Tranding

12:30 AM - 29 Jun 2026

Home / National / যোগীরাজ‍্যে 'নরককুন্ড’ কারখানা ২০ ঘন্টা, কাজ, মার থেকে উদ্ধার ১৩ শ্রমিক

যোগীরাজ‍্যে 'নরককুন্ড’ কারখানা ২০ ঘন্টা, কাজ, মার থেকে উদ্ধার ১৩ শ্রমিক

তদন্তে জানা গিয়েছে, কাজে যোগ দেওয়ার পরই শ্রমিকদের মোবাইল ফোন, আধার কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্র-সহ সমস্ত নথি কেড়ে নেওয়া হত। এরপর আর কারও কারখানার বাইরে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। ফলে পরিবার বা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। পুলিশের সন্দেহ, উদ্ধার হওয়া কয়েক জন শ্রমিক দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে এই বন্দিদশায় ছিলেন।

যোগীরাজ‍্যে 'নরককুন্ড’ কারখানা ২০ ঘন্টা, কাজ, মার থেকে উদ্ধার ১৩ শ্রমিক

যোগীরাজ‍্যে 'নরককুন্ড’ কারখানা ২০ ঘন্টা, কাজ, মার থেকে উদ্ধার ১৩ শ্রমিক


28 June 2026 


ভাল চাকরি, মোটা বেতন, থাকার- খাওয়ার ব্যবস্থা— এমন প্রলোভন দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শ্রমিকদের উত্তরপ্রদেশের মুজফ্‌ফরনগরের একটি কারখানায় নিয়ে যাওয়া হত। কিন্তু সেখানে পৌঁছনোর পর তাঁদের জন্য অপেক্ষা করত এক বিভীষিকাময় জীবন। মোবাইল ফোন ও পরিচয়পত্র কেড়ে নিয়ে কার্যত বন্দি করে রাখা, দিনে প্রায় ২০ ঘণ্টা কাজ করানো, সামান্য খাবার, প্রতিবাদ করলেই লোহার রড ও বেল্ট দিয়ে মারধর— এক ঘটনার তদন্তে উঠে এসেছে এমনই এক শিউরে ওঠার মতো চিত্র। এখনও পর্যন্ত ওই কারখানা থেকে ১৩ জন শ্রমিককে উদ্ধার করেছে পুলিশ।


ঘটনা জানাজানি হয় রাজস্থানের যোধপুরের বাসিন্দা বিক্রমের পালিয়ে আসার পর। তিনি ওই কাগজের থালা-বাটি তৈরির কারখানায় কাজ করতেন। গত ২২ জুন কারখানার পাঁচিল টপকে কোনও রকমে পালিয়ে তিনি তিতাওয়ী থানায় পৌঁছে পুরো ঘটনার কথা জানান। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতেই পুলিশ অভিযান চালিয়ে শ্রমিকদের উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের মধ্যে নাবালকও রয়েছে।


ঘটনায় কারখানার মালিক অঙ্কিত বালিয়ানের বাবা প্রদীপ বালিয়ান এবং সুপারভাইজার শিব ত্যাগিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মূল অভিযুক্ত অঙ্কিত এখনও পলাতক। তদন্তকারীদের দাবি, শ্রমিকদের উপর নজরদারির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল শিবকে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারায় মামলা রুজু হয়েছে।

 

তদন্তে জানা গিয়েছে, কাজে যোগ দেওয়ার পরই শ্রমিকদের মোবাইল ফোন, আধার কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্র-সহ সমস্ত নথি কেড়ে নেওয়া হত। এরপর আর কারও কারখানার বাইরে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। ফলে পরিবার বা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। পুলিশের সন্দেহ, উদ্ধার হওয়া কয়েক জন শ্রমিক দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে এই বন্দিদশায় ছিলেন।

 

মুজফ্‌ফরনগরের সিনিয়র পুলিশ সুপার সঞ্জয় বর্মার দাবি, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড-সহ বিভিন্ন জনবহুল এলাকা থেকে ভাল চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে শ্রমিকদের নিয়ে আসা হত। শুধু উত্তরপ্রদেশ নয়, দেশের একাধিক রাজ্য থেকেও শ্রমিক আনা হয়েছিল।

 

উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের অভিযোগ, প্রতিদিন ভোর ৪টে থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত প্রায় ২০ ঘণ্টা কাজ করতে বাধ্য করা হত। অসুস্থ হলেও ছুটি মিলত না। কেউ বাড়ি ফেরার কথা বললে বা বেশি বিশ্রাম চাইলে শুরু হত নির্মম অত্যাচার। লোহার রড, লাঠি, বেল্ট দিয়ে মারধরের পাশাপাশি পাহারায় রাখা হত পিটবুল কুকুর, যাতে কেউ পালানোর সাহস না পায়।

 

অভিযোগ পেয়ে উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে পুলিশ। শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন, ভাঙা হাড় ও গভীর ক্ষতের প্রমাণ মিলেছে। তদন্তকারীদের ধারণা, দীর্ঘদিনের শারীরিক নির্যাতনের ফলেই তাঁদের এই অবস্থা।

 

শুধু অত্যাচারই নয়, পর্যাপ্ত খাবারও দেওয়া হত না বলে অভিযোগ উঠেছে। শ্রমিকদের দাবি, দিনে মাত্র একবার অল্প পরিমাণ খাবার দেওয়া হত। তুষের তৈরি রুটি ও সামান্য তরকারিই ছিল তাদের ভরসা। অপুষ্টি, অতিরিক্ত পরিশ্রম এবং ঘুমের অভাবে কয়েক জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলেও সন্দেহ করা হচ্ছে। যদিও সেই বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন।

 

অমরোহা জেলার বাসিন্দা ২৪ বছরের দিলশাদ মহম্মদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে তাঁর কোনও খোঁজ পাচ্ছিল না। পাঁচ মাস আগে কাজের সন্ধানে বাড়ি ছেড়েছিলেন। প্রথম দিকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও পরে আচমকাই সব বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় তিন মাস পর উদ্ধার হওয়ার পর তাঁর ফোন পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন পরিবারের সদস্যরা। একইভাবে আগরার বাসিন্দা সোনু চৌহানও জানিয়েছেন, আট ঘণ্টার কাজ ও ১৪ হাজার টাকা বেতনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁকে আনা হলেও বাস্তবে তাঁকে দীর্ঘ সময় কাজ করানো হত, কেড়ে নেওয়া হয়েছিল মোবাইল ও পরিচয়পত্র। ভুল হলেই নেমে আসত নির্যাতন।

 

পুলিশের দাবি, গোটা চক্রের সঙ্গে আর কারা জড়িত, শ্রমিক পাচার ও বেআইনি আটকে রাখার এই নেটওয়ার্ক কতটা বিস্তৃত— সবদিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত এগোলে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।

 

Your Opinion

We hate spam as much as you do