঁজ না পাওয়া পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান চলবে । বাড়তি কিছু আয়ের জন্য কিলকোট চা বাগানের ১১ নম্বর লাইনের বাসিন্দা তরুণ গ্যাব্রিয়েল টিগ্গা (২৬) চারদিন আগে পাড়ি দিয়েছিলেন সিকিমে। স্বপ্ন ছিল বাড়তি আয় করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবেন । কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই এল মৃত্যু সংবাদ। গ্যাবরিয়েলের দাদা পাস্কেল টিজ্ঞা বলেন, "চারদিন আগেই ও কাজে গিয়েছিল । তারপর দুঃসংবাদ পেলাম ৷"
গ্যাব্রিয়েলের বাড়ির ঢিল ছোড়া দূরত্বেই শিবা মুন্ডা এবং বিকেসর ওরাওয়ের বাড়ি। বিকেসরের স্ত্রী দেবিকা ওরাওঁ বলেন, "গতকাল দুপুর ১২টার পর থেকেই ওর সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না।" পরিবারের প্রধান উপার্জনকারীকে হারানোর পর তিন সন্তানকে নিয়ে কার্যত অথৈ জলে পড়েছেন দেবিকা । মৃতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে আসেন মেটেলি ব্লকের বিডিও সুমন্ত ভৌমিক, আইসি মৃংমা লেপচা-সহ স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্ব দীপঙ্কর ধররা ৷ জেলা পুলিশ সুপার সুজাতা কুমারী বীণাপাণি বলেন, "জেলার বেশকিছু শ্রমিক সিকিমে আটকে রয়েছেন ৷ আমরা একজন ডিএসপি-সহ জেলার আধিকারিকদের পাঠিয়েছি । মৃত্যু সংবাদ পাওয়া গেলেও সংখ্যা সঠিকভাবে এখনোই বলা সম্ভব নয় ।"
মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর নজরে পরিস্থিতি
সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাং দুর্ঘটনাস্থলের পরিস্থিতির উপর নিয়মিত নজর রাখছেন এবং প্রশাসনের সব বিভাগকে দ্রুত উদ্ধারকাজ চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। মৃতদের পরিবারের জন্য। সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাং ৪ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলে পরিস্থিতির খোঁজ নেন এবং কেন্দ্রের পক্ষ থেকে সবরকম সাহায্যের আশ্বাস দেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী মৃতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা ঘোষণা করেছেন।
We hate spam as much as you do